চাঁদপুরে প্রাথমিকের এসএমসি গঠনে লঙ্কাকাণ্ড!

স্থানীয়দের উৎপাত আর রাজনৈতিক প্রভাবে

ইলশেপাড় রিপোর্ট
চাঁদপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ম্যানেজিং কমিটি (এসএমসি) গঠন নিয়ে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা অসহায় হয়ে পরছেন বলে অভিযোগ উঠছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিস দ্রুত ঐ কমিটি গঠন করে জমা দেয়ার নির্দেশ দিলেও স্থানীয় টাউট-বাটপারদের কারণে তা তারা জমা দিতে পারছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা আখ্যা দিয়ে ঐ কমিটির অনেককে বিতর্কিত করছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে স্থানীয় ইউপি মেম্বাররা নিজেদের ক্ষমতার চূড়ান্ত করছেন বলেও অনেকে জানিয়েছেন। ফলে অনেক প্রধান শিক্ষকই পড়ছেন সামাজিক বিড়ম্বনায়।
অভিযোগ আছে, বিদ্যালয়গুলোর পরিচালনা কমিটি গঠনের সময় হলেই স্থানীয় কথিত প্রভাবশালীদের দৌঁড়-ঝাপ শুরু হয়। তাদের সাথে যোগ হয় রাজনৈতিক প্রভাব। সব মিলিয়ে কমিটি গঠন নিয়ে স্ব-স্ব বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের ত্রাহী অবস্থার মুখে পরতে হয়। যা দেখার কেউ থাকে না বলে অভিযোগ আছে।
চাঁদপুর সদর উপজেলার শিক্ষা অফিস বলছে, সরকারি নির্দেশনাযায়ী প্রতি ৩ বছর পর-পর বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি (এসএমসি) গঠন করার সরকারি বাধ্যবাদকতা রয়েছে। কমিটির মোট সদস্য হবেন ১১ জন। তার মধ্যে থাকবেন পদাধিকার বলে প্রধান শিক্ষক ও তার সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে থেকে আরো একজন সদস্য থাকবেন। একজন দাতা সদস্য, স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক প্রতিনিধি, একজন বিদ্যোৎসাহী পুরুষ ও একজন বিদ্যোৎসাহী নারী এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য একজন। বাকি ৪ জন হবেন অভিভাবক সদস্য। বিদ্যোৎসাহী পুরুষ ও নারী সদস্য মনোনয়ন দেন স্থানীয় সংসদ সদস্য।
আর এই ১১ সদস্যর এই কমিটির সভাপতি যিনি হবেন তার শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে স্নাতক হতে হবে। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালীরা সরকারের এমন নিয়ম মানতে নারাজ। যার কারণে ঘটে যত বিপত্তি। নাজেহাল হতে হয় কর্মরত প্রধান শিক্ষকদের।
এছাড়া কমিটিতে স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধি (ইউপি সদস্য) থাকায় বাধ্যবাদকতা থাকার কারণে কোন কোন জনপ্রতিনিধি নিজকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মনে করেন। তারা মনে করেন যেভাবে তারা নির্বাচিত হয়েছেন সেভাবেই এসব কমিটি করা হবে। ফলে তারা দলীয় প্রভাবের সর্বোচ্চ এখানে প্রয়োগ করছেন। যার কারণে বিদ্যালয়ের কোন উন্নয়নমূলক কাজ মানেই তার পার্সেন্টেজ (!) কত, তা নিয়েই প্রধান শিক্ষককে নাজেহাল করেন হারহামেশেই।
শিক্ষকরা বলছেন, ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে সভাপতি পদটিই। কে হবেন সভাপতি তা নিয়েই শুরু হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা। যদিও কমিটিতে স্নাতক যোগ্যতাসম্পন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রতিনিধি থাকেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষক প্রতিনিধিকেই সভাপতি নির্বাচিত করতে হয় শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাদকতার জন্য।
এমন পরিস্থিতিতে কমিটিতে দাতা সদস্য কিংবা সংসদ সদস্য কর্তৃক মনোনীত বিদ্যোৎসাহী সদস্যরা নিজদের স্ব-প্রণোদিত সভাপতি হওয়ার জন্য শুরু করেন তালবাহানা। সৃষ্টি হয় গ্রুপিং। বাধাপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা।
এমন পরিস্থিতিতে চাঁদপুর সদর উপজেলার বেশ কয়েকজন প্রধান শিক্ষক অনেকটাই আক্ষেপ করে ইলশেপাড়কে জানান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, দাতা সদস্য কিংবা বিদ্যোৎসাহী পদধারীদের দৌরাত্ম্য যেন সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেখানে অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির তেমন সুযোগ নেই। কিন্তু এসব ব্যক্তিরা নিজদের জাহির করতে এক ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করেন, যা শিক্ষক হিসেবে মেনে নেয়া যায় না।
ভুুক্তভোগী শিক্ষকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বৃদ্ধিসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নকে তরান্বিত করার জন্য ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়। অথচ যাদের নিয়ে কমিটি গঠন হয়, উল্টো তাদের খামখেয়ালিপনা আর নৈরাজ্যর কারণে উল্টো শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
এজন্য ভুক্তভোগীদের দাবি, কমিটি গঠনের পুরো প্রক্রিয়াকে উপজেলা শিক্ষা অফিস নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করে আগ্রহীদের তথ্য-উপাত্ত আগে সংগ্রহ করে তাদের যোগ্যতা যাচাই-বাছাই করে বিদ্যালয়ে প্রেরণ করলে অনেকাংশে হ্রাস পাবে দৌরাত্ম্য।
চাঁদপুর সদর উপজেলায় বর্তমানে ১শ’ ৭২টি বিদ্যালয় রয়েছে। যাদের অধিকাংশদের ব্যবস্থাপনা কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। এছাড়া বেশ কিছু বিদ্যালয়ের কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বর্তমানে এ জেলার ৮টি উপজেলায় মোট প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ১ হাজার ১শ’ ৫৬টি বলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস জানায়।

২৪ মে, ২০২২।