হাইমচরের ২ মুক্তিযোদ্ধা আজো তালিকাভুক্ত হতে পারেনি

মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্ত্র গুদাম পাহাড়া ও যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী

রিয়াদ হোসেন/ সাহেদ হোসেন দিপু
হাইমচর উপজেলার পশ্চিমচর কৃষ্ণপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের মাস্টার ও মোহাম্মদ আলী পাটওয়ারী মুক্তিযুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র গুদাম পাহাড়া ও প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা বিএলএফের ২ সদস্য আজো মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হতে পারেননি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বেঁচে থাকাকালীন অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চান প্রকৃত এই মুক্তিযোদ্ধারা।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, হাইমচর উপজেলার তৎকালীন পশ্চিমচর কৃষ্ণপুর গ্রামের ৫ মুক্তিযোদ্ধা ১. আবুল খায়ের মাস্টার, ২. মোহাম্মদ আলী পাটওয়ারী, ৩. গোলাম রাব্বানী, ৪. বশির উল্লাহ বেপারী ও ৫. আ. রাজ্জাক মুক্তিযুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র গুদাম পাহাড়া দিয়েছিলেন। প্রথমে গন্ডামারা গ্রামের সেখান থেকে আলগী বাজারের উত্তর পাশে সোনা মিয়া সরদার বাড়ি ও সর্বশেষ অমর চান মাস্টারের বাড়িতে। রাত-দিন পালাক্রমে অমর চান মাস্টারের বাড়ির বসত-ঘরকে অস্ত্র গুদাম হিসেবে ব্যবহার করেন। তার চার কোনায় ৪ জন পালাক্রমে পাহাড়া দিয়েছেন। বাগরা বাজারের উত্তর পাশে ডাকাতিয়া নদীতে পাক হানাদার বাহিনীর অস্ত্র ও খাদ্র সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার সময় তৎকালীন চাঁদপুর দক্ষিণাঞ্চল কমান্ডার সৈয়দ আবেদ মুনচুর ও সহকারী কমান্ডার আবুল হোসেন ঢালীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে জীবন বাজি রেখে অক্টোবরের শেষের দিকে আক্রমন করে পাক সেনাদের পরাজিত করেন এ ২ বিএলএফ সদস্যসহ মুক্তিযোদ্ধারা। পাক সেনাদের অস্ত্র ও খাদ্যসামগ্রী পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের গতি তরান্বিত করেছিল। তৎকালীন ২নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগিনা শেখ ফজলুল হক মনি। শেখ ফজলুল হক মনির অধীনে এবং সৈয়দ আবেদ মুনচুরের নেতৃত্বে আবুল খায়ের মাস্টার ও মোহাম্মদ আলী পাটওয়ারী মুক্তিযুদ্ধের সময় জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেন এবং অস্ত্রগুদাম পাহাড়া দেন। মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে আসেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে তৎকালীন ঢাকা স্টেডিয়ামে ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারী কমান্ডার সৈয়দ আবেদ মুনচুরের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর হাতে নিজের ব্যবহৃত অস্ত্র জমা দেন। দেশ স্বাধীন হলে মোহাম্মদ আলী পাটওয়ারী বাংলাদেশ বিমানে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ও আবুল খায়ের মাস্টার তার সপ্রাবির যোগদান করে দেশ সেবায় মনোনিবেশ করেন। মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী পাটওয়ারী মুক্তিযুদ্ধের পর শেখ ফজলুল হক মনি স্বাক্ষরিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে মুক্তিযুদ্ধে বিএলএফ সদস্য হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণের স্বীকৃতির সনদপ্রাপ্ত হন। আবুল খায়ের মাস্টার বাংলাদেশ মুক্তি ফ্রন্ট চাঁদপুর থানা শাখা কর্তৃক মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সনদপ্রাপ্ত হন। যার নং ২৭৬। এই ২ মুক্তিযোদ্ধার সহযোদ্ধা গোলাম রাব্বানী ও বশির উল্লাহ বেপারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়ে তালিকাভুক্ত হন। অপর সহযোদ্ধা আ. রাজ্জাক মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পেয়ে মনোকষ্টে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ২০১৭ সালের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই শুরু হলে ২ মুক্তিযোদ্ধা প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র যাচাই-বাছাই কমিটির কাছে জমা দেন। হাইমচর থেকে ৩০ জনের একটি তালিকা মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে যাচাই-বাছাই তালিকাতে আবুল খায়ের মাস্টারের নং ১১ ও মোহাম্মদ আলী পাটওয়ারীর নং ১২। সে তালিকার আজো বাস্তবায়ন হয়নি। শোনা যাচ্ছে আবারো এ তালিকা হতে নতুন করে যাচাই-বাছাই করা হবে।
এ ২ মুক্তিযোদ্ধার দাবি, আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন কামন্ডার সৈয়দ আবেদ মুনচুর আমাদের কামন্ডার হিসেবে তিনি দেশে থাকলে রাজস্বাক্ষী হতেন। আমরা যে যে বাড়িতে অস্ত্র গুদাম পাহাড়া দিয়েছিলাম সে বাড়িতে বিশেষ করে অমর চান মাস্টার আজও জীবিত আছেন। তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তার বাড়িতে ১ মাসের বেশি যে পাহাড়া দিয়েছে তার স্বাক্ষী দিবেন। আবুল খায়ের মাস্টারের বাড়ি ছিলো অমর চান মাস্টারের পাশের বাড়ি। আবুল খায়ের মাস্টারের বাড়ি হতেই তাদের খাদ্য সরবরাহ করা হতো।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে সপ্রাবির অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অমর চান মাস্টার এ প্রতিনিধিকে জানান, মোহাম্মদ আলী ও আবুল খায়ের মাস্টার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তারাসহ ৫জন মুক্তিযোদ্ধা আমার এই ঘরটিতে অস্ত্র রেখে পালাক্রমে ৪ কোণায় ৪ জন পাহাড়া দিতেন। আমার দুঃখ হয় অনেক অমুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলেও ৫ জনের মধ্যে বেঁচে থাকার এ ২ জন আজো স্বীকৃিত পাননি। এ সম্পর্কে মোহাম্মদ আলী পাটওয়ারী আক্ষেপের স্বরে বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধকালীন জীবনবাজী রেখে যুদ্ধ করলাম, অস্ত্র গুদাম পাহাড়া দিলাম কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আজো পেলাম না। শেষ বয়সে এসে জননেত্রী শেখ হাসিনার নিকট দাবি তিনি যেন আমাকে মৃত্যুর পূর্বে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ব্যবস্থা করেন।
আবুল খায়ের মাস্টার বলেন, আমার সহযোদ্ধা ৫ জনের ২ জন মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পেয়ে দুনিয়া হতে বিদায় নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার একটাই চাওয়া আমাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত করা হোক।