আজ মহান বিজয় দিবস

ইলশেপাড় রিপোর্ট
আজ মহান বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির হাজার বছরের শৌর্যবীর্য এবং বীরত্বের এক অবিস্মরণীয় গৌরবময় দিন। বীরের জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার দিন। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ভূখন্ডের নাম জানান দেয়ার দিন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৪৮ সাল থেকে ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ এর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চে গণহত্যা শুরু হলে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন এবং রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লাখ শহীদ ও দু’লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক সেনাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। সেই হিসাবে বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তির দিন আজ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ‘মহাবিজয়ের মহানায়ক’ প্রতিপাদ্যে আজ থেকে দুই দিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। মুজিববর্ষ উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি এ আয়োজন করেছে।
অনুষ্ঠানমালার প্রথমদিন বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠান শুরু হবে বিকেল সাড়ে ৪টায় এবং অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিচালনায় থাকবে সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষের শপথ। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে জাতীয় পতাকা হাতে দেশের সর্বস্তরের মানুষ এ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন। শপথগ্রহণ শেষে আলোচনা পর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।
সম্মানীয় অতিথির বক্তব্য রাখবেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখবেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক এবং স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং স্বাগত বক্তব্য রাখবেন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। এ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানা সম্মানীয় অতিথিকে ‘মুজিব চিরন্তন’ শ্রদ্ধাস্মারক প্রদান করবেন হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী।
জাতীয় পর্যায়ে বিজয় দিবসের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- সূর্যোদয়ের সাথে সাথে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে উপস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।
বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। বিদেশি কূটনীতিকবৃন্দ, মুক্তিযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণকারী আমন্ত্রিত সদস্যগণ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।
এছাড়া, সকাল সাড়ে ১০টায় তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরস্থ জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সম্মিলিত বাহিনীর বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমভিত্তিক যান্ত্রিক বহর প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও সালাম গ্রহণ করবেন। প্রধানমন্ত্রীও এ কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। দিনটি সরকারি ছুটির দিন। সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনাসমূহ আলোকসজ্জায় সজ্জিত হবে।
৪৯ বছর আগে ঠিক এই দিনে বিকেল ৪টা ১৯ মিনিটে ঢাকার তৎকালীন ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সেনাপ্রধান লে. জেনারেল একে নিয়াজী তার ৯৩ হাজার পরাজিত পাকিস্তানী সৈন্যসহ ভারতের পূর্বাঞ্চলের সেনাপ্রধান লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে নিঃশর্ত আত্মমর্পণ করেন। যবণিকাপাত হয় পাকিস্তানী অত্যাচার আর নির্যাতনের। পাকিস্তানী সৈন্যের এ আত্মসমর্পণ ছিল মূলতঃ যৌথ বাহিনীর কাছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনী যৌথভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যায়।
মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক ছিলেন জেনারেল মো. আতাউল গনি ওসমানী। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আত্মমর্পণের সময় তিনি ঢাকায় এসে পৌঁছতে পারেননি। তার বদলে এসেছিলেন ডেপুটি চিফ অব স্টাফ এয়ার ভাইস মার্শাল একে খন্দকার। যুদ্ধের নিয়মে এ দিনই পাকিস্তানের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে।
