মেঘনা নদীতে ট্যানেল-রেললাইন স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে সরকার

চাঁদপুর শহর রক্ষাবাঁধ পরিদর্শনকালে এনামুল হক শামীম

শাহ্ আলম খান
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম বলেছেন, চাঁদপুর শহর রক্ষাকল্পে ৪২০ কোটি টাকার প্রকল্প একনেক-এ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া এ সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মেঘনা নদীতে একটি ট্যানেল ও রেললাইন স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার (২৪ নভেম্বর) সকাল ১১টায় চাঁদপুর শহররক্ষা বাঁধের পুরাণবাজার হরিসভা নদী তীর প্রতিরক্ষা কাজ পরিদর্শন শেষে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায় তিনি একথা বলেন।
উপমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধুমাত্র স্বপ্ন দেখান না, তিনি স্বপ্ন বাস্তবায়নও করেন। তিনি বাংলাদেশ এবং আগামি প্রজন্মের জন্য চিন্তা-ভাবনা করেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে চাঁদপুর শহর রক্ষায় এখন আর ছোট প্রকল্প গ্রহণ না করে আমরা বড় এবং স্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছি।
পরে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়েছে। সারা বাংলাদেশে ১৬ হাজার ৭শ’ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। ৫ হাজার ৭শ’ ৫৭ কিলোমিটার উপকূলীয় অঞ্চলের বাঁধ। আড়াই হাজার কিলোমিটার দূর্গ বাঁধ। নদী ভাঙন কবলিত এলাকা চাঁদপুর ও আমার শরীয়তপুরের অনেক এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা বাংলাদেশের সব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করেছি। সবগুলোতেই স্থায়ী প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। আপনাদের মনে আছে ২০১৮ সালে চাঁদপুর পুরাণবাজারে রাতে যখন ভাঙে, তখন ভোর বেলায় আমি এখানে এসে উপস্থিত হয়েছি। এবারো আমরা ইমারজেন্সি ওয়ার্ক করে হরিসভারকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছি। স্থায়ী বাঁধের জন্য আমরা ৪২০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রণয়ন করেছি, যার কারণে আমি এখানে ভিজিট করতে এসেছি। এটার জন্য টেকনিকেল কমিটি হয়েছে। এটা একনেকে যাবে।
তিনি আরো বলেন, আমরা পাঁচ-দশ বছরের জন্য প্রকল্প করতে চাই না, কমপক্ষে ৫০ বছরের জন্য স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করবো। চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধের পুনঃনির্মাণের প্রকল্পটি আগামি বর্ষার আগেই আমরা শেষ করবো। আমি মহান সংসদে বলছিলাম পদ্মা সেতু হয়ে যাচ্ছে, কর্ণফুলী ট্যানেল হচ্ছে। এখন বাকি মেঘনা নদীতে ট্যানেল অথবা সেতু নির্মাণ। আমি মেঘনার ট্যানেলটা করতে চাই। আমি ডা. দীপু মনি আপার সাথে কথা বলেছি, আমরা দু’জনে মিলে মেঘনার ট্যানেলটা করতে চাই। এই সরকার শেষ সময়ের আগে মেঘনার ট্যানেল অথবা সেতুর কাজের ভিত্তিপ্রস্তর করবো, ইনশাআল্লাহ।
এসময় উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাজেদুর রহমান খান, পুলিশ সুপার মো. মাহবুবুর রহমান, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কুমিল্লা অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. জহির উদ্দিন আহমেদ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সফিকুল ইসলাম, পানি উন্নয়ন বোর্ড চাঁদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলদার, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নকিবুল হাসান হক, মঞ্জুর ভূঁইয়া, সহকারী প্রকৌশলী ওয়াহিদুর রহমান, উপ-সহকারী প্রকৌশলী আশরাফুজ্জামান, হাইমচর উপজেলা চেয়ারম্যান নূর হোসেন পাটোয়ারী, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুভাষ চন্দ্র রায়, সাধারণ সম্পাদক তমাল কুমার ঘোষ, সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী বেপারী, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির চাঁদপুরস্থ প্রতিনিধি অ্যাড. সাইফুদ্দিন বাবু, পৌরসভার ২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মালেক শেখ, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জহির উদ্দিন মিজি, সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ।
পরে উপমন্ত্রী স্পিডবোডে করে শরীয়তপুরের উদ্দেশে চাঁদপুর ত্যাগ করেন।
