স্টাফ রিপোর্টার
চাঁদপুর সদর উপজেলার শহীদ বুদ্ধিজীবী এবি তালুকদারের ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীনতার জন্য বুকের তাজা রক্ত বিলিয়ে দিতে হয়েছে চাঁদপুর সদর উপজেলার আশিকাটি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম বশির আহমেদ তালুকদারের বড় ছেলে শহীদ বুদ্ধিজীবী এবি তালুকদাররের জীবন।
এবি তালুকদারের পুরো নাম আবুল বাশার তালুকদার ওরফে বাচ্চু। ১৯৩৩ সালে চাঁদপুর সদর উপজেলার আশিকাটি ইউনিয়নের সেঁনগাও গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে (তালুকদার বাড়ি) জন্মগ্রহণ করেন আবুল বাশার তালুকদার।
১৯৪৮ সালে চাঁদপুর সদরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাবুরহাট উচচ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাস করে তৎকালীন পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে তিনি যোগ দেন। ১৯৬২ সালে বিমানবাহিনীর চাকরি ত্যাগ করে তৎকালীন পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সে (পিআইএ) চাকরি নেন তিনি। তারপর থেকে দাবি আদায়ের সংগ্রামে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধের বিক্ষোভ ঘেরাও কর্মসূচিসহ সব ব্যাপারে প্রথম সারিতে থেকে তিনি সংগ্রাম করে গেছেন।
এবি তালুকদার ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন সৈনিক। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন একজন ভালো ফুটবল খেলোয়াড়। অত্যন্ত সৎ ও কোমলমতি হাস্যোজ্জলের এক সাদা মনের মানুষ। তিনি সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঢেলে দিতেও ভয় করতেন না। শহীদ আবুল বাশার তালুকদার ঢাকা মতিঝিল বিমান অফিসের কার্গো সেকশনের সিনিয়র অ্যাসিসটেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। শ্রমিক নেতা হিসাবেও তিনি নিজে সবার কাছে প্রিয় তালুকদার ভাই হিসেবে। ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত তৎকালীন কেন্দ্রিয় শ্রমিক সংসদের (বর্তমান শ্রমিক লীগ) সদস্য ছিলেন, তারপর তিনি ব্যক্তিগত অসুস্থতার কারণে সে পথ ছেড়ে দেন। সুস্থ হয়ে সেই বছরেই শ্রমিক সংসদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ছোট বেলা থেকেই আবুল বাশার তালুকদার ভাল ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। কৃতিত্বের উদাহরণস্বরূপ জেলা চ্যাপিয়ান কাপ বিজয়ী দল হিসাবে তার ও দলের ছবি এখনো বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষের অফিস কক্ষে ছবি টানানো আছে।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ডাকে সাড়া দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযোদ্ধার পক্ষে চলে আসেন গ্রামের বাড়িতে। এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়কারী হিসাবে দীর্ঘদিন কাজ করেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য সবাইকে উৎসাহিত করেন। বুকে অপারেশন থাকায় তিনি অস্ত্র চালানো থেকে বিরত থাকলেও মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে যাতায়াত করতেন এবং একজন বিমানবাহিনীর সৈনিক হিসাবে যুদ্ধের কলাকৌশল ও পরামর্শ দিতেন এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের। মুক্তিযুদ্ধে সার্বিক পরিস্থিতি জানার জন্য এবং বিশেষ সংবাদে তিনি নভেম্বরে শেষের দিকে ঢাকার যান। আর ফিরে আসতে পারেন নাই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখে কাজ করার কারণে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বিকালে ঢাকায় তার নাখালপাড়া বাসা থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী পাকিস্তান ও আলবদর বাহিনী তাকে ধরে নিয়ে যায়। তিনি আর বাসায় ফিরে আসতে পারেন নাই। ঢাকা রায়েরবাজার বদ্ধভূমিতে গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার পর অনেক খোজাখুঁজি করে ঢাকার রায়েরবাজারে বদ্ধভূমিতে বুদ্ধিজীবীদের লাশের সাথে তার লাশ পাওয়া যায়। তারপর তেজগাঁও থানার পুলিশ ও পরিবারের লোকজন জিডি করে, তৎকালীন জিডি নম্বর ৭৩, ১৯৭১ সাল। সেখান থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করে ঢাকায় নাখালপাড়াস্থ কবরস্থানে শহীদ আনোয়ারা কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
শহীদ আবুল বাসার তালুকদার রেখে গেছেন ২ স্ত্রী ও তিন কন্যা বৃদ্ধ মা-বাবা ও ছোট ভাই বোন। শহীদ আবুল বাশার তালুকদার দেশের জন্য অকাতরে ঢেলে দিয়ে গেছেন তার জীবন কিন্তু পাননি সরকারি স্বীকৃতি ও কোন অনুদান। এখনও তার গ্রামে বা অন্য কোথাও তার নামে নামকরণ করা হয়নি কোন সড়ক বা স্কুল প্রতিষ্ঠান। শুধু মতিঝিল বিমান অফিস বলাকা ভবনে গেটে খোদাই করে লেখা আছে শহীদের তালিকায় এবি তালুকদারের নাম। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে আবুল বাশার তালুকদারের পরিবার ও এলাকাবাসীর একটাই দাবি যেন আশিকাটি ইউনিয়নের তার নিজ গ্রাম সেঁনগাও গ্রামের সড়কটি শহীদ আবুল বাসার নামে নামকরণ করা হয়। সেজন্য তারা চাঁদপুর জেলা প্রশাসনসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। আবুল বাশার তালুকদারের বাবা পুত্রশোকে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তার বাবা ছিলেন সফল চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট সমাজসেবক।
এ ব্যাপারে আবুল বাশার তালুকদারের ছোট ভাই মো. জাকির হোসেন জাহাঙ্গীরের সাথে ফোনে কথা হলে তিনি বলেন, তার ভাইয়ের নামে এখন পর্যন্ত কোন সরকারি অনুদান ও সড়ক বা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ হয়নি। সরকারি কোন আর্থিক অনুদান পেলে একটি শিক্ষা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করবেন বলে তিনি সাংবাদিকদের জানান।
১৪ ডিসেম্বর, ২০২০।
- Home
- চাঁদপুর
- চাঁদপুর সদর
- আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী এবি তালুকদারের ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী
