
নিবন্ধনহীন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান, সীমাহীন দুর্নীতি ও শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল
স্টাফ রিপোর্টার
শিক্ষাক্ষেত্রে সব ধরনের দুর্নীতি বন্ধে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি যেখানে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন সেখানে খোদ শিক্ষামন্ত্রীর জেলায় হাজীগঞ্জে সদ্য সরকারিকৃত হাজীগঞ্জ সরকারি মডেল কলেজে অধ্যক্ষের নেতৃত্বে চলছে লাগামহীন দুর্নীতি। নিবন্ধন সনদবিহীন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান, সীমাহীন আর্থিক দুর্নীতি ও শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ভেঙে পড়েছে হাজীগঞ্জ মডেল সরকারি কলেজের পুরো শিক্ষা কার্যক্রম। এমতবস্থায় আসন্ন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয় এবং উচ্চ শিক্ষা (ডিগ্রি, অনার্স ও মাস্টার্স) বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে করে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন।
নতুন অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল বাশার যোগদানের পর থেকে ঐতিহ্যবাহী এ কলেজটিতে নানা নাটকীয়তার জন্ম দেন। তার যোগদানের প্রথম দিন এ কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ড. মো. আলমগীর কবির পাটওয়ারী তাকে আন্তরিকতা দিয়ে সম্মানের সাথে বরণ করে নেন। কিন্তু উদার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা একজন মহান মানুষের আন্তরিকতাকে অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আবুল বাশার ভালো দৃষ্টিতে নেননি। তাই তাকে বরণ করার পর্বটি তিনি মেনে নিতে পারেননি বলে পত্র-পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশেন না করতে এবং হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক রাসেদ গাজী ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক মো. মজিবুর রহমান প্রভাব বিস্তার করে ফেসবুক থেকে ঐ দিনের বরণ অনুষ্ঠানের সব ছবি মুছে দিতে কলেজের শিক্ষক কাউছার আহমেদ (হিসাববিজ্ঞান), জিএম বেলায়েত (গণিত), আলী আকবর (সমাজকর্ম), মাহমুদুল হাসান (বাংলা), তৌহিদুল ইসলাম (সমাজকর্ম), মাজহারুল ইসলাম শাওন (ব্যবস্থাপনা), কামাল হোসেন (হিসাববিজ্ঞান), বিপ্লব কুমার (অর্থনীতি), জাহিদ হাছান (হিসাববিজ্ঞান), মারুফ হোসেন (হিসাববিজ্ঞান) সহ অন্যান্য শিক্ষকদের বাধ্য করেন। দীর্ঘদিনের সহকর্মীদের কাছ থেকে এমন ঘটনায় অধ্যক্ষ ড. মো. আলমগীর কবির পাটওয়ারী চরমভাবে ব্যথিত হন। নিজের শ্রমে-ঘামে প্রতিষ্ঠিত কলেজের শিক্ষকদের কাছ থেকে এমন অপ্রত্যাশিত আচরণে সেদিনের পর থেকে তিনি কলেজের কোন বিষয়েই আর আগ্রহ দেখাননি।
পুরো বিষয়টি কলেজ অঙ্গনে একটি ঘোলাটে পরিবেশ তৈরি করে। এতে করে শিক্ষকরা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। যার কারণে কলেজে চেইন অব কমান্ড সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে। কেউ কারো নির্দেশনা মানছেন না। এতবস্থায় কলেজের বিভিন্ন বিভাগীয় অফিসে শিক্ষকদের মধ্যে চরম উত্তেজনার মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
সরজমিনে জানা যায়, অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আবুল বাসার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই এক হঠকারি সিদ্ধান্তে, একক ক্ষমতা বলে প্রায় অর্ধশত অভিজ্ঞ শিক্ষকে বিনা নোটিশে কলেজ হতে চাকরিচ্যুত করেন। কলেজে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত একটি নিয়মকে ভেঙে দিয়ে তিনি উচ্চ মাধ্যমিকের তিনটি (মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা, বিজ্ঞান) ভিন্ন ভিন্ন শাখা বিলুপ্ত করে এক একটি শাখায় প্রায় ৪শ’ শিক্ষার্থীকে নিয়ে নতুন একটি করে শাখা রুপান্তর করেন। যা একজন শিক্ষকের পক্ষে পাঠদান এবং শিক্ষার্থীর পক্ষে পাঠ বুঝে উঠা মোটেও সম্ভব নয়। এতে করে দীর্ঘদিন ধরে বিভাগীয় দায়িত্ব পালন করে আসা শাখা প্রধানরা ক্ষুব্ধ হন।
