সুপার সাইক্লোনে পরিণত ‘মোখা’ : চাঁদপুরে ৩৫৩ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত

স্টাফ রিপোর্টার
সুপার সাইক্লোনে পরিণত হয়েছে মোখা। শনিবার (১৩ মে) রাত ৯টার সময় অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড়টি সুপার সাইক্লোনে রূপ নিয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী পরিচালিত জয়েন্ট টাইফুন ওয়ার্নিং সেন্টার। ফেসবুকের এক পোস্টে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক পিএইচডি গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ।
এর আগের এক পূর্বাভাসে তিনি জানিয়েছিলেন, রাত ৩টা থেকে ভোর ৬টার মধ্যে ঘূর্ণিঝড় মোখার অগ্রবর্তী অংশ সেন্টমার্টিন দ্বীপে আঘাত হানতে শুরু করবে। ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই কক্সবাজার জেলার ওপর দিয়ে অতিক্রম করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন এ গবেষক।
এদিকে, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসেও বলা হয়েছে, মোখা বর্তমান গতিতে অগ্রসর হতে থাকলে শনিবার মধ্যরাত নাগাদ কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও বরিশালসহ তৎসংলগ্ন এলাকায় প্রভাব ফেলতে শুরু করতে পারে। এর ফলে প্রবল বাতাস, বৃষ্টি ও ঢেউ উপকূলে আঘাত হানবে, যা বিধ্বংসী পরিণতি বয়ে আনতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এ অবস্থায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ এ অঞ্চলের সবাইকে সরকারি নির্দেশনা মেনে নিরাপদ আশ্রয় থাকার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
শনিবার সন্ধ্যায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১৬ নম্বর বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় মোখা উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর ও আরও ঘণীভূত হয়ে একই এলাকায় অবস্থান করছে। এটি শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৬০৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৫২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৬২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল। ছয় ঘণ্টায় এটি প্রায় ১০০ কিলোমিটার এগিয়েছে।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’ চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েছে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসন। দুর্যোগপূর্ণ সময়ে নদী উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৩৫৩টি আশ্রয়কেন্দ্র। একই সঙ্গে নগদ অর্থ ও শুকনো খাবার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
গত শুক্রবার এসব তথ্য জানান জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান। তিনি বলেন, জেলার ৮ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভাও হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ইমতিয়াজ হোসেন ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গৃহীত পদক্ষেপসমূহের তথ্য গণমাধ্যমে পাঠিয়েছেন। প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়, ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’ মোকাবিলায় জেলা ও উপজেলা কার্যালয়সমূহে নিয়ন্ত্রণকক্ষ খোলা হয়েছে। জেলার নিয়ন্ত্রণকক্ষের নম্বরগুলো হচ্ছে-০১৭০০৭১৬৭০১, টেলিফোন নম্বর : ০২৩৩৪৪৮৭৫৯৬ অথবা ০২৩৩৪৪৮৭৪৭২, ই-মেইল : drrochandpur123@gmail.com
কৃষি বিভাগকে বতর্মান মৌসুমে উৎপাদিত ফসল কাটা, স্বাস্থ্য বিভাগকে জরুরি মেডিকেল টিম গঠন এবং ঔষুধ মওজুদ রাখা, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগকে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা, জেলা পুলিশ, কোস্টগার্ড ও আনসারকে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে সার্বিক দিক নির্দেশনা, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগকে দুর্যোগ-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উদ্ধারকাজে প্রস্তুত থাকা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রেডক্রিসেন্ট, জেলা স্কাউট, জেলা রোভার স্কাউট ও বিএনসিসিসহ এনজিও প্রতিষ্ঠানসমূহকে দল প্রস্তুত রাখা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাইকিং করে সতকর্তামূলক প্রচারণার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া মজুদ রাখা হয়েছে পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী। এর মধ্যে রয়েছে নগদ ১৭ লাখ ১৫ হাজার টাকা, চাল ৫০৫.০০০ মেট্রিক টন, ডেউটিন ও গৃহ নির্মাণ মঞ্জুরী ১০ বান্ডিল, শুকনো খাবার ১৯০ প্যাকেট এবং শীতবস্ত্র (কম্বল) ৩৮৪০ পিস।
চাঁদপুর জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ শাখার সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী জেলা সদরে ২৯টি, ফরিদগঞ্জে ৩১টি, হাইমচরে ২৪টি, হাজীগঞ্জে ৪৪টি, কচুয়ায় ৫১টি, মতলব উত্তরে ৬২টি, মতলব দক্ষিণে ৮৮টি, শাহরাস্তিতে ২৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে ১ লাখ ১৪ হাজার ৫৬৭ জন থাকার ধারণ ক্ষমতা রয়েছে।
এদিকে, চাঁদপুর পদ্মা, মেঘনা, ডাকাতিয়া নদী উপকূলীয় এলাকায় সচেতনতামূলক মাইকিং অব্যাহত রেখেছে কোস্টগার্ড। একই সঙ্গে শহর ও আশপাশে ঘূর্ণিঝড় মোখা সম্পর্কে সর্বসাধারণকে সতর্ক থাকার জন্য প্রচারণা চালাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স।
নৌ-পুলিশ চাঁদপুর অঞ্চলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুজ্জামান জানান, ঘূর্ণিঝড় মোখা পূর্ব এবং পরবর্তী সময়ের সতর্কতা বিষয়ে আমাদের নৌ-অঞ্চলে মাইকিং করে প্রচারণা চলছে। চাঁদপুর, শরীয়তপুর, লক্ষ¥ীপুর ও কুমিল্লা জেলার যেসব থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে সবাইকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে জনগণের জান-মালের নিরাপত্তার জন্য কাজ করছি এবং করবো। বিশেষ করে লঞ্চঘাট ও ছোট নৌযানগুলো নিরাপদে রাখার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

১৪ মে, ২০২৩।