চাঁদপুরে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপিত

পিছুটান মুক্তিযোদ্ধাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি
…….শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি

এস এম সোহেল
শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে তখন সবার চোখে মুখে একটাই স্বপ্নছিল দেশটাকে স্বাধীন করা। জীবনের মায়া আপনারা (বীর মুক্তিযোদ্ধা) করেননি। আপনাদের সবারই বাড়িতে হয়তা বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তান ও ভাই-বোন ছিল। কোন পিছুটান আপনাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। আপনারা সেদিন শুধু দেশ মাকে স্বাধীন করবেন, দেশ মার সম্মানকে উদ্ধার করবেন, হানাদার বাহিনীকে এই দেশ মাকে মুক্ত করে স্বাধীন মানুষ হিসেবে এই দেশের প্রতিটি মানুষ যেন বাঁচতে পারে সে প্রতিজ্ঞা নিয়ে জীবন বাজি রেখে ঘর ছেড়ে ছিলেন।
গত রোববার দুপুরে চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি আরো বলেন, ২৫ মার্চের কাল রাতে ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়েছে পাকবাহিনী। পুরো দেশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল তারা। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি একটি নিকৃষ্টতম ঘটনা ছিলো। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতা কখন ভুলার নয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আপনারা স্বাধীন ভূখন্ড তৈরী করে দিয়েছিলেন। আপনাদের কারণে আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক বলতে পারি।
তিনি আরো বলেন, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি রাষ্ট্রের জন্যে কখনো শুভ নয়। আওয়ামী লীগের কারণে বাঙালি তার স্বাধীনতা পেয়েছে। যারা মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়েছিলো, আজকে তারা নাকি মানুষের অধিকারের কথা বলে। আমরা কথা বললেই বোমা ও গ্রেনেড মারা হয়েছিলো। তারাই আজ অধিকারের কথা বলে। এরা মানুষকে হত্যা করেছে। তারা হত্যাকারীদের পুরস্কৃত করেছে। যুদ্ধাপরাধীর বিচার যখন বঙ্গবন্ধু করেছিলো, সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার জিয়াউর রহমান বন্ধ করে তাদের ক্ষমতায় বসিয়েছিল। বিএনপি চায় আমাদের ভিক্ষুকের জাতিতে পরিণত করতে।
তিনি বলেন, আজ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হচ্ছি। আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজকে ভিক্ষুকের হাত থেকে দাতার হাতে পরিণত হয়েছি। আজকে প্রতিটি মানুষ ভালো অবস্থানে রয়েছে। দারিদ্র্য কমেছে। গৃহহীনদের জন্যে ঘর উপহার দিচ্ছেন সরকার। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বীর নিবাসের ব্যবস্থা করছেন। আপনাদের যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করছেন সরকার।
জেলা প্রশাসক কামরুল হাসানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন পুলিশ সুপার মো. মিলন মাহমুদ, চাঁদপুর পৌরসভার মেয়র অ্যাড. মো. জিল্লুর রহমান জুয়েল, মুক্তিযোদ্ধা এমএ ওয়াদুদ, চাঁদপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর অসিত বরণ দাশ, পুরাণবাজার ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ রতন কুমার মজুমদার। স্বাগত বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোছাম্মৎ রাশেদা আক্তার।
চাঁদপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শারমিন আক্তারের পরিচালনায় আরো বক্তব্য রাখেন স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত নারী মুক্তিযোদ্ধা ডা. সৈয়দা বদরুন নাহার চৌধুরী, চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি এএইচএম আহসান উল্লাহ, মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাত হোসেন সাবু পাটওয়ারী প্রমুখ।
আলোচনা শেষে বীর মুক্তযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপিসহ অতিথিরা। অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রায় দুই শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যকে ফুল দিয়ে বরণ করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি, জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান ও পুলিশ সুপার মো. মিলন মাহমুদ।
