আজ হাইমচর উপজেলা পরিষদ নির্বাচন

৩১ কেন্দ্রে পৌনে ১ লাখ ভোটার ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট দেবেন



ইল্শেপাড় রিপোর্ট
আজ সোমবার বহুল আলোচিত হাইমচর উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। নির্বাচনকে ঘিরে নির্বাচন কমিশন ও উপজেলা প্রশাসনের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে এবারের নির্বাচন নিয়ে উপজেলার ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্কও বিরাজ করছে। ভোটারদের কেউ কেউ নিজ নিজ ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়ে শঙ্কার কথা জানালেও অনেকেই আবার হামলা-পাল্টা হামলার আশঙ্কার কথাও জানান। ফলে এবারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের টান-টান উত্তেজনা বিরাজ করছে পুরো উপজেলাজুড়েই।
এ উপজেলা পরিষদের ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে ভোটাররা তাদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে একজন চেয়ারম্যান ও দুইজন ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করবেন। নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন মোট ৮০ হাজার ২শ’ ৩৪ জন ভোটার। তাদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ৪১ হাজার ৪শ’ ১৭ জন ও নারী ভোটার ৩৮ হাজার ৮শ’ ১৭ জন।
উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের ৩১টি ভোট কেন্দ্রের ২শ’টি বুথে ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এই দুইশ’ বুথের মধ্যে স্থায়ী ভোট বুথ ১শ’ ৮৫টি এবং অস্থায়ী বুথ ১৫টি বলে উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে। তবে এ উপজেলার ভোটাররা প্রথমবারের মতো ব্যালট পেপার ছাড়াই ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে।
এদিকে প্রথমবারের মতো নতুন ইভিএম পদ্ধতির ভোট প্রদানের বিষয়ে ভোটাররা অনেকটাই অপ্রস্তুত বলে জানা গেছে। এ উপজেলাটি নদীকেন্দ্রিক ও চরাঞ্চল হওয়ায় অধিকাংশ ভোটারই এখনো অক্ষরজ্ঞানহীন। তাদের অধিকাংশ আবার জেলে ও কৃষক পরিবার। ফলে তাদের ব্যালট পেপারেই যখন ভোট দিতে সমস্যা হয় সেখানে ইভিএম পদ্ধতির ভোটগ্রহণ ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারছে না। এজন্য ভোটাধিকার হরনের আশঙ্কাও ভোটারদের কেউ কেউ একবারেই উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
তবে উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ইভিএম পরিচালনার জন্য প্রতিটি বুথে ২ জন করে মোট ৬২জন সেনা সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। পাশাপাশি নির্বাচনটি যাতে অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায় সেজন্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য হিসেবে পুলিশ, র‌্যাবের ১০টি টিম, ৩ প্লাটুন বিজেবি সদস্য, কোস্টগার্ড এবং আনসার ও ভিডিপির সদস্যরা ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তায় থাকবেন। এছাড়া চরাঞ্চলের কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন থাকবে। তবে ভ্রাম্যমাণ নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটও নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে বলে জানা গেছে।
এবারের হাইমচর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে নূর হোসেন পাটওয়ারী, ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপির ইসহাক খোকন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সদ্য বহিষ্কৃত উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোতালেব জমাদার আনারস প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন।
ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৮ জন প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন। তারা হলেন- জিএম ফজলুর রহমান, জাহাঙ্গীর বেপারী, কামরুল ইসলাম, খোরশেদ আলম, ওয়াসীম পাটওয়ারী, খোকা মিয়া, তোফাজ্জল মিয়া ও মো. কাশেম। এছাড়া মহিলা ভাইস চেয়ার হিসেবে দুই প্রার্থী নির্বাচন লড়ছেন। তারা হলেন- ফাতেমা বেগম ও শাহনাজ বেগ।
এদিকে গত হাইমচর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় গত ১ ডিসেম্বর। তফসিলে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ১২ ডিসেম্বর। প্রার্থীতা যাচাই-বাছাইয়ের ১৫ ডিসেম্বর ও প্রার্থীতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ছিলো ২২ ডিসেম্বর।
পরে প্রতীক বরাদ্দের প্রথম দিনেই আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক ও স্বতন্ত্র প্রার্থীও আনারস প্রতীকের সমর্থকদের মাঝে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ঐ ঘটনায় উভয় পক্ষের প্রায় ২০ জন সমর্থক আহত হয়। এ ঘটনায় হাইমচর থানায় পৃথক ৩টি মামলা দায়ের করা হয় বলে জানা গেছে।
এদিকে আজকের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে উৎসবমুখর করে তুলতে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম গত ৯ জানুয়ারি হাইমচর সফর করেন। তিনি পরে গণমাধ্যমকে জানান, হাইমচরের ভোটারদের ভোট উৎসবে ফিরিয়ে আনতে চাই। ভোটাররা কেন্দ্রে আসার জন্য চারপাশের পরিবেশ অনুকূলে রাখা হবে। যাতে দিনটি ঈদের মতই একটি উৎসব হয়। এজন্য প্রত্যেক প্রার্থীর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম জানান, হাইমচর উপজেলাটি ৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। তাছাড়া মেঘনা নদীর পশ্চিম অংশে সড়ক যোগাযোগ অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ও নাজুক হওয়ায় সেখানে অতিরিক্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কাজ করবে।
এ সময় তার সাথে ছিলেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন, ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) মো. মিজানুর রহমান, র‌্যাব-১১ কমান্ডার মেজর তালুকদার নাজমুস সাকিব, বিজিবি কুমিল্লার জোনাল অ্যাডজুটেন্ট মাসুদুল ইসলাম খান, হাইমচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌসী বেগম প্রমুখ।
অপরদিকে হাইমচর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করার আহ্বান জানিয়েছেন চাঁদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক। তিনি গত বৃহস্পতিবার হাইমচরে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের সাথে গণসংযোগকালে ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান, ‘আপনারা সবাই ভোট কেন্দ্রে যাবেন এবং ভোট দিবেন। ভোট প্রদানে কোন বাঁধা আসলে প্রতিবাদ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানান।’
অপরদিকে চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত বর্জন করে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোতালেব জমাদার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় তাকে দলের সব পদ থেকে সাময়িকভাবে বহিস্কার করেছে। বর্তমানে তিনি বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনিও অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট হলে বিপুল ভোটে জয়লাভের আশাবাদ ব্যক্ত করছেন।