জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব-৩
দেশের উপকূলের ১৭ শতাংশ এলাকা ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা…
১২ প্রজাতির মাছ ভয়ঙ্কর বিপদাপন্ন এবং ২৮ প্রজাতির মাছ বিপদাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত…
মাহবুবুর রহমান সুমন
জলবায়ুর বৈশ্বিক পরির্বতনে দেশের বৃহত্তর মেঘনাসহ ছোট-ছোট নদীর পানিতে ধীরে-ধীরে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে বিলুপ্তির পথে দেশীয় সুস্বাদু মাছ। এখনই এসব মাছ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করা গেলে এক সময় এসব মাছ পুরোপুরি হারিয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না বলে অভিমত দিয়েছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞরা।
এ কারণে তারা নদীর পানিতে লবণাক্ততা রোধে সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার বেড়িবাঁধগুলোর উচ্চতা আরও বৃদ্ধি করারও সুপারিশ করছেন। যদি মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যে বেশকিছু দেশীয় মাছ রক্ষায় তাদের গবেষণায় সফলতা লাভ করছে বলে জানিয়েছে।
বিপরীতে দেশীয় সুস্বাদু মাছ সংরক্ষণে বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনার জন্য যেসব উদ্যোগ বা সক্ষমতার প্রয়োজন তা বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যথেষ্ট নয় বলে আমাদের দেশের মৎস্য গবেষকরা দাবি করে আসছেন। ফলে বিদ্যমান জলবায়ু পরিবর্তনে কেবল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাই বাড়ছে না, দেশের উপকূলের ১৭ শতাংশ এলাকা ডুবে যাওয়ার আশঙ্কাও এখন বাস্তবের দিকেই যাচ্ছে।
তবে এই পরিস্থিতিতে বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় এমন শিং, মাগুর, পুঁটি, পাবদা, গুলশা, কৈ, ট্যাংরা, মেনি, ফলি, ভাগনা, গনিয়া, আইড় পুষ্টিসমৃদ্ধ ও সুস্বাদু মাছ রক্ষায় দেশের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট কাজ করে আসছে। মাঠ পর্যায়ে এসব মাছ উৎপাদন বাড়াতে চাষি ও জেলেদের উৎসাহ দিয়ে আসছেন বলে জানা গেছে।
দেশের এই মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি বিপন্ন প্রজাতির প্রায় ১৮টি মাছের প্রজনন ও চাষ কৌশল উদ্ভাবন করে চাষিদের প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসতে চাচ্ছেন। এজন্য তারা দেশের নদীগুলোর পানির পরিবেশ ঠিক রাখার পাশাপাশি খাল, বিল, হাওর, বাওর, ডোবা, নালাগুলোও সংরক্ষণের উপর জোর দিয়ে তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সুপারিশ করছেন।
দেশের একমাত্র মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ২শ’ ৬০ প্রজাতির স্বাদু পানির এবং ৪শ’ ৭৫ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ দেখতে পাওয়া য়ায়। এছাড়া ১২-এর বেশি প্রজাতির চাষকৃত বিদেশী মাছ দেশের জলাশয়ে চাষ হয়। তাদের তথ্যমতে মিঠা পানির ৫৪ প্রজাতির মাছ জলবায়ুগত বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে এখন হুমকির সম্মুখীন। তার মধ্যে ১২ প্রজাতির মাছ আছে ভয়ঙ্কর বিপদাপন্ন এবং ২৮ প্রজাতির মাছ বিপদাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বর্তমানে জলবায়ুর প্রভাবে যে হারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে উপকূলের সম্ভাব্য ১৭ শতাংশ এলাকাকে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার উদ্যোগ আগে গ্রহণ করতে হবে বলে তারা অভিমত দিয়েছে। তাহলে যেমন দেশের বড় কিংবা ছোট-ছোট নদীগুলোর পানিতে লবণাক্ততা রোধ করা সম্ভব হবে, তেমনি দেশীয় মাছ বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা অনেকটাই সম্ভব হবে।
এমন পরিস্থিতিতে বিলুপ্তপ্রায় মাছ রক্ষায় মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রজনন ও চাষ কৌশল উদ্ভাবনের পাশাপাশি নদী ও বদ্ধ জলাশয়ে দেশীয় মাছে অভয়াশ্রমের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। এজন্য প্রতিষ্ঠানটি আশা করছে দেশীয় মাছ রক্ষায় সরকার ও জেলেরাই শেষ পর্যন্ত অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
এমন পরিস্থিতিতে করণীয় হিসেবে চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছ সংরক্ষণের সক্ষমতা অর্জনে প্রতিষ্ঠানটি কাজ অব্যাহত রাখছে। তবে এমন উদ্যোগকে আরো গতিশীলতার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে সংশ্লিষ্ট সবার।
উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশের বৃহত্তর মেঘনা নদীর পানিতে ঋতুভেদে লবণাক্ততার পরিমাণ ১ থেকে ৭ পিপিটি। যা বড় ধরনের হুমকি হিসেবে চিহ্নিত। এখনি তা রোধ করা সম্ভব না হলে সামনে তা দেশের মাছের ক্ষতির প্রধান কারণ হবে।
১৫ অক্টোবর, ২০১৯।
