নাশকতার দাবি ক্ষতিগ্রস্তদের, কোটি টাকার ক্ষতি
মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
হাজীগঞ্জে গভীর রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৪টি দোকানঘর পুড়ে কোটি টাকার ক্ষতিসহ প্রায় ১০ হাজার পুরানো দলিল পুড়ে ভস্মীভূত হয়েছে। গত শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে হাজীগঞ্জ বাজারস্থ স্টেশন রোডে পৌর মার্কেটে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনে মার্কেটের ১৩টিসহ পাশের একাধিক দোকান পুড়ে যায়।
ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলোর মধ্যে টাইলস এন্ড স্যানেটারি, প্রিন্টার্স (ছাপাখানা), দলিল লিখক, কম্পিউটার কম্পোজ ও প্রিন্ট, কনফেকশনারি দোকান রয়েছে। পুড়ে যাওয়ার দোকানগুলোর মধ্যে অধিকাংশ দলিল লিখকের অফিস-ঘর। এর মধ্যে অন্তত ২০ জন দলিল লিখকের প্রায় ১০ হাজার দলিল ও কয়েক লাখ টাকার স্ট্যাম্প পুড়ে যায়।
ক্ষতিগ্রস্ত দলিল লিখকরা হলেন- শাহাদাত হোসেন, মামুনুর রশিদ স্বপন, মাসুদ হাওলাদার, সফিকুল ইসলাম হাওলাদার, সাহাব উদ্দিন রিপন, আক্তার হোসেন, সাহাব উদ্দিন মজুমদার, ফটিক, মামুন কাজী, হেলাল উদ্দিন, তানভীর হোসেন, আব্দুল মালেক ও আনোয়ার হোসেন। তাদের সাথে আরো শিক্ষানবীস দলিল লিখক রয়েছেন।
এছাড়া আগুনে মাসুদ কম্পিউটার এন্ড ফটোস্ট্যাট, ইয়াছিন কম্পিউটার এন্ড ফটোস্ট্যাট, জননি প্রিন্টার্স, মদিনা টাইলস্ এন্ড স্যানেটারী ও কাউছারের কনফেকশনারী দোকান পুড়ে যায়।
জানা গেছে, শুক্রবার দিবাগত রাতে পৌর মার্কেটের দক্ষিণ পূর্ব পাশের দোকানে আগুন দেখতে পেয়ে পল্লী বিদ্যুৎ ও ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন এবং ডাক-চিৎকার করে স্থানীয়দের খবর দেন প্রত্যক্ষদর্শী মাইনুদ্দিন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা স্থানীয় তরুণ ও যুবকদের সহযোগিতায় প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।
এর মধ্যে আগুনে ১৪টি দোকানঘর ও দোকানে থাকা অন্তত ২০ জন দলিল লেখকের প্রায় ১০ হাজার পুরানো দলিল, খতিয়ানসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, কয়েক লাখ টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, অর্ধ শতাধিক কম্পিউটার ও প্রিন্টার মেশিন, ছাপাখানার মেশিন, কনফেকশনারী দোকানের টিভি, ফ্রিজ, টাইলসের দোকানের টাইলস ও স্যানেটারী মালামালাসহ প্রায় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ক্ষতিগ্রস্তরা দাবি করেন।
এদিকে আগুন নেভাতে গিয়ে বেশ কয়েকজন তরুণ ও যুবক আহত হয়েছেন। এসময় হাজীগঞ্জ আর্মি ক্যাম্প ও থানা পুলিশ আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্ব পালন করেন। ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্ট-সার্কিটে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত দলিল লিখকরা এই অগ্নিকান্ডকে নাশকতা বলে দাবি করেন।
কারণ, হিসেবে দলিল লিখক আকতার হোসেন সংবাদকর্মীদের জানান, ৮/১০ দিন আগে তাকে কথায় কথায় একজন লোক বলেছেন, সবাই যেন গুরুত্বপূর্ণ মালামাল সরিয়ে নেয়। তখন বিষয়টির গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আর এখন ৮/১০ দিন পর তাদের সবকিছু আগুনে পুড়ে গেছে। বিষয়টি সন্দেহজনক ও রহস্যজনক।
অপর দলিল লিখক মামুনুর রশিদ স্বপন ও কম্পিউটার এন্ড ফটোস্ট্যাট দোকানের মাসুদ জানান, পৌরসভা থেকে তাদের দোকান ঘরের বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। এরপর তারা জেলা প্রশাসকের কাছে। তিনি বিষয়টি দেখে, তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন এবং তাদেরই দোকানঘর বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলেন।
তারা সংবাদকর্মীদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, দোকান বরাদ্দের জন্য জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী তাদের কাছে এক কোটি টাকা চেয়েছেন। তারা এতো টাকা কোথায় থেকে দিবেন। এরপর মার্কেটে আগুন। দোকান ঘরগুলো পুড়ে তাদের জীবন-জীবিকার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। এসময় তারা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
স্থানীয়রা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ফোন পেয়ে কিছু সময়ের মধ্যেই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে এলাকার তরুণ ও যুবকদের সহযোগিতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। তা নাহলে হয়তো শতাধিক দোকানঘর পুড়ে যেতো। এসময় তারা জানান, দলিলপত্র (কাগজপত্র) থাকার কারণেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
দলিল লিখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ বিল্লাল হোসেন জানান, প্রায় ১০ হাজার পুরানো দলিলসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পুড়ে গেছে। এতে চরম ক্ষতিগ্রস্তের শিকার হয়েছেন ১৫-২০ জন দলিল লিখক। তিনি বলেন, আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের দলিলগুলো নিয়ে দলিল লিখকদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হবে।
পৌরসভার বাজার পরিদর্শক খাজা সাফিউল বাসার রুজমন জানান, জেলা পরিষদ থেকে ইজারা নিয়ে মার্কেট নির্মাণ করার পর হাজীগঞ্জ পৌরসভা গত দুই যুগেরও বেশি সময় স্থানীয়ভাবে দোকানঘর ভাড়া দিয়ে আসছে। এর মধ্যে জেলা পরিষদ পৌরসভার ইজারা বাতিল করে। তাই, পৌরসভাও ভাড়াটিয়াদের দোকান ঘরের বরাদ্দ বাতিল করে নোটিশ দেয় এবং দোকান ঘর বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলে।
পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনে আল জায়েদ হোসেন জানান, পৌরসভার ইজারা বাতিল হওয়ার পর নিময় অনুযায়ী ভাড়াটিয়াদের বরাদ্দও বাতিল করে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
এদিকে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, ভাড়াটিয়ারা জেলা পরিষদ কার্যালয়ে আসলে তাদের প্রতিটি দোকানঘরের পজিশন অনুযায়ী ১০/১২ লাখ টাকা এবং সে অনুযায়ী ওই মার্কেটে দোকান বরাদ্দ বাবদ এক-দেড় কোটি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। যেহেতু এই ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভার ভাড়াটিয়া হিসেবে ছিলেন, তাই তাদের অগ্রাধিকারের কথাও বলা হয়েছিল।
এ বিষয়ে হাজীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ফারুক বলেন, স্থানীয় তরুণ ও যুবকদের সহযোগিতায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। ওই সময়ে পুলিশ সদস্যরা আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্ব পালন করেছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।
২৩ মার্চ, ২০২৫।