চাঁদপুরে ল্যাপটপ-প্রজেক্টর বিতরণে অনিয়ম

দায় ঠেলাঠেলিতে শিক্ষা কর্মকর্তারা

এস এম সোহেল/সজীব খান
চাঁদপুর জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর সরবরাহের নামে লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। সরঞ্জাম পরিবহন ও যাতায়াত খরচের কথা বলে লাখ লাখ টাকা পকেটস্থ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। অথচ সরবরাহ প্রক্রিয়ার বাস্তবতায় নেই স্বচ্ছতা। এই অনিয়ম নিয়ে এখন শুরু হয়েছে দোষারোপের খেলা ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের মধ্যে।
জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর আনার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ২শ’ থেকে ৫শ’ টাকা হারে প্রায় ৬ লাখ টাকা উত্তোলন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে শিক্ষা কর্মকর্তাদের রোষাণলের ভয়ে এ বিষয়ে কোন শিক্ষক অভিযোগ দিতে রাজি নয়।
এই দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে এখন দোষারোপের খেলা শুরু হয়েছে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের মধ্যে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস কর্মকর্তারা বলছেন, বিতরণ ও পরিবহনের দায়িত্ব ছিল উপজেলা শিক্ষা অফিসের। অন্যদিকে উপজেলা কর্মকর্তারা বলছেন, সব পরিকল্পনা ও বরাদ্দের নির্দেশনা এসেছিল জেলা অফিস থেকেই। ফলে কেউই দায় নিচ্ছে না, আর প্রকৃত দুর্নীতির উৎস রয়ে যাচ্ছে অন্ধকারেই। এই ঘটনায় শিক্ষা খাতের স্বচ্ছতা নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।
জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সরকার চাঁদপুর জেলার ৪৩২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ল্যাপটপ এবং ৬৯২টি বিদ্যালয়ে প্রজেক্টর বরাদ্দ দেয়। এর মধ্যে বিভিন্ন উপজেলার প্রাপ্তির চিত্র নিম্নরূপ:
ল্যাপটপ পেয়েছে- সদর উপজেলার ৭৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কচুয়া উপজেলা ৭০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাজীগঞ্জ উপজেলার ৮২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শাহরাস্তি উপজেলার ৪৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফরিদগঞ্জ উপজেলার ৬৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মতলব দক্ষিণ উপজেলার ৫৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মতলব উত্তর উপজেলার ৫৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং হাইমচর উপজেলার ১৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ।
অন্যদিকে প্রজেক্টর পেয়েছে- সদর উপজেলা ৯৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কচুয়া উপজেলার ১০১ টি বিদ্যালয়, হাজীগঞ্জ উপজেলার ৭৬টি বিদ্যালয়, শাহরাস্তি উপজেলার ৫৫টি বিদ্যালয়, ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১২৭টি বিদ্যালয়, মতলব দক্ষিণ উপজেলার ৫৮টি বিদ্যালয়, মতলব উত্তর উপজেলার ১২৪টি বিদ্যালয় ও হাইমচর উপজেলার ৫৩টি বিদ্যালয়।
এই তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, সরবরাহকৃত যন্ত্রপাতির সংখ্যার সঙ্গে বাস্তব প্রাপ্তির ফারাক রয়েছে। স্কুলগুলোয় সরেজমিন তদন্তে অনেকেই দাবি করেছেন, তারা কোনো ল্যাপটপ বা প্রজেক্টর পাননি, অথচ কাগজে তাদের বিদ্যালয় ‘সরঞ্জামপ্রাপ্ত’ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সচেতন মহল বলছেন, এই অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ লোপাট হয়েছে। শিক্ষা খাতে এমন দুর্নীতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদ্বেগজনক। দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে শিক্ষক সমাজ, অভিভাবক এবং স্থানীয় সচেতন মহল।
চাঁদপুর সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ভবরঞ্জন দাস বলেন, জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জন্য বরাদ্দকৃত ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর আনতে যাতায়াত খরচের জন্য নেওয়া হয়েছে। আমরা যা করেছি আমাদের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার স্যারের নির্দেশে করেছি। ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর আনতে যাতায়াতের নামে উত্তোলনকৃত টাকার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বিষয়ে সবাই এড়িয়ে যান।
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফাতেমা মেহের ইয়াসমিন বলেন, জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জন্য বরাদ্দকৃত ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর কুমিল্লা থেকে আনতে যে খরচ হয়েছে সেজন্য নেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থাগ্রহণের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় শিক্ষক সমাজ ও অভিভাবকরা। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগে নানা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোরও যথাযথ ব্যবস্থা নেবার দাবি জানিয়েছেন অনেকে।

২৮ মে, ২০২৫।