চাঁদপুরে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় প্রাণ ফিরে পেল কলেজ-বিদ্যালয়

সন্তোষজনক উপস্থিতিতে খুশি কর্মকর্তা ও শিক্ষকরা

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
দেড় বছর (৫৪৪ দিন) পর সারা দেশের মতো চাঁদপুরে খুলেছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এতে করে দীর্ঘ বন্ধের পর ব্যাপক উৎসাহ, উদ্দীপনা ও প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীর পদচারণায় প্রাণ ফিরে পেল বিদ্যালয়গুলো। আর বিদ্যালয় খোলার সঙ্গে সঙ্গে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে প্রতিটি ক্যাম্পাস। স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিদ্যালয়ে প্রবেশের পাশাপাশি প্রিয় শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানান শিক্ষকেরা।
শিক্ষকদের পাশাপাশি অনেক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানান পরিচালনা কমিটির সদস্যরা। গত কয়েকদিনের মতো রোববারও (১২ সেপ্টেম্বর) প্রশাসনের কর্মকর্তারাসহ সব পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মনিটরিং করেছেন। নিয়েছেন শিক্ষার্থীদের খোঁজ-খবর। পরিবেশ দেখে মনে হয়েছে যেন, বছরের প্রথম দিনে নব উদ্যামে বিদ্যালয়গুলোতে আবারো পাঠদান শুরু হয়েছে।
বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে দেখা গেছে, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে ঢুকেই যেন খুশিতে আত্মহারা কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। সরাসরি পাঠদানে অংশগ্রহণ করতে পেরে খুশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। উভয়ের মাঝেই দেখা গেছে অন্যরকম আনন্দ উল্লাস। বিশেষ করে সহপাঠীদের সঙ্গ পেয়ে খুশি শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ে পাঠদান শুরু হওয়ায় ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন অভিভাবকরাও। যার ফলে অনেক অভিভাবককে বিদ্যালয়ে আসতে দেখা গেছে।
এর আগে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থীদের স্কুলে প্রবেশ করিয়েছে শিক্ষকরা। রাখা আছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও হাত ধোয়ার ব্যবস্থা। দেওয়া হয়েছে মাস্ক এবং প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের আগে শিক্ষার্থীদের শরীরের তাপমাত্রা মাপা হয়েছে। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে দুই/একজন শিক্ষার্থীর শরীরের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রির বেশি থাকায় এবং সর্দি-কাঁশ থাকায় তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে দেয়া হয়।
এছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানকে সাজানো হয়েছিল বর্ণিল সাজে। শিক্ষার্থীদের ফুল এবং চকলেট দিয়ে স্বাগত জানাতেও দেখা গেছে। ছিল শ্রেণিকক্ষের ভেতরে শারীরিক দূরত্ব রেখে বসার ব্যবস্থা। তবে কিছু প্রতিষ্ঠানে একই বেঞ্চে একাধিক শিক্ষার্থীকে বসতে দেখা গেছে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি, সেসব প্রতিষ্ঠানে এক-একটি বেঞ্চে দুই/তিনজনকেও বসতে দেখা যায়।
এদিকে দীর্ঘদিন পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হলেও একসঙ্গে সব শ্রেণির ক্লাস শুরু হয়নি। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ২০২১ ও ২০২২ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে ৬ দিন ক্লাসে যেতে হবে। বাকিদের সপ্তাহে এক দিন করে ক্লাস নেয়া হবে। অর্থাৎ প্রতিদিন নির্দিষ্ট শ্রেণির দু’টি করে ক্লাস শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরে স্বাভাবিক ক্লাস রুটিনে ফেরার চেষ্টা করা হবে।
এর আগে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ হয়ে যায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এরপর ধারাবাহিকভাবে অনলাইনে ক্লাস ও পরীক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের এসাইনমেন্টের কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকা, দুর্বল ও ধীরগতির ইন্টারনেট এবং ইন্টারনেটের উচ্চমূল্যের কারণে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর পক্ষেই অনলাইন ক্লাস করা সম্ভব হয়নি।
তবে এখন ক্লাসে ফিরতে পেরে শিক্ষার্থীরা খুশি। কথা হয় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে। তারা জানান, দীর্ঘদিন বন্ধের পর স্কুলে এসে তাদের খুব ভালো লাগছে। এভাবেই তারা প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসতে চায়। তারা বলেন, আগে অনলাইনে ক্লাস করে অনেকের চেহারা দেখা যেতো না, কথা বলা যেতো না। তাই মনে আনন্দ ছিলনা। এখন স-শরীরে ক্লাস করতে এসে সবাইকে দেখা যাচ্ছে, কথা বলা যাচ্ছে। এতেই তারা আনন্দিত।
এ বিষয়ে হাজীগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রোকেয়া সুলতানার সাথে। তিনি জানান, শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন পর বিদ্যালয়ে এসে অনেক উচ্ছ্বসিত হয়েছে। তাদেরও অনেক ভালো লাগছে। তিনি বলেন, প্রায় সময় আমরা বিদ্যালয়ে এসেছি, তখন শিক্ষার্থীরা না থাকায় বিদ্যালয়ের কোন প্রাণ ছিল না। আজ থেকে বিদ্যালয় প্রাণ ফিরে এসেছে। এসময় তিনি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতকরণের কথা জানান।
হাজীগঞ্জ সরকারি মডেল পাইলট হাই স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবু ছাইদ বলেন, দীর্ঘ বন্ধের পর ব্যাপক উৎসাহ, উদ্দীপনা, প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় প্রাণ ফিরে পেল বিদ্যালয়। শিক্ষকরা পাচ্ছেন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সান্নিধ্য। সহপাঠীদের সঙ্গ পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। প্রায় ৮০ ভাগ শিক্ষার্থী উপস্থিত এবং পরবর্তীতে বাকিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাহাব উদ্দিন জানান, আমাদের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল ৭০ ভাগ। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর শিশু শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসতে পেরে খুশি। আমরাও সুন্দর পরিবেশের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ ও উদ্দীপনা দিতে পেরে আনন্দিত।
এ সময় তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের পরিবেশ সুন্দর রাখা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাস্ক পরিধান ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতকরণে স্ব-স্ব উপজেলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিদ্যালয় প্রধানদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে নিয়মিত মনিটরিং করা হবে বলে তিনি জানান।
এদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে সন্তুষ্ট জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গিয়াস উদ্দিন পাটওয়ারী। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের পরিবেশ ভাল ছিল। করোনার এ সময়েও আজকের উপস্থিতি ছিল প্রায় ৮০ ভাগ। শিক্ষকদের পাশাপাশি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাস্ক পরিধান ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতকরণে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১।