মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পে স্থায়ী জলাবদ্ধতায় হতাশ কৃষকরা

আবাদ নেই ৫শ’ একর কৃষিজমিতে

মাহফুজ মল্লিক
ধানচাষি আমির আলী চলতি মৌসুমে ৩০ শতাংশ জমিতে রোপা আমনের চাষ করেন। তার আরও ৩০ শতাংশ জমিতে বছরজুড়েই লেগে থাকে জলাবদ্ধতা। সেখানে ফসলের আবাদ করতে না পেরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। গত প্রায় ৩২ বছর ধরেই চলছে এ অবস্থা। খলিলের অভিযোগ, বিষয়টি চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃপক্ষকে বহুবার জানিয়েও কাজ হয়নি।
এটি মতলব উত্তর উপজেলার মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের বেড়িবাঁধের ভেতরের চিত্র। খলিল ঢালীর বাড়ি ওই উপজেলার ঠেটালিয়া গ্রামে। স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে খলিলের মতো তার পাশের ফতেপুর গ্রামের হারুনুর রশিদ ও বাবুলমিয়াসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অনেক চাষি তাদের কৃষিজমিতে ফসলের আবাদ করতে পারছেন না। অনেক নিষ্কাশন খাল বেদখল হয়ে ভরাট হওয়ায় এবং খালের আগাছা পরিষ্কারে পাউবো কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ না নেয়ায় এ সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
চাঁদপুর পাউবো ও উপজেলা কৃষি কার্যালয় জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) যৌথ অর্থায়নে উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের বেড়িবাঁধের নির্মাণকাজ শেষ হয়। প্রকল্পের বেড়িবাঁধটির দৈর্ঘ্য ৬০ কিলোমিটার এবং এতে নিষ্কাশন খাল রয়েছে ১২৬ কিলোমিটার। বেড়িবাঁধের ভেতরে মোট জমির পরিমাণ ১৫ হাজার ৪ শ’ ৬৪ হেক্টর। এর মধ্যে সেচযোগ্য জমি প্রায় সাত হাজার হেক্টর।
গতকাল বুধবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ওই সেচ প্রকল্পের বেড়িবাঁধের ভেতরে দেখা যায়, এর ঠেটালিয়া, সিপাইকান্দি, আমুয়াকান্দা, ইসলামাবাজ, ষাটনল, লুধুয়া, গজরা, ছৈয়ালকান্দি, ওটারচর, বিনন্দপুর, নন্দলালপুর, টরকি, আমিরাবাদ ও দুর্গাপুরসহ আরও কয়েকটি এলাকার নিচু জমি ও ফসলি বিলগুলোয় বৃষ্টির পানি আটকে আছে। সেখানে দৃশ্যত তিন-চার ফুট উচ্চতার জলাবদ্ধতা লেগে আছে। ওই পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করায় কৃষকেরা সেখানে ফসলের আবাদ করতে পারছেন না। জলাশয় বা হাওরের মতো দেখতে এসব বিলগুলো ভরে আছে শ্যাওলা ও বিভিন্ন আগাছায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের সিপাইকান্দি-ফতেপুর-ঠেটালিয়া পানি ব্যবহারকারী দলের সাধারণ সম্পাদক গোলাম নবী খোকন দাবি করেন, ওই সেচ প্রকল্পের বেড়িবাঁধের ভেতরে বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৫০-৬০টি বিল রয়েছে। এসব বিলের জমিসহ আরো বেশ কিছু এলাকার নিচু জমি মিলে অন্তত ৫শ’ একর কৃষিজমিতে বছরজুড়েই জলাবদ্ধতা লেগে থাকে। জলাবদ্ধতা না দূর না হওয়ায় গত প্রায় ৩২ বছর ধরে কৃষকেরা এসব জমিতে ধান বা অন্য কোনো ফসল আবাদ করতে পারছেন না। এতে প্রতিবছর প্রত্যাশিত পরিমাণ ফসল উৎপাদন হচ্ছে না সেচ প্রকল্পটির জমিতে।
তারা অভিযোগ করেন, এসব কৃষিজমির জলাবদ্ধতা দূর করতে চাঁদপুর পাউবো কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হলেও এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। সেচ প্রকল্পটির ফতেপুর এলাকার চাষি ওয়াদুদ মিয়া ও ছৈয়ালকান্দি এলাকার মজিবুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাদের ৫০-৬০ শতাংশ কৃষিজমিতে সারা বছর জলাবদ্ধতা লেগে থাকে। বর্ষায় সেখানে চার-পাঁচ ফুট জলাবদ্ধতা থাকে। গভীর জলাবদ্ধতার কারণে এসব জমিতে ফসল আবাদ করতে পারছেন না। এতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিষয়টি পাউবো কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কাজ হচ্ছে না।
তারা আরও বলেন, বেড়িবাঁধের ভেতরে অর্ধশতাধিক জায়গায় পানি নিষ্কাশন খাল বেদখল হয়ে আছে। সেখানে মাটি ভরাট করে ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটাচ্ছে স্থানীয় লোকজন। এ ছাড়া নিষ্কাশন খালের ৮০ ভাগ অংশেই আগাছার দাপট। এতে জমির আবদ্ধ পানি বাঁধের বাহিরে নিষ্কাশন করা যাচ্ছে না। পাউবোর দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতার কারণে এ সমস্যা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তারা।
জানতে চাইলে মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা চাঁদপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন বলেন, বেড়িবাঁধটির ভেতরে পানি নিষ্কাশন খাল পরিষ্কার এবং সংস্কার করার জন্য একটি নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। ওই প্রকল্পটি পাস হলে এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে নিষ্কাশন খাল কার্যকর করে জলাবদ্ধতা দূর করা হবে। বেদখল খাল দখলমুক্ত করার জন্য অভিযান চালানো হবে। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।