তবে এ ভূখণ্ডের মানুষের স্বাধীনতার জন্য, বিজয়ের জন্য লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস কম পুরানো নয়। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথীর তীরে পলাশীর আমবাগানে বিদেশী বেনিয়াদের কাছে পরাজিত হবার পর পরই মূলতঃ শুরু হয় এ জাতির মুক্তিসংগ্রাম। ফকির মজনু শাহ, তিতুমীর, হাজি শরীয়তুল্লাহর নেতৃত্বে যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা’ই পরবর্তীতে সিপাহী বিপ্লব, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন এবং পাকিস্তান লাভের মধ্যদিয়ে বিকশিত ও প্রসারিত হয়। ব্রিটিশ-ব্রাহ্মণ্যবাদী চক্রান্তের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান অর্জিত হলেও তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকদের হঠকারিতা এবং শোষণের জন্য এ দেশের প্রতিটি মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় অনাস্থা ও অবিশ্বাসের বিভেদ রেখা। সেই সাথে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী দলকে মেনে না নেয়ার পর বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বাংলাদেশের ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা, সামরিক-বেসামরিক লোকজন। সত্তরের সাতই মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভরাট কণ্ঠের জাদুমাখা ভাষণ- ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম….’ স্বাধীনতার স্পৃহাকে আরো বেগবান করে।
স্বাধীনতাই যখন তৎকালীন পূর্ববাংলার মানুষের প্রথম ও শেষ চাওয়া, তখন একাত্তরের ২৫ শে মার্চ কালো রাতে পাকবাহিনী নির্মম হত্যাকাণ্ড চালায় মুক্তিকামী নর-নারী ও শিশুদের ওপর। এতে স্তম্ভিত হয়ে যায় গোটা দেশ। বিশ্ব বিবেকও এমন ন্যক্কারজনক ঘটনায় চুপ থাকতে পারেনি।
মুক্তিপাগল জনতা তখন ঝাঁপিয়ে পড়ে বিজয়ের জন্য। ‘একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে’ সশস্ত্র সংগ্রামে শরীক হয় সর্বস্তরের মানুষ। দীর্ঘ নয় মাস অনেক ত্যাগ-তিতীক্ষা, রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পরাধীনতা গ্লানি, শোষণ-বঞ্চনার পীড়নমুক্ত হই আমরা।
সমরবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, দুনিয়াব্যাপী দেশ শত্রুমুক্ত করার স্বল্পতম সময়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম সবচেয়ে বীরত্বপূর্ণ গৌরবগাঁথা ও ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর। পরিসংখ্যানের ভিত্তি দুর্বল হলেও লোকমুখে প্রচারিত ও প্রচলিত যে, এই যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন বাংলাদেশের ৩০ লাখ মানুষ। পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন লাখ লাখ বনি আদম। সম্ভ্রম হারিয়েছেন অসংখ্য কন্যা-জায়া-জননী। শূন্য হয়েছে অগণিত মায়ের বুক। এমন একটি সংগ্রামের ইতিহাস এ দেশের মানুষকে করেছে সারাবিশ্বে মর্যাদাবান, করেছে স্বাধীন-সার্বভৌম। দিয়েছে আত্মপরিচয়ের নিশানা লাল-সবুজের পতাকা, দিয়েছে স্বকীয়তার স্বীকৃতি। বিশ্ব মানচিত্রে দিয়েছে একক পরিচয়ে অবস্থান। তবে আজ চারদশকের বেশি সময় পার হয়ে এসেও এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা আপেক্ষিক বিষয়বস্তু রয়ে গেছে। ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানগত কারণেই কি এর আকাশ মেঘমুক্ত নয়? এর সমৃদ্ধ সবুজ জমিন ও নিচে লুক্কায়িত সম্পদের ওপর সম্প্রসারণবাদি-সাম্রাজ্যবাদিদের শ্যেন দৃষ্টি নিবদ্ধ।
আজকের টগবগিয়ে ওঠা সূর্যের সাথে জনগণও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃঢ় শপথ নেবে। যাদের একটি বিজয় দিবস রয়েছে, তারা কখনোই পরাভব মানে না। মানতে পারে না।
সেই শক্তি ও সাহস নিয়েই আমরা হবো আগুয়ান। কণ্ঠে কণ্ঠে গীত হবে ‘সব ক’টা জানালা খুলে দাও না/ আমি গাইবো গাইবো বিজয়েরই গান।’

চাঁদপুর জেলা আ.লীগের কর্মসূচি

স্টাফ রিপোর্টার
মহান বিজয়ের ৫০ বৎসর পূর্তি উপলক্ষে প্রতিবারের মতো এবারও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ চাঁদপুর জেলা শাখা ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্য রয়েছে- আজ ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৬টায় মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে অঙ্গীকার পাদদেশে পুষ্পস্তবক অর্পণ। সকাল সাড়ে ৭টায় দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন। সকাল ৮টায় দলীয় কার্যালয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান। বিকাল সাড়ে ৩টায় চাঁদপুর স্টেডিয়ামে জাতীয় শপথ অনুষ্ঠান। বাদ আছর বিভিন্ন মসজিদ-মন্দিসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা ৬টায় বিজয় মেলা মঞ্চে আলোচনা সভা।
ঐ কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সব নেতাকর্মী তথা সর্বস্তরের জনগণকে অংশগ্রহণ করার জন্য অনুরোধ জানান চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আবু নঈম পাটওয়ারী দুলাল।
১৬ ডিসেম্বর, ২০২১।