গ্রাম আদালত সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন সভা

গ্রাম আদালত পরিচালনার মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব
……………. বেগম অঞ্জনা খান মজলিশ

শাহ্ আলম খান
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক বেগম অঞ্জনা খান মজলিশ বলেছেন, গ্রাম আদালত পরিচালনার মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব। গ্রাম আদালত পরিচালনার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ের যে কোন মামলা নিরসন করা সম্ভব। স্বচ্ছতার সাথে গ্রাম আদালত কার্যকর সঠিক বিচার শতভাগ নিশ্চিত করতে পারে।
বুধবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১১টায় চাঁদপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে গ্রাম আদালত সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের অংশগ্রহণে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলা প্রশাসক আরো বলেন, একজন মানুুষ যে কোন মামলার ঝামেলার কারণে নিঃস্ব হয়ে যায়। আমরা আশা করি প্রান্তিক পর্যায়ে মানুষের বিচার প্রাপ্তির একটা নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হোক গ্রাম আদালত। এই বিচার কার্য করার ক্ষমতা সরকার আপনাদের দিয়েছে, যা অন্য কোন সেক্টরকে প্রদান করেনি। গ্রাম আদালত পরিচালনা করার ক্ষেত্রে আপনারা শতভাগ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কাজ করবেন। কারণ, আপনাদের মনে রাখতে হবে প্রতিটি বিচার কাজের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা করতে হবে।
সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান সভাপতিত্ব করেন।
ডিএফ (এভিসিবি ২য় পর্যায় প্রকল্প) চাঁদপুর জেলার কর্মকর্তা এইচ এম আকরাম হোসেনের পরিচালনায় আরো বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হেড কোয়ার্টার) মো. আসাদুজ্জামান, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা শাহনাজ স্মৃতি, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মেহেদী হাসান মানিক, আবিদা সিফাত, মঞ্জুরুল মোর্শেদ, জেলা সমাজসেবা বিভাগের উপ-পরিচালক রজত শুভ্র সরকার, জেলা তথ্য অফিসার দেলোয়ার হোসেন, খাদেরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর হোসেন প্রমুখ।
সভায় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আগতদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ছগির আহমেদ সরকার, রেজাউল হক, নুর মোহাম্মদ, ইসমাইল হোসেন, শীতল কুমার সাহা, আবদুস সালাম, জিয়াউর রহমান, শাহাদাত হোসেন, নুরুল আমিন, বেবি সাহা, কবিতা ইসলাম, জাহিদ হাসান, মনিরুল ইসলাম, মাহমুদুল হাসান, জহিরুল হক, আমিনুল ইসলাম, বিল্লাল হোসেন প্রমুখ।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের জুলাই থেকে এ বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত চাঁদপুর জেলার গ্রাম আদালতে সর্বমোট মামলার সংখ্যা ৯৫৬৮টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ৯৪৫৫, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হওয়া মামলার সংখ্যা ৬৭৫৯, চলমান মামলার সংখ্যা ১১৩টি। ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছে ৫ কোটি ২১ লাখ ৫১ হাজার ৭৬৬ টাকা।
গ্রাম আদালত কি : গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬ অনুযায়ী ছোটখাটো ফৌজদারি ও দেওয়ানী বিরোধ স্থানীয়ভাবে মীমাংসা জন্য ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালত গঠন হয়। গ্রাম আদালত সর্বোচ্চ ৭৫,০০০ টাকা মূল্যমানের ফৌজদারি ও দেওয়ানী বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারে। যে ইউনিয়নে বিরোধ সৃষ্টি হয় সে ইউনিয়নেই গ্রাম আদালত গঠিত হয়। গ্রাম আদালতে আইনজীবী নিয়োগের বিধান নেই।