উল্লেখ্য, চাঁদপুর সদর ও হাইমচর উপজেলায় মেঘনা নদীর ৩০ কিলোমিটার ইধহশ খরহব রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৯.৭০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং বর্তমানে ৩.৫৫ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ চলামন রয়েছে। অবশিষ্ট ৭.০০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ শেষ হলে চাঁদপুর সদর ও হাইমচর উপজেলা নদীভাঙ্গন হতে আশংকা মুক্ত থাকবে। এছাড় মতলব উত্তর উপজেলায় মেঘনা নদীর ১২ কিলোমিটার ইধহশ খরহব রয়েছে। এর মধ্যে ৫.৯০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৬.০০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ শেষ করা হলে মতলব উত্তর উপজেলা নদীভাঙন হতে আশংকা মুক্ত থাকবে। ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ধনাগোদা নদীর মাত্র ৭.০০ কিলোমিটার তীর প্রতিরক্ষামূলক কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। অবশিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ ৪.৫০ কিলোমিটার নদীতীর প্রতিরক্ষা কাজ অন্তর্ভুক্ত করে ডিপিপি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এছাড়া চাঁদপুর জেলায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যক্রমের বিবরণ ৩টি চলমান প্রকল্প রয়েছে। যা হলো- মেঘনা নদীর ভাঙন হতে চাঁদপুর জেলার হরিণা ফেরিঘাট ও চরভৈরবী এলাকার কাটাখাল বাজার রক্ষা প্রকল্প ২০১৭ হতে ২০২০ পর্যন্ত পরে সংশোধিত ডিপিপি বোর্ডে প্রেরণ করে তা ২০২১ সালের জুন মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। যার নির্মান ব্যয় ১৯০৭৭.০৬ (লাখ টাকা)। চাঁদপুর সেচ প্রকল্পের চরবাগাদী পাম্প হাউস ও হাজীমারা রেগুলেটর পূনর্বাসন প্রকল্পটির দরপত্র আহ্বান কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন বাস্তবায়ন সময় ২০১৮ হতে ২০২২ পর্যন্ত নির্মাণ ব্যয় ১১৭৪৬.০১ (লাখ টাকা)। ৬৪ জেলায় ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্প (১ম পর্যায়) ৮টি খালের খনন কার্যক্রম চরমান। বাস্তবায়ন সময় ২০১৮ হতে ২০২২ সাল পর্যন্ত। নির্মাণ ব্যয় ৬৫৯.৬৫ (লাখ টাকা)। চরমান প্রকল্প এর নির্মাণ ব্যয় হবে মোট ৩১৪৭৩.৭২ লাখ টাকা।
জরুরি কাজের বিবরণ হলো- ২০২০-২১ অর্থ বছরে ১.৮৪৫ দৈর্ঘ্য কিলোমিটার টাকার পরিমাণ ৬৯৬.৫৪ লাখ টাকা। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে ২.৪৫২ দৈর্ঘ্য কিলোমিটার টাকার পরিমাণ ৬০৫.৬৫ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থ বৎসরে ১.৫৯১ দৈর্ঘ্য কিলোমিটার, টাকার পরিমাণ ৫৫৯.৯৯ লাখ টাকা। জরুরি কাজে মোট ৫.৮৮৮ দৈর্ঘ্য কিলোমিটার। ব্যয় হয়েছে মোট ১৮৬২.১৮ লাখ টাকা।
সরকারের পরিকল্পনাধীন প্রকল্প- চাঁদপুর শহর সংরক্ষণ পুনর্বাসন প্রকল্প। প্রস্তাবিত বাস্তবায়ন সময় ২০২১ হতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ৫৮৬৮০.৩৫ লাখ টাকা। ডিপিপি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে ডিপিপি পরিমার্জন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
চাঁদপুর সদর ও হাইমচর উপজেলায় মেঘনা নদীর বাম তীর বরাবর আগের সম্পাদিত ক্ষতিগ্রস্ত নদী তীর প্রতিরক্ষা কাজের মেরামত ও পূনর্বাসন প্রকল্প ২০২১ হতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ১৫৪৯৪.৭৮ লাখ টাকা, যা ডিপিপি প্রণয়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
মেঘনা নদীর ভাঙন হতে বাম তীরবর্তী চাঁদপুর জেলার সদর ও হাইমচর উপজেলার হানারচর-কাটাখাল এলাকা সংরক্ষণ প্রকল্পের প্রস্তাবিত বাস্তবায়ন সময় ২০২১ হতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যার সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ৪৭৮৮০.০০ লাখ টাকা। কারিগরি প্রতিবেদন ও ডিপিপি প্রণয়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
মেঘনা নদীর ভাঙন হতে চাঁদপুর জেলার হাইমচর উপজেলায় নীলকমল ও সদর উপজেলার ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত ইশানবালা বাজার ও আলুবাজার এলাকা সংরক্ষণ প্রকল্পের প্রস্তাবিত বাস্তবায়ন সময় হলো ২০২১ সাল হতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। যার সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ৪০০৬৪.০০ লাখ টাকা। যা কারিগরি প্রতিবেদন ও ডিপিপি প্রণয়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ডাকাতিয়া নদী পূনঃখনন, উভয় তীরে বাঁধ নির্মাণ বৃক্ষরোপন ও সৌন্দর্য্যবর্ধনসহ চাঁদপুর সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন কাজ বাস্তবায়ন প্রকল্পের প্রস্তাবিত বাস্তবায়ন সময় ২০২১ হতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ২৩২৫০.০০ লাখ টাকা। যা সমীক্ষা কাজ চলমান রয়েছে।
৬৪ জেলায় ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পের (২য় পর্যায়) প্রস্তাবিত বাস্তবায়ন সময় হলো ২০২১ সাল হতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। যার সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ২৫০০.০০ লাখ টাকা। ৪০টি খালের ডিজাইন ডাটা বোর্ডে প্রেরণ করা হয়েছে। ডিপিপি প্রণয়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলাধীন মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের অবকাঠামোর পুনর্বাসন ও নদী ভাঙন প্রতিরোধে ড্রেজিংসহ প্রতিরক্ষা কাজ প্রকল্পের প্রস্তাবিত বাস্তবায়ন সময় ২০২১ সাল হতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় হবে ৪২৫৬.২০ লাখ টাকা। ডিপিপি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে ডিপিপি পরিমার্জন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। যার সর্বমোট ব্যয় হবে ১৯২১২৫.৩৩ লাখ টাকা।
২৫ নভেম্বর, ২০২০।