তারা হতাশা ব্যক্ত করে জানান, অধ্যক্ষের এমন সিদ্ধান্তে আমরা বিষ্মিত। উচ্চ মাধ্যমিকের শাখা পদ্ধতির সুফল আমরা ভোগ করে আসছি। কিন্তু তিনি আমাদের সাথে কোনরূপ সমন্বয় ছাড়াই এমন স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তে কলেজে বিপর্যয় ডেকে আনার পাশাপাশি আসন্ন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ফলাফল বিপর্যয়ের হলে, এর দায় আমরা শাখা প্রধানরা কিংবা বিষয়বিত্তিক শিক্ষকরা নিবো না, অধ্যক্ষকেই নিতে হবে। তারা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আমরা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ড. মো. আলমগীর কবির পাটওয়রীর নেতৃত্বে সু-শৃঙ্খলভাবে, একটি প্রতিষ্ঠিত নিয়মের মধ্যে দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছিলাম। কিন্তু তিনি সবাইকে হতবাক করে আগের সব নিয়মকে অনিয়মে রূপান্তর করে কলেজ প্রশাসনে একটি হ-য-ব-র-ল অবস্থা তৈরি করেন।
প্রফেসর আবুল বাশার অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে হাজীগঞ্জ সরকারি মডেল কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পান। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি প্রায় সাড়ে ৬ হাজার শিক্ষার্থীর এ কলেজের টাকার দিকে নজর দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষক বলেন, অধ্যক্ষ নিজেকে মাউশির কর্মকর্তা দাবি করে একক ক্ষমতা বলে টাকা সরিয়ে নিজের পকেট ভারী করতে কলেজের আয়ের কোন পরিবর্তন না হওয়া সত্বেও তিনি অভিজ্ঞ প্রায় অর্ধশত শিক্ষককে বিনা নোটিশে বাদ দেন, কলেজের ডিজিটাল কার্যক্রম বন্ধ করাসহ বেশ কিছু শিক্ষার্থীবান্ধব কার্যক্রম স্থগিত করে দেন। তিনি কলেজের মোটা অঙ্কের আয় দেখে, নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য আমাদের চাকরি সরকারিকরণ স্থগিত করবেন বলে ভয় দেখিয়ে বিভ্রান্ত করে কারণে অকারণে লিখিত-অলিখিত নোটিশ করেন। যা প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ড. মো. আলমগীর কবির পাটোওয়ারী দ্বারা কখনই ঘটেনি। এখান থেকেই কলেজটিতে শিক্ষকদের মধ্যে সব গ্রুপিংয়ের সূত্রপাত বলে শিক্ষকরা নিশ্চিত করেন।
অধ্যক্ষের আর্থিক অনিয়মের প্রমাণস্বরূপ তারা বলেন, অধ্যক্ষ প্রথমে কলেজের পরীক্ষা কমিটির কাছে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা সংক্রান্ত আয় থেকে অযৌক্তিকভাবে ২০% দাবি করেন। পরীক্ষা কমিটির একজন সদস্য অধ্যক্ষের নির্ধারিত ৮% পাওনার প্রজ্ঞাপন দেখালেও তিনি মানতে নারাজ। এতে করে কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। এসব বিষয়ের দ্বন্দ্বের বলি হচ্ছে হাজার-হাজার শিক্ষার্থী।
অধ্যক্ষের দুর্নীতিতে উঠে এসেছে আরো চমকপ্রদ তথ্য। অতিসম্প্রতি সরকার যেখানে সব প্রকার কোচিং ও নিজ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে নিষিদ্ধ করেছেন, সেখানে কলেজ অধ্যক্ষ নিজ ক্ষমতা বলে নিজস্ব শিক্ষকমন্ডলী দিয়ে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর কাছে হতে এক হাজার টাকা করে প্রায় দশ লাখ টাকা আদায় করে নিজের পকেট ভারী করেছেন। অথচ এসব শিক্ষার্থীরা আগামি জুন, ২০২০ পর্যন্ত ২ বছরের প্রায় ২৭ হাজার টাকা কোর্স ফি নামে দিয়েছে। বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকার যেখানে শিক্ষাকে অবৈতনিক করতে যাচ্ছেন, ছাত্রীদের ৪০% উপবৃত্তি দিচ্ছেন, তাহলে কেন এই অমানবিক কোর্স ফি এবং কোচিং ফি নিচ্ছে মডেল কলেজ! বিষয়টি সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে খতিয়ে দেখার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী অভিভাবকরা।