কেন আমরা গ্রাম আদালতে যাব : গ্রাম আদালতে অল্প খরচে, স্বল্প সময়ে এবং অতি সহজে বিরোধ ও বিবাদ নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। প্রতিনিধি মনোনয়নে আবেদনকারী ও প্রতিবাদী সমান সুযোগ পায়। পক্ষগণ নিজের কথা নিজে বলতে পারে, আইনজীবী দরকার হয়না। গ্রাম আদালতে সমঝোতার ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়, এক বিরোধ থেকে অন্য বিরোধ সৃষ্টির সম্ভাবনা কম থাকে। পক্ষদ্বয়ের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করা হয়।
গ্রাম আদালত কী কী ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারে : চুরি, ঝগড়া-বিবাদ, কহল বা মারামারি, দাঙ্গা, প্রতারণা, ভয়ভীতি দেখানো বা হুমকি দেয়া। কোনো নারীর শালীনতাকে অমর্যাদা বা অপমানের উদ্দেশে কথা বলা। অঙ্গভঙ্গি করা বা অন্য কোনা কাজ করা। গচ্ছিত কোনো মূল্যবান সম্পত্তি আত্মসাৎ করা। টাকা পয়সা বা পাওনা টাকা আদায় সংক্রান্ত। স্থাবর সম্পত্তি দখল পুনরুদ্ধার সংক্রান্ত। অস্থাবর সম্পত্তি উদ্ধার বা তার মূল্য আদায় সংক্রান্ত। কোনো অস্থাবর সম্পত্তির জবর দখল বা ক্ষতি করার জন্য ক্ষতিপূরণ আদায় সংক্রান্ত। গবাদিপশুর অনধিকার প্রবেশের কারণে ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত। গবাদিপশু মেরে ফেলা বা গবাদিপশুর ক্ষতি সংক্রান্ত। কৃষি শ্রমিকদের পরিশোধযোগ্য মজুরি বা ক্ষতিপূরণ আদায় সংক্রান্ত ইত্যাদি।
গ্রাম আদালত কোন বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারে না : ধর্ষণ, খুন, অপহরণ, ডাকাতি, বাল্যবিবাহ, তালাক, ভরণ পোষণ, অভিভাবকত্ব, দেনমোহর, দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধার, যৌতুক, নারী ও শিশু নির্যাতন, কোনো ঘটনায় রক্তপাত ঘটে থাকলে, স্থাবর সম্পত্তির স্বত্বাধিকার সংক্রান্ত এবং ৭৫,০০০ টাকার অধিক মূল্যমানের যে কোনো বিরোধ।
গ্রাম আদালতে কিভাবে আবেদন দাখিল করতে হবে : আবেদনকারীকে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আবেদনপত্র সংগ্রহ করে যথাযথভাবে পূরণ করতে হবে। আবেদনপত্র ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বরাবর দাখিল করতে হবে। আবেদন পত্র দাখিলের সময় মামলার জন্য ১০ টাকা এবং দেওয়ানী মামলার জন্য ২০ টাকা ফিস দিতে হবে এবং রসিদ সংগ্রহ করতে হবে। দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রে মামলার বিরোধ সৃষ্টি হওয়ার ৬০ দিনের সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করতে হবে, স্থাবর সম্পত্তি বেদখল হওয়ার দিন থেকে ১ বছরের মধ্যে মামলা দায়ের করা যাবে।
গ্রাম আদালত কোন কোন ক্ষেত্রে এবং কত টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে : মিথ্যা মামলা দায়ের করলে, গ্রাম আদালতে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হলে মিথ্যা মামলা দায়েরকারীকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারবেন। সাক্ষী কর্তৃক সমন অমান্য করলে, গ্রাম আদালত কর্তৃক জরিকৃত সমর সাক্ষী ইচ্ছা করে অমান্য করলে, গ্রাম আদালত ঐ সমন অমান্যকারী সাক্ষীকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারবেন। গ্রাম আদালত অবমাননা করলে, কোনো ব্যক্তি যদি গ্রাম আদালত অবমাননা করে তাহলে গ্রাম আদালত সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারবেন। গ্রাম আদালত অবমাননার সামিল হলো, গ্রাম আদালত সম্পর্কে অশালীন কথা বলা বা হুমকি দেয়া। গ্রাম আদালতের কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা। গ্রাম আদালতের আদেশ সত্ত্বেও কোনো দলিল দাখিল বা অর্পণ বা হস্তান্তর করতে ব্যর্থ হওয়া। আদালতের কাছে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকার করা।
গ্রাম আদালত কিভাবে গ্রামের জনগণকে সহায়তা করতে পারে?
গ্রাম আদালত হলেও স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ বা বিবাদ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা যা দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ( নারী, প্রতিবন্ধী, দলিত সম্প্রদায় ইত্যাদি) ন্যায্য বিচার লাভে সহায়তা করে। গ্রাম আদালতে সবাই অল্প খরচে, স্বল্প সময়ে এবং অতি সহজে প্রতিকার পায়। গ্রাম আদালতে আবেদনপত্র দাখিলের ফিস ছাড়া অন্য কোনো খরচ নেই।
১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১।