মৃত্যুফাঁদ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে হাজীগঞ্জ-কচুয়া-গৌরিপুর সড়ক

অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনা, প্রয়োজন জরুরি পদক্ষেপ

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
নিত্যদিনের অহরহ সড়ক দুর্ঘটনায় যেন মৃত্যুফাঁদ হিসাবে পরিচিতি পাচ্ছে হাজীগঞ্জ-কচুয়া-গৌরিপুর সড়ক। আর দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে বিভিন্ন যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষে। গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে খাদে, পুকুর ও খালে পড়ে কিংবা পথচারিকে রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়ি চাপা দিয়ে।
দেখা গেছে, এই সড়কটির চাঁদপুর সড়ক বিভাগের আওতায় ৩২ কিলোমিটোরের মধ্যে হাজীগঞ্জ-কচুয়া সড়কের ১৪ কিলোমিটারে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে।
এসব দুর্ঘটনায় শুধু মানুষের মৃত্যু নয়, অনেককে চিরদিনের জন্য পঙ্গু করে দেয়। এতে হঠাৎ করে বিপর্যয় নেমে আসে এক বা একাধিক পরিবারে। দুর্বিষহ হয়ে উঠে তাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবন। আর সেই শোক গোটা পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের বুকে বিঁধে থাকে সারা জীবন। বইতে হয় অপূরণীয় ক্ষতির বোঝা।
সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে যানবাহনের অতিরিক্ত গতি ও চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো, ওভার লোড, ওভারটেকিং, অদক্ষ, অপ্রাপ্ত ও লাইসেন্স বিহীন চালক, গাড়িগুলো দ্রুতবেগে ব্রিজে ওঠার সময়কে দায়ী করছেন, জনপ্রতিনিধি ও পথচারী এবং সড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকার স্থানীয়রা। আবার অনেকে ট্রাফিক আইন না মানা, সড়কে সাইন সিগনাল না থাকাসহ সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে পথচারীদেরও দায়ী করেছেন।
জানা গেছে, হাজীগঞ্জ-কচুয়া-গৌরিপুর সড়কটি ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে সংস্কার ও বাক সরলীকরণ হওয়ায় এবং সড়কের দূরত্ব কমে যাওয়ায় নোয়াখালী জেলার একাংশ, লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ ও রায়পুর এবং হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ, শাহরাস্তি অঞ্চলের মানুষ হাজীগঞ্জ-কচুয়া ও গৌরিপুর হয়ে রাজধানীতে (ঢাকা) যাতায়াত করে। এতে করে সড়কে যাত্রীবাহী ও মালবাহী যানবাহন চলাচল বেড়েছে।
আর সড়কে যানবাহন চলাচল বেড়ে যাওয়ায় এই সড়কের হাজীগঞ্জ-কচুয়া ও সাচার পর্যন্ত এলাকার বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনা। স্থানীয়দের তথ্যমতে গত ও চলতি বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়েছে ২৫ প্রাণ এবং আহত হয়েছেন শতাধিক ব্যক্তি। সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনে গেলে সড়কটিতে ব্যাপকহারে বালুবাহী ট্রাক, সিএনজিচালিত স্কুটার, মাইক্রো ও প্রাইভেট কারগুলো বেপোরোয়া গতিতে চলাচল করতে দেখা গেছে।
এলাকাবাসী দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান হিসেবে সড়কটির কচুয়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের নিলাম পাড়া ব্রিজ, দীঘির পাড়, তেতিয়াগাছা ব্রিজ, ডুমুরিয়া গাউছিয়া ছোবহানিয়া আলীম মাদ্রাসা সংলগ্ন এলাকা, কালচোঁ বাজারের কালভার্ট টার্নিং ও কালচোঁ বাজার এলাকা, হাজীগঞ্জ উপজেলার পাতানিশ বারিক্কার ব্রিজ, পাতানিশ বাজার ও কাঁঠালি বাজার সংলগ্ন এলাকা, পৌরসভাধীন বদরপুর ও হাজীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কাজীরগাঁও ব্রিজ সংলগ্ন এলাকাকে চিহ্নিত করেছেন।
কথা হয়, কচুয়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের সালাউদ্দিন, কালচোঁ বাজারের ব্যবসায়ী সুলতান স্টোরের স্বত্বাধিকারী দিদার হোসেন, হাজীগঞ্জ উপজেলার পাতানিশ গ্রামের সালেহা বেগম ও পৌরসভাধীন বদরপুর গ্রামের জসিম উদ্দিনের সাথে। তারা সবাই বলেন, সড়কটিতে প্রতিনিয়ত, এমনকি একদিনে একাধিক দুর্ঘটনাও ঘটছে।
এসব দুর্ঘটনার জন্য যানবাহনের দ্রুত ও বেপরোয়া গতি, অদক্ষ ও অপ্রাপ্ত বয়সের চালক এবং সড়কের অতিরিক্ত টার্নিংকে তারা দায়ী করেছেন। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে তারা ব্যাপক হারে বালুবাহী পিকআপ, সিএনজিচালিত স্কুটার ও মিশুকের বেপরোয়া চলাচল নিয়ন্ত্রণ, সড়কের পাশে অবস্থিত ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার এলাকা ও বিভিন্ন মোড় (বাঁক) সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্পিডবেকার (গতিরোধক) নির্মাণের দাবি জানান।
একই দাবি করে হাজীগঞ্জ উপজেলার হাটিলা পশ্চিম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ জাকির হোসেন লিটু জানান, এই সড়কে যানবাহনের দ্রুতগতিই সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। তাই গাড়ির সর্বোচ্চ গতিসীমা বেঁধে দিয়ে তা মনিটরিং করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের চাঁদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুল্লাহ ভূঞার সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, হাজীগঞ্জ-কচুয়া সড়কে কোন সমস্যা নেই এবং বিভিন্ন স্থানে সাইন সিগনালও রয়েছে। শুধুমাত্র কচুয়া-গৌরিপুর সড়কের ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে ৮ কিলোমিটারের কাজ বাকি আছে। বর্তমানে এই ৮ কিলোমিটার মেইনটেনেন্স করে ঠিক রাখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বরাদ্দ পেলে বাকি কাজও সম্পন্ন করা হবে। এ সময় তিনি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে চালকদের প্রতি গতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাইন সিগনাল দেখে গাড়ি চালানোর পরামর্শ দেন তিনি।

২৮ জুন, ২০২১।