অধ্যক্ষের সবচেয়ে জঘন্য হঠকারি সিদ্ধান্ত হলো, কলেজের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নির্বাহের আর্থিক সামর্থ থাকার পরও অভিজ্ঞ প্রায় অর্ধশত শিক্ষককে বিনা নোটিশে চাকরিচ্যুত করে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে নিবন্ধন সনদবিহীন অনভিজ্ঞ শিক্ষক দিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক, ডিগ্রি, অনার্স ও মাস্টাসের ক্লাস কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যা সরকারি-বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতা করার কোন নিয়মের মধ্যে পড়ে না। বিশেষ করে শিক্ষকতা পেশায় আসার জন্য পূর্বশর্ত এনটিআরসি কর্তৃক নিবন্ধন সনদ। যা হাজীগঞ্জ মডেল সরকারি কলেজের নিম্নলিখিত শিক্ষকদের কারই নেই। তাৎক্ষণিকভাবে যাদের নাম নেয়া সম্ভব হয়েছে এরা হলেন- মাহমুদুল হাছান (বাংলা), রোকসানা আক্তার (বাংলা) বেনজির আক্তার (বাংলা), কাউছার হোসেন (বাংলা), শাখাওয়াত হোসেন (ইংরেজি), আরিফ পাঠান (ইংরেজি), আলী আকবর (সমাজকর্ম), তৌহিদুল ইসলাম (সমাজকর্ম), রোকেয়া ইসলাম (সমাজকর্ম), মোনায়েন খান (সমাজকর্ম), ওয়ালী উল্লাহ (ব্যবস্থাপনা), মাজহারুল ইসলাম (ব্যবস্থাপনা), কামাল হোসেন (হিসাববিজ্ঞান), জাহিদুল ইসলাম (হিসাববিজ্ঞান), মারুফ হোসেন (হিসাববিজ্ঞান), মো. জাহিদ (রসায়ন), সাদ্দাম হোসেন (মার্কেটিং) প্রমুখ।
খণ্ডকালীন শিক্ষকদের মধ্যে তিন-চার জন ছাড়া কারই নিবন্ধন সনদ ও যোগ্যতা নেই। যারা ফলে কলেজে শিক্ষা কার্যক্রম চরমভাবে ভেঙে পরেছে। এতে কলেজের বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষের প্ররোচনায় শ্রেণিকক্ষমুখী না হয়ে, প্রাইভেটমুখী হচ্ছে। এতে আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষায় ফলাফল বিপর্যয় হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে অভিভাবকরা বলেন, এমন অদক্ষ শিক্ষক দ্বারা পাঠদানের ফলে শিক্ষার মান ও শিক্ষাকার্যক্রম ক্রমেই নিম্নগামী হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাবে হাজীগঞ্জ সরকারি মডেল কলেজে অনার্স কোর্স বন্ধসহ অচিরেই তার দীর্ঘদিনের সুনাম ও ঐতিহ্য হারাবে।
এ বিষয়ে অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আবুল বাশারের কাছে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে বলেন, আমি কোন শিক্ষককে চাকরিচ্যূত করিনি, করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। এছাড়া অন্যান্য বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি কোন বক্তব্য দিতে পারবো না। আপনি সরাসরি কলেজে এসে দেখা করেন বলে মোবাইল ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ড. মো. আলমগীর কবির পাটওয়ারীর কাছে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনিও তাতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
এলাকার সচেতন মানুষের পক্ষে কয়েকজন জানান, বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার পাঁয়তারায় থাকায় কলেজটির দুর্নীতিবাজ অধ্যক্ষ এবং শিক্ষকদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের লিখিত অভিযোগ শিক্ষামন্ত্রীর হাতে তুলে দিতে এবং দুদকের কাছে পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
