মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
ছোট্ট কোমলমতি পা দুটি উঁচু করে, নরম তুল তুলে হাত দিয়ে শক্ত করে জানালার গ্রিল ধরে উঁকি-ঝুঁকি, মাকে দেখার চেষ্টা করছে। আর মা-মা বলে ডাকছে বছর তিনেকের ক্ষুদে ছেলে। তবুও সাড়া মিলছে না। মায়ের সাড়া না পেয়ে, চিৎকার, চেঁচামেচি- তারপর কাঁদতে শুরু করা।
এভাবেই বাচ্চাটা সারাদিন কেবল মাকে ডাকছে। মায়ের কাছে যেতে চাওয়া ছাড়া আর একটি কথাও বলে না। অথচ মা, কক্ষেই অবস্থান করছেন। কোন সাড়া-শব্দ নেই, নীরবেই বসে আছেন। ছেলের কান্নায়, এতটুকু মন গলেনি তাঁর।
পাঠক ভাবছেন, এ কেমন মা। ঘরে থেকেও সন্তানের ডাকে সাঁড়া দিচ্ছেন না। তিনি কি অভিমান করে বসে আছেন, নাকি লুকোচুরি খেলছেন? না তিনি (মা) অভিমানও করেননি, আর লুকোচুরি খেলছেন না। তবে ভবনের একটি কক্ষে বসে নীরবে কাঁদছেন।
কারণ, তিনি করোনা পজেটিভ। তাই, শিশু সন্তান দ্বিজরাজসহ পরিবারের সবার কাছ থেকে আলাদা রয়েছেন। বলছি, হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বৈশাখী বড়ুয়ার কথা।
তিনি করোনা ঠেকাতে, প্রান্তিক মানুষের সেবা নিশ্চিতকরণে ত্রাণ বিতরণ, কোয়ারেন্টাইন বাস্তবায়ন, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে সম্মুখভাগের যোদ্ধা হয়ে মাঠ প্রশাসনে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন। দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট সতর্ক থাকলেও, সংক্রমণ এড়ানো সম্ভব হয়নি তাঁর।
গত ২৯ এপ্রিল ইউএনও’র করোনা পজিটিভের বিষয়টি নিশ্চিত করেন সিভিল সার্জন। এরপর থেকেই তিনি হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন। এর আগে ২৭ এপ্রিল নমুনা পরীক্ষা করান তিনি। তবে কোন উপসর্গ না থাকলেও মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন সেই কৌতুহলবশত নমুনা পরীক্ষা করান।
এদিকে সরকারি বাসভবনে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকায় পরিবারের সবার কাছ থেকে আলাদা থাকতে হয় ইউএনওকে। কিন্তু তাঁর একমাত্র শিশু সন্তান কি বুঝে হোম কোয়ারেন্টাইন কি? সারাক্ষণ ‘মা, মা’ বলে চিৎকার-চেঁচামেচি, তারপর কাঁদতে শুরু করা।
এ বিষয়টি ফেসবুক তুলে ধরেছেন নরসিংন্দি জেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম। তিনি হাজীগঞ্জে বেশ কয়েক বছর কাজ করেছেন। পাঠকদের উদ্দেশে তাঁর স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো-
আপাতদৃষ্টিতে বাচ্চাদের লুকোচুরি খেলার ছবি এটি; কিন্তু না এর ভিতরে আছে বুকে চিন চিনে ব্যথার গল্প! আমাদের সবার প্রিয় মানুষটির একমাত্র ছেলে দ্বিজরাজ উঁকি দিয়ে তার মাকে দেখছে। মা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। করোনা শুরুর প্রথম দিন থেকেই উপজেলা আনাচে-কানাচে ছোটাছুটি করেছেন উপজেলাকে করোনা মুক্ত রাখতে …তিনি তার কাজে সফল, কিন্তু নিজে আক্রান্ত।
এরকম হাজারো গল্প নিয়ে যুদ্ধের ইতিহাস কিন্তু আমরা কতটুকু মূল্য দিচ্ছি! কতটা কষ্টের; বাচ্চা মায়ের কাছে আসতে পারছে না। কিছু মানুষ সব ব্যর্থ করে দিচ্ছে..প্রিয় মানুষটির উপজেলার মানুষগুলো তার চেষ্টাগুলোকে যদি মূল্যায়ণ করে তবেই তার কষ্ট স্বার্থক হবে..তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন। এই কামনা..
বি: দ্র: প্রিয় মানুষটির কাছে ক্ষমাপ্রার্থী, ইনবক্সের ছবি ব্যবহার করার জন্যে..ছবিটি এতটাই নাড়া দিয়েছে যে প্রকাশ না করে পারলাম না।
উল্লেখ্য, করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঝুঁকি মোকাবেলায় গত ৯ এপ্রিল অনির্দিষ্টকালের জন্য চাঁদপুর জেলাকে লকডাউন ঘোষণা করেন জেলা প্রশাসক মো. মাজেদুর রহমান খান। এরপর থেকেই লকডাউন কার্যক্রম ও করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণে জনসমাগম ঠেকাতে হাজীগঞ্জে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করেন ইউএনও।
শুধু লকডাউন নয়, দেশে করোনা সংক্রমণের পর থেকেই চাঁদপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনিই সংক্রমণ প্রতিরোধ কার্যক্রমে বেশ সরব ছিলেন এবং সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবে মাঠ পর্যায়ে সবচে বেশি কাজ করেছেন। তাঁর নেতৃৃত্বে উপজেলায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
০৪ মে, ২০২০।
