চাঁদপুরের এক শিক্ষকের দুই প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন উত্তোলন

স্টাফ রিপোর্টার
একই ব্যক্তি দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থেকে বেতন নিচ্ছেন। কিভাবে সম্ভব? সে অসম্ভবকে সম্ভব করেই তিনি উভয় প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন উত্তোলন করছেন। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে, কিছু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে দীর্ঘ ৯ বছর দুই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে বেতন ভোগ করছেন। ১৭ মাস পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললেও নিজ এমপিও পদে যোগদান না করে খন্ডকালীন পদে যোগদান ও ক্লাস পরিচালনা করেন। কিভাবে দু’টি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন তিনি? তিনি কি বৈধভাবে দু’টি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন?
বলছি, বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে কলেজের খন্ডকালীন ইংরেজি শিক্ষক মাহমুদ আলম লিটনের কথা। তিনি বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে থেকে এসএসসি এবং এইচএসসি পাস করে চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে ইংরেজি বিভাগের অনার্স করে বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের নন এমপিওভুক্ত বেতনের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করে এখন পর্যন্ত নিয়োজিত আছেন এবং এজন্য প্রতি মাসে উক্ত প্রতিষ্ঠানে থেকে ৮ হাজার টাকা বেতন নেন।
অন্যদিকে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে মাহমুদ আলম লিটন লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার রায়পুর কামিল মাদ্রাসার (ইআইএন-১০৭০৩০) ইংরেজি প্রভাষক হিসেবে নিয়োজিত আছেন। যেখানে তার নামীয় ইন্ডেকস নং এন২০৯৭৩৩৭। দেখা যায়, শিক্ষক মাহমুদ আলম লিটন এমপিওভুক্ত এই প্রতিষ্ঠানে চাকরির কারণে প্রতিমাসে সরকার থেকে ২৬ হাজার ৯শ’ ৮০ টাকা গ্রহণ করছেন। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে দীর্ঘ দেড় বছর পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললেও ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ক্লাস রুটিনে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে সপ্তাহে শনি থেকে বৃহস্পতিবার ৬টি ক্লাসে রয়েছে লিটনের নামে। তাহলে তিনি যে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছে, তার সে ক্লাস করছে কে। কিভাবে তিনি দ্বৈত নাগরিকতার মত দু’টি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন, এমন প্রশ্ন সচেতন মহলে উঠতেই পারে। তার এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান কি করছে, কিভাবে সে প্রতিষ্ঠানকে তিনি ম্যানেজ করছে। নিশ্চই অনৈতিক কোন কর্মকান্ড লিটন জড়িত রয়েছে।
গত রোববার সরেজমিনে বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ক্লাস রুটিন অনুযায়ী সাড়ে ১২টায় মাহমুদ আলম লিটন মানবিক বিভাগের ইংরেজি ক্লাস নিচ্ছেন। এছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) ওয়েবসাইট থেকে দেখা যায় মাহমুদ আলম লিটন ২০১২ সালের ১ সেপ্টেম্বর এই পদে যোগদান করেন এবং একই বছরের নভেম্বরের ১ তারিখে তিনি এমপিও তালিকাভুক্ত হন।
এ বিষয়ে বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মোশারফ হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, মাহমুদ আলম লিটন এ বিদ্যালয়ের একজন খন্ডকালীন শিক্ষক। সে এ প্রতিষ্ঠানে দৈনিক হাজিরা হিসেবে বেতন গ্রহণ করেন। যদি তিনি ক্লাস না করেন তাহলে তিনি বেতন পান না।
তিনি আরো জানান, মাহমুদ আলম লিটন কোন প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে নিয়েজিত আছেন বলে তিনি জানেন না। এদিকে বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের খন্ডকালীন শিক্ষকদের বেতনের তালিকা থেকে দেখা যায় এই করোনাকালীন দীর্ঘ সময়েও মাহমুদ আলম লিটন প্রতিষ্ঠানে কোন ক্লাস না করেও প্রতি মাসে ৮ হাজার টাকা করে পূবালী ব্যাংক বাবুরহাট শাখার মাধ্যমে গ্রহণ করেন। এদিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক নীতিমালা থেকে দেখা যায় এমপিওভুক্ত কোন শিক্ষক-কর্মচারী একই সাথে একাধিক কোন পদে চাকরিতে বা আর্থিক লাভজনক কোন পদে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। এটি তদন্তে প্রমাণিত হলে সরকার তার এমপিও বাতিলসহ দায়ী ব্যক্তি ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।
এদিকে বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জানা যায়, মাহমুদ আলম লিটন কাছে প্রাইভেট পড়তে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা হতো। তার কাছে না পড়লে পরীক্ষার খাতায় নম্বর কম দেয়া হতো এবং ক্লাসে বিভিন্ন সময়ে অপমানজনক কথা বলতো।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানান, মাহমুদ আলম স্যারের কাছে যারা প্রাইভেট পড়তো, তাদের পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন দেওয়া হতো, এছাড়া যারা খাতায় কম নম্বর পেত এবং ফেল করতো তাদের বাসায় নিয়ে পুনরায় খাতায় লিখিয়ে নম্বর দেওয়া হতো। জানা যায়, মাহমুদ আলম লিটনে বাড়ি শরীয়তপুর জেলায়। শিক্ষাজীবনে বাবুরহাটস্থ বোনের বাসা থেকেই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করার ফলেই এই এলাকায় পরিচিতি বাড়ে। ছাত্রজীবন থেকেই মাহমুদ আলম লিটন টিউশানি পেশায় লিপ্ত ছিলেন। ধীরে ধীরে এ পেশাটি তার লোভে পরিণত হওয়ার ফলে সে এই এলাকায় কোচিং বাণিজ্য গড়ে তোলে।
চাঁদপুর সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার কামাল উদ্দিন জানান, এমপিওভুক্ত কোন শিক্ষক দু’টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করতে পারবেন না। এমনিতে বেতন তো নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কোন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করা বেআইনি, ৫টার পর সে শিক্ষক কোচিং করাতে পারবেন।
এ ব্যাপারে রায়পুর আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়।
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১।