হাজীগঞ্জে কারণে-অকারণে রাস্তায় ছোট যানবাহন, বাজারে মানুষের ভিড়

উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের কঠোর অবস্থান

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
সারা দেশের মতো হাজীগঞ্জেও টানা ষষ্ঠ দিনের সর্বাত্মক লকডাউন পালন করা হয়েছে। তবে লকাডউন অমান্য করে সড়কে ভিড় জমিয়েছে মানুষ। কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়কসহ গ্রামাঞ্চলে চলেছে রিকশা, অটোরিক্সা ও প্রাইভেট যানবাহন। বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান ছাড়া অন্যান্য দোকানগুলো খোলা ছিল। নানা অজুহাতে এবং কারণে-অকারণে হরহামেশাই সাধারণ মানুষ রাস্তায় চলে এসেছে। তবে সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত রাখতে আজও কঠোর অবস্থানে ছিল উপজেলা প্রশাসন ও হাজীগঞ্জ থানা পুলিশ।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার হাজীগঞ্জ বাজারসহ উপজেলার বিভিন্ন বাজার এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছেন এবং জনসাধারণের মাঝে বিনামূল্যে মাস্ক বিতরণ করেছেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাজীগঞ্জ সার্কেল) মো. সোহেল মাহমুদের নেতৃত্বে হাজীগঞ্জ পশ্চিম বাজারস্থ চৌরাস্তায় এবং পূর্ব বাজারস্থ পৌরসভা ভবন কার্যালয়, বাকিলা বাজারসহ উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ বাজারে টহল বাড়ানোর পাশাপাশি যানবাহন আটকে দিয়েছে পুলিশ।
গতকাল সোমবার হাজীগঞ্জ পৌরসভা ভবন সংলগ্ন টোরাগড় এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে এমনই চিত্র দেখা গেছে। এ দিন বিভিন্ন যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা দিতেও দেখা গেছে ট্রাফিক পুলিশকে। সরেজমিনে দেখা যায়, হাজীগঞ্জ বাজারমুখী লোকজনের ভিড় দেখা গেছে। প্রখর রোদের মাঝেও পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে লোকজনকে বুঝানোর চেষ্টা করেছেন। নিয়েছেন মৃদু শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও। যাদের আইডি কার্ড আছে বা যারা জরুরি সেবার আওতায় চলাচল করছেন তাদের ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ।
অন্যদিকে যারা অকারণে ঘর থেকে বের হয়েছেন তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবে পুলিশের তুলনায় চলাচলকৃত লোকজনের সংখ্যা বেশি হওয়ায় হিমশিম খেতে হয়েছে পুলিশকে। অটোরিক্সা, সিএনজিচালিত স্কুটার, মিশুক, রিকশা ও প্রাইভেটসহ ছোট যানবাহনগুলোর বিরুদ্ধে পুলিশের শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় চালক ও যাত্রী সাধারণ পুলিশের প্রতি ক্ষুব্ধ হতে দেখা গেছে। তবে পুলিশের সহনশীল আচরণে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকরা। তারা পুলিশের প্রশংসনীয় কার্যক্রমের প্রতি ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
এদিকে সর্বাত্মক লকডাউনের প্রথম দিন থেকেই সরকারি নির্দেশনা পালনে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার। তিনি ব্যবসায়ীসহ জনসাধারণকে সচেতন করাসহ বিনামূল্যে মাস্ক বিতরণ করছেন। অবাধ্য ও অমান্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন, করছেন ব্যবসায়ী ও পথচারীদের জরিমানা। কিন্তু তাতেও কেউ সচেতন হচ্ছে না।
বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের উপস্থিতি টের পেয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় পন্যের দোকানগুলো ছাড়া অন্যসব দোকান-পাট বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। আবার ভ্রাম্যমাণ আদালত চলে গেলে আবার দোকানগুলো এক সাঁটার ও দুই সাঁটার করে দোকানগুলো খোলা হচ্ছে। একইভাবে মাস্ক পরিধানের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। অনেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত বা পুলিশ দেখলে মাস্ক দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে দিচ্ছেন, নতুবা মাস্ক পকেটে বা থুতনি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
জিতু মিয়া নামের একজন অটোরিক্সা চালক জানান, আমরা গরিব মানুষ। লকডাউন-তো আমাদের ঘরে খাবার দিয়ে আসেনা। তাই বাধ্য হয়ে গাড়ি নিয়ে বের হয়েছি। আবুল হাশেম নামের একজন মিশুক চালকও একই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, এভাবে (লকডাউন) আর কত দিন? কামাই (আয়) করলে খাবার জুটে। তাই রিকশা নিয়ে বের হয়েছি। এ সময় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাজারে আসলে পুলিশ গাড়ির চাকা পাংচার করে দেয় (হাওয়া ছেড়ে দেওয়া)।
অপরদিকে খোরশেদ আলম নামের একজন ব্যবসায়ী বলেন, দোকান ও গোডাউন ভাড়া, ব্যাংক ঋণ, স্টাফের বেতনসহ মাসে লক্ষাধিক টাকা খরচ। কিন্তু দোকানঘর বন্ধ থাকায় বিপাকে আছি। গত বছর থেকে এই পর্যন্ত কয়েক লাখ টাকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আর কত লস দিবো এবং এভাবেই বা আর কত দিন চলবো?
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাজীগঞ্জ সার্কেল) মো. সোহেল মাহমুদ বলেন, লকডাউনের নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নে আমরা চেষ্টা করছি। দেখা যাচ্ছে, নানা কারনে ও অকারনেও লোকজন ঘর থেকে বের হয়ে আসছেন। যারা জরুরি চলাচলের কারণ বলতে পারছেন, আমরা তাদের ছেড়ে দিচ্ছি এবং যারা বলতে পারছেন না, সেসব যানবাহনগুলো আটকে দিচ্ছি। লোকজনকে বুঝানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু তারা আমাদের সহযোগিতা না করে পায়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে।
সাধারণ নাগরিকদের সহযোগিতা চেয়ে এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, কারো বিরুদ্ধে নয়, আমরা যে কাজটি করছি সেটা দেশের জন্য, সাধারণ মানুষদের জন্য। সবার আগে আমাদের সচেতন হতে হবে। আমরা সচেতন হলেই পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাবে। তা না হলে, পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাবে এবং আমরা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবো। তাই তিনি পুলিশকে সহযোগিতা এবং সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহবান জানান।
উল্লেখ্য করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের কারনে গত ১৪ এপ্রিল থেকে ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ অর্থ্যাৎ কঠোর বিধিনিষধের ঘোষণা করে সরকার। বুধবার ভোর ৬টা থেকে আগামী ২১ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত সাত দিন এ বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে। এই সর্বাত্মক লকডাউন আরো এক সপ্তাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত রোববার (১৮ এপ্রিল) রাতে কোভিড ১৯-সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির ৩১তম সভায় এই প্রস্তাব গৃহীত হয়।

২০ এপ্রিল, ২০২১।