আলোচনা সভা শেষে শিশু একাডেমির আয়োজনে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার তুলে দেন অনুষ্ঠানের অতিথিরা। সবশেষে চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমীর শিল্পীদের সমন্বয়ে মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস চাঁদপুরে বিভিন্ন কর্মসূচীর মধ্যে ছিলো- সূর্যোদয়ের সাথে সাথে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য অঙ্গীকার পাদদেশে ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে মহান বিজয় দিবসের কর্মসূচি শুরু। তোপধ্বনি শেষে অঙ্গীকার বেদীতে শহীদদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি, জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান, পুলিশ সুপার মো. মিলন মাহমুদ, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ইউনিট, জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষে সভাপতি নাছির উদ্দিন আহমেদ, চাঁদপুর পৌরসভার পক্ষে মেয়র অ্যাড. মো. জিল্লুর রহমান, জেলা পরিষদের পক্ষে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
এছাড়া অঙ্গীকারে পর্যায়ক্রমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন চাঁদপুর জেলা বিএনপি, চাঁদপুর প্রেসক্লাব, নৌ-পুলিশ চাঁদপুর অঞ্চল, সিআইডি চাঁদপুর জেলা, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), চাঁদপুর জিআরপি থানা, চাঁদপুর পৌর আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর সিভিল সার্জন অফিস, চাঁদপুর সদর উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদ, চাঁদপুর জেলা যুব মহিলা লীগ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর চাঁদপুর, চাঁদপুর জেলা শিক্ষা অফিস, চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতাল, চাঁদপুর বিএমএ, চাঁদপুর স্বাচিপ, চাঁদপুর পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ, বাংলাদেশ আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগ চাঁদপুর জেলা, চাঁদপুর সরকারি আইন কর্মকর্তা, চাঁদপুর ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স, জেলা আনসার ও ভিডিপি, চাঁদপুর গণপূর্ত, চাঁদপুর জেলা ছাত্রলীগ, চাঁদপুর এলজিইডি, চাঁদপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, চাঁদপুর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, চাঁদপুর বিআইডব্লিউটিএ, চাঁদপুর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। এছাড়া সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।
সূর্যোদয়ের সাথে-সাথে সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে জাতীয় পতাকা যথাযথ মর্যাদায় উত্তোলিত হয়। সকাল ৮টায় চাঁদপুর স্টেডিয়ামে জেলা প্রশাসক কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। জাতীয় পতাকা উত্তোলন শেষে শান্তির প্রতীক পায়রা অবমুক্ত ও বেলুন উড়িয়ে দিনব্যাপি কর্মসূচীর সূচনা করেন করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি, জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান ও পুলিশ সুপার মো. মিলন মাহমুদ।
পরে পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি, বিএনসিসি, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, কারারক্ষী বাহিনী, রোভার স্কাউট, গার্লস্ গাইড, কাব গাইডসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিশু-কিশোর সংগঠনের কুচকাওয়াচ পরিদর্শন শেষে সালাম গ্রহণ করেন জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান ও পুলিশ সুপার মো. মিলন মাহমুদ। কুচকাওয়াচ শেষে জেলা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের মনোমুগ্ধকর শরীরচর্চা ও ডিসপ্লে প্রদর্শিত হয়। কুচকাওয়াচ, ডিসপ্লে, বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন অতিথিরা।
বেলা ১১টায় জেলার সব সিনেমা হলে ছাত্র-ছাত্রী ও শিশু-কিশোরদের জন্য বিনামূল্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হয়েছে। দুপুর হাসপাতাল, জেলখানা, এতিমখানা, সরকারি শিশু সদন এবং মূখ ও বধির স্কুলে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয়েছে। সুবিধাজনক সময়ে জাতির শান্তি, অগ্রগতি ও শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মসজিদে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। এছাড়াও জাতির শান্তি, অগ্রগতি ও শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মন্দির এবং গীর্জায় বিশেষ প্রার্থনা করা হয়েছে। বিকেলে চাঁদপুর মহিলা কলেজে জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার আয়োজনে নারীদের আলোচনা সভা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিকেল ৪টায় চাঁদপুর স্টেডিয়ামে জেলা প্রশাসক একাদশ ও পৌরসভা একাদশের মধ্যে প্রীতি ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার মধ্যে প্রীতি ফুটবল প্রতিযোগিতা শেষে অংশগ্রহণকারী ও আগত অতিথির মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

২৮ মার্চ, ২০২৩।