ইল্শেপাড় ডেস্ক
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর গেজেট প্রকাশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর গেজেট প্রকাশ করেছে অন্তর্র্বতী সরকার। প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ১৬ নং আইনের ধারা ২০-এর (খ) উপধারা (১)-এর দফা (ঙ)-তে বলা হয়েছে, ‘উক্ত সত্তা কর্তৃক বা উহার পক্ষে বা সমর্থনে যে কোন প্রেস বিবৃতির প্রকাশনা বা মুদ্রণ কিংবা গণমাধ্যম, অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য যে কোন মাধ্যমে যে কোন ধরনের প্রচারণা, অথবা মিছিল, সভা-সমাবেশ বা সংবাদ সম্মেলন আয়োজন বা জনসম্মুখে বক্তৃতা প্রদান নিষিদ্ধ করিবে।’
নতুন এ আইনের ফলে আওয়ামী লীগের খবর প্রচার করা হলে গণমাধ্যমও শাস্তির আওতায় পড়বে বলে মত প্রকাশ করেছেন আইনজীবীরা। একই সঙ্গে ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগের অতীতের সঙ্গে বর্তমানে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ আছে সেটি উল্লেখ করতে হবে। তার পরও এ আইনের আওতায় গণমাধ্যমকর্মীদের হয়রানি করার শঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
গণমাধ্যম আওয়ামী লীগের খবর প্রকাশ করলে শাস্তির আওতায় পড়বে মন্তব্য করে আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সত্তা ও সংগঠন আসলে একই জিনিস। সত্তার ইংরেজি বলছি এনটিটি। রাজনৈতিক দলও একটি এনটিটি। ফলে এনটিটিকে নিষিদ্ধ করার বিষয় আগে থেকেই সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮ ধারায় বলা আছে। তবে আগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিষয় ছিল না। তখন কার্যালয় বন্ধসহ আরো কিছু বিষয় ছিল। এখন নতুন করে তাদের কর্মকাণ্ড বন্ধের বিষয়টি এল। ফলে আওয়ামী লীগের কোনো খবরই আর গণমাধ্যম প্রকাশ করতে পারবে না।’
অপরাধের শাস্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শাস্তির বিষয়েও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের নতুন যে সংশোধনী করা হলো সেটি ছাড়াও ধারা ৯-এর ৩ নাম্বার উপধারা অনুযায়ী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ ছিল। টেলিভিশনে বা মুদ্রণে সংবাদ প্রকাশ অপরাধ হিসেবে অনেক আগে থেকেই সংজ্ঞায়ন করা আছে। সে অনুযায়ী এ অপরাধের শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ সাত ও সর্বনিম্ন দুই বছর কারাদণ্ড, একই সঙ্গে অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। নতুন আইনে আরো স্পষ্টীকরণ করা হলো যে এর মাধ্যমে সংবাদমাধ্যম ও প্রচার মাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ কোনো দিবসের ঘোষণা দিলে সেটিও প্রচার করা যাবে না।’
সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯-এর ৯ ধারার ১, ২ ও ৩ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোন ব্যক্তি ধারা ১৮-এর অধীন কোন নিষিদ্ধ সত্তাকে সমর্থন করিবার উদ্দেশ্যে কাহাকেও অনুরোধ বা আহ্বান করেন, অথবা নিষিদ্ধ সত্তাকে সমর্থন বা উহার কর্মকাণ্ডকে গতিশীল ও উৎসাহিত করিবার উদ্দেশ্যে কোন সভা আয়োজন, পরিচালনা বা পরিচালনায় সহায়তা করেন, অথবা বক্তৃতা প্রদান করেন, তাহা হইলে তিনি অপরাধ সংঘটন করিবেন। এছাড়া যদি কোন ব্যক্তি কোন নিষিদ্ধ সত্তার জন্য সমর্থন চাহিয়া অথবা উহার কর্মকাণ্ডকে সক্রিয় করিবার উদ্দেশ্যে কোন সভায় বক্তৃতা করেন অথবা রেডিও, টেলিভিশন অথবা কোন মুদ্রণ বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কোন তথ্য সম্প্রচার করেন, তাহা হইলে তিনি অপরাধ সংঘটন করিবেন এবং যদি কোন ব্যক্তি উপধারা (১) অথবা (২)-এর অধীন কোন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন, তাহা হইলে তিনি অনধিক সাত বৎসর ও অন্যূন দুই বৎসর পর্যন্ত যে কোন মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডও আরোপ করা যাইবে।’
আওয়ামী লীগের ইতিহাস লেখার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে উল্লেখ করে আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আরো বলেন, ‘৭ মার্চ যেহেতু বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার বিষয় আছে সেটি তো ঐতিহাসিক সত্য। তাই কথাগুলো পূর্বের ঘটনা এমন করে লিখতে হবে। অন্যথায় এগুলো নিয়ে মামলার সুযোগ থাকবে। ইতিহাস লিখতে গেলেও “কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ” এভাবে করতে হবে। খুবই কমপ্লিকেটেড কিন্তু কোনো উপায় নেই। নয়তো হয়রানি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
এ আইনের টার্গেট গণমাধ্যম নয় উল্লেখ করে আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘এ অপরাধের আওতায় তারাই আসবে যারা নিষিদ্ধ সংগঠনকে সমর্থন করে উল্লেখ্য কাজগুলো করবে। তাদের কেউ যদি প্রেস রিলিজ করে বা মুদ্রণ করে সেটিকে বুঝিয়েছে। এ আইন নিষিদ্ধ সত্তাকে সমর্থনকারী সত্তাকে মিন করেছে। আমার নিজের অভিমত এটি সংবাদপত্রের জন্য বাস্তবায়ন হবে না। সুতরাং সংবাদমাধ্যমের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এর টার্গেট গণমাধ্যম না। ব্রডলি যদিও গণমাধ্যম মনে হচ্ছে। তারপরও সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টীকরণটা জরুরি।’
উল্লেখ্য, এর আগে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯-এ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিষিদ্ধের কথা উল্লেখ থাকলেও কোনো সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ বন্ধের বিষয়ে উল্লেখ ছিল না। যার ফলে আইনটি নতুন করে সংশোধন করে প্রকাশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
বাংলাদেশে সন্ত্রাসবিরোধী আইনটি হয়েছিল ২০০৯ সালে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে আইনটির গেজেট হলেও এটি কার্যকর ধরা হয়েছে ২০০৮ সালের ১১ জুন থেকে। এ আইন দ্বারাই ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করেছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। এর আগে ক্ষমতায় থাকাকালে জামায়াত ও শিবিরকে নিষিদ্ধ করেছিল পতিত আওয়ামী লীগ সরকার।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারীকৃত প্রজ্ঞাপন অন্য কোনো রাজনৈতিক দল বা মুক্তমতের মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করে না। আওয়ামী লীগের কোনো কর্মকাণ্ড, দলটি সম্পর্কে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের যৌক্তিক, গঠনমূলক বা আইনানুগ বিশ্লেষণ বা মতামত প্রদান এ প্রজ্ঞাপন দ্বারা খর্বিত করা হয়নি।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো ওই বিবৃতিতে বলা হয়, উক্ত আইন ও প্রজ্ঞাপন অনুসারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গ সংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন কর্তৃক যেকোনো ধরনের প্রকাশনা, গণমাধ্যম, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা, মিছিল, সভা-সমাবেশ, সম্মেলন আয়োজনসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ নিষেধাজ্ঞা সংগঠনগুলোর নেতাকর্মী ও সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য হবে।
১৪ মে, ২০২৫।
