স্টাফ রিপোর্টার
চাঁদপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ফেরদৌসী ইয়াসমীন বাঁচতে চায়। ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে ভাড়া বাসায় তিনি শয্যাসায়ী। আর্থিক নিরাপত্তা না থাকায় বছরখানেক আগে স্বামীহারা, ৩ মেয়ের জননী ফেরদৌসীর অবস্থা এখন মুমুর্ষ অবস্থায়। বেতন-ভাতা বন্ধ থাকায় তার চিকিৎসাও ঠিকভাবে হচ্ছে না। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন সমিতিও এ ব্যাপারে কুম্ভকর্ণ হয়ে আছে। তবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে তার বিদ্যালয় ক্লাস্টারের শিক্ষকরা মাত্র ২০ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছেন।
চাঁদপুর সদর উপজেলার পশ্চিম তরপুরচন্ডী কাজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফেরদৌসী ইয়াসমীন। শিক্ষকতার মহান পেশায় নিয়োজিত হন ১৯৮৭ সালে। স্থানীয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষার আলোয় গড়ে তুলতে বেসরকারি রেজিস্ট্রার বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। স্বপ্ন দেখতেন নিজের স্বচ্ছলতা না ফিরলেও শিক্ষার আলো নিয়ে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা আলোকিত মানুষ হবে। স্বচ্ছল হবে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জীবন।
ইতোমধ্যে ২০১৫ সালে জাতীয়করণ শিক্ষক হিসেবে অর্ন্তভুক্ত হন শিক্ষক ফেরদৌসী ইয়াসমীন। পারিবারিক কিছুটা স্বচ্ছলতা আসে। কিন্তু সে সুখ আর কপালে জুটলো না। পরিবারের সবাইকে কাঁদিয়ে তার স্বামী গত বছর চিরবিদায় নেন।
স্বামীকে হারানোর পর জীবনযুদ্ধে তিনি ৩ কন্যাকে নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু বাঁধ সাধে মরণব্যাধী ঘাতক ক্যান্সার। ইতোমধ্যে ধরা পরে ফুসফুসে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন ফেরদৌসী ইয়াসমীন। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত, তার জন্য। এখন নিয়তির কাছে ফেরদৌসীর চাওয়া সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকতে চান প্রিয় সন্তানদের মাঝে।
শিক্ষক ফেরদৌসী ইয়াসমীনের ৩ মেয়ে। সাবাই পড়াশুনা করছেন। বড় মেয়ে বর্তমানে অনার্স ফাইনাল বর্ষে অধ্যায়নরত। দ্বিতীয় মেয়ে ডিগ্রি (পাস) দ্বিতীয় বর্ষে ও ছোট মেয়ে স্থানীয় বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়াশুনা করছে। শিক্ষক ফেরদৌসী ইয়াসমীনের জীবন প্রদীপ নিভে গেলে নিভে যাবে তার ৩ মেয়ের শিক্ষার আলোও!
এমন পরিস্থিতি চিকিৎসাধীন ফেরদৌসী ইয়াসমীন তার চিকিৎসার ব্যায়ভার বহনের জন্য সাহায্যের আবেদন করছেন জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে। তবে তার পাশে দাঁড়াতে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা বলে জানা গেছে। যদিও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফাতেমা মেহের ইয়াসমিন ও সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (এডিপিও) মো. রবিউল হোসেন এই শিক্ষককে দেখতে যান।
তারা আশ্বাস দেন আর্থিক সাহায্য সংগ্রহ করে দেয়ারও। এডিপিও মো. রবিউল হোসেন শিক্ষক ফেরদৌসী ইয়াসমীনের কর্মরত একটি ক্লাস্টার হতে শিক্ষকদের কাছ থেকে মাত্র ২০ হাজার টাকার অনুদান সংগ্রহ করে ফেরদৌসীর বাসায় পৌছে দেন।
ফেরদৌসী ইয়াসমীন জানান, তার চিকিৎসার জন্য নগদ অনেক টাকার প্রয়োজন। চিকিৎসার জন্য কর্মস্থল থেকে মেডিকেল ছুটিতে থাকায় তার বেতন-ভাতাও বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে তার চিকিৎসা কার্যক্রম ও ৩ মেয়ের শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করা কঠিন হয়ে পরছে। চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে হলে ব্যাপক অর্থের প্রয়োজন।
এজন্য তিনি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে জেলার কর্মরত সব শিক্ষকদের কাছে আর্থিক সহযোগিতা কামনা করছেন। যাতে তিনি এই জীবন-যুদ্ধে জয়ী হয়ে তার কঁচিকাচা শিক্ষার্থীসহ সবার মাঝে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফাতেমা মেহের ইয়াসমিন ইলশেপাড়কে জানান, ইতোমধ্যে বিভিন্ন শিক্ষা অফিসে তার চিকিৎসা সহযোগিতার চিঠি পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতার আশ্বাসও দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, অসুস্থ হবার পর গত মাসে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফাতেমা মেহের ইয়াসমিন ও সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (এডিপিও) মো. রবিউল হোসেন এই শিক্ষককে দেখতে যান। তারপর তাকে সাহায্যের জন্য সদর উপজেলার শিক্ষকরা মাত্র ২০ হাজার টাকা তুলতে পারেন। কিন্তু ক্যান্সারের মতো একটি ব্যয়বহুল চিকিৎসায় মাত্র ২০ হাজার টাকা সহযোগিতা অনেককে হতবাক করে তোলে। যেখানে প্রায়ই বিভিন্ন শিক্ষক ও সাবেক শিক্ষকদের জন্য লাখ-লাখ টাকা অনুদান তোলা হয় সেখানে এই অসহায় স্বামীহারা শিক্ষকের জন্য কেউই কিছু করছেন না- তা নিয়ে সমাজের বিবেকবান মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন।
২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩।
