
জুয়া কারবারী রাঘব-বোয়ালরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে
ইলশেপাড় রিপোর্ট
চাঁদপুরের বিভিন্ন ক্লাবে এখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি চলছে। ফলে রাত পোহালে এখন আর ক্লাবগুলোতে মাদক আর জুয়া কারবারীদের দেখা মিলছে না। অভিযোগ ছিলো- এসব ক্লাবে নিয়মিত বসত জুয়া আর মাদকে হাট। অভিযোগের তীর ছিলো জেলা প্রশাসন পরিচালিত চাঁদপুর ক্লাবের দিকেও। কিন্তু চাঁদপুর ক্লাবের সাথে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সেখানে জুয়া বা অবৈধ কোন কর্মকা- হয় না। আর মুক্তিযোদ্ধাদের নিজস্ব চেম্বার কাম ক্লাব মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাবের বিরুদ্ধে সীমাহীন অভিযোগ সর্বমহলে। এছাড়া চাঁদপুর স্টেডিয়ামে অবস্থিত আবাহনী ক্লাবের জুয়া চলতো বলে বিভিন্নজন জানিয়েছেন। অভিযানের খবর টের পেয়ে সেখান থেকে জুয়াড়িরা সরে যায়। তবে ক্লাবগুলোতে নিজেরা ‘টুকটাক বাজি’ খেলেন বলে কেউ কেউ দাবি করেন।
এদিকে চাঁদপুর শহরতলীর বাবুরহাট একাদশ ক্লাবে পুলিশের অভিযানে ৯ চিহ্নিত জুয়ারিকে আটক করে পুলিশ। আটকদের মধ্যে ৭ জনকে কারাদণ্ড ও ২ জনকে অর্থদণ্ড দিয়েছে আদালত। সাজাপ্রাপ্তরা হলেন- আওয়ামী লীগ নেতা যুবরাজ চন্দ্র দাস, স্থানীয় আব্দুল মান্নান মাল, ছিদ্দিক মিজি, সেলিম মিজি, ইসমাইল শেখ, দুলাল ধর ও বশির সৈয়াল।
অপরদিকে অর্থ দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সদস্য সুকুমার কর রামু ও ইমদাদুল হক পাটোয়ারী। গত শনিবার রাতে অভিযান চালিয়ে তাদের জুয়ার আসর থেকে আটক করে পুলিশ। পরদিন চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. নুরে আলম তাদের এই দণ্ড প্রদান করেন।
তবে আলোচিত মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ কেউ বলছেন, জসিম নামের এক ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভবন ভাড়া নিয়ে শহরের বড় জুয়ার আসর বসাতো। আর অবৈধ নেশাসহ লাখ-লাখ টাকার জুয়া খেলা হতো। অভিযান শুরুর আগের দিন পর্যন্ত সেখানে জুয়া চলে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে জানিয়েছেন। সেখানে লাখ লাখ টাকার ‘কাটাকাটি’ খেলা হতো।
এমন অভিযোগের সাথে দ্বিমত করেছেন চাঁদপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার এম এ ওয়াদুদ। তিনি বলেন, আমি যখন এসব বিষয়ে জেনেছি, ঠিক তখনি তাদের বের করে দিয়ে ঐ রুমে ডাবল তালা দিয়েছি। এখন আর সংসদ কার্যালয়ে মাদক আর জুয়ার কারবার চলে না।
এদিকে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মাজেদুর রহমান খান দাবি করেছেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে জেলার সব অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। যেসব কার্যক্রমে অনুমোদন নেই, এমন কোন কার্যকলাপ জেলার কোথাও পরিচালিত হবে না। তবে তিনি এমনটাও দাবি করছেন, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত চাঁদপুর ক্লাবও একই নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান বলেন, ক্লাব কেন্দ্রিক অবৈধ জুয়ার আসর বসে এমন বিষয়টি আমার নজরে আসার সাথে সাথেই অভিযান শুরু করে দিয়েছি। এখন থেকে চাঁদপুরের এসব ক্লাব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে থাকবে।
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) চাঁদপুরের সভাপতি অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোশারফ হোসেন বলেন, এমন অন্যায় ও অনৈতিক কাজ আরো আগে বন্ধ করা উচিত ছিলো। এটি যেন লোক দেখানো না হয়।
এদিকে চাঁদপুরের আলোচিত মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, নতুন বাজার ক্রীড়াচক্র, আবাহনী স্পোর্টিং ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাব, সোনালী অতীত ক্লাব, পূর্ব শ্রীরামদী ক্লাব, বাবুরহাট একাদশ ক্লাবের সাথে জড়িত চিহ্নিত রাঘব-বোয়ালদের এখনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আটক করেনি। খেলাধুলার আড়ালে এসব ক্লাবে অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে এমন কর্মকাণ্ডের সাথে কেবল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ’ই নয় প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিরাও জড়িত বলে চাউর আছে।
সারা দেশের মতো চাঁদপুরে এসব অবৈধ কার্যকলাপ বন্ধে অভিযান পরিচালনায় সাধুবাদ জানিয়ে চাঁদপুর প্রতিদিনের সম্পাদক ও প্রকাশক ইকবাল হোসেন পাটওয়ারী। তিনি দাবি করেন, এসব আরও আগে বন্ধ করা দরকার ছিল। এমনকি চাঁদপুর ক্লাবে অবৈধ জুয়া খেলাও মেনে নেয়া যায় না।’
তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, জাতির গর্ব মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভবনের মতো একটি জায়গায় জুয়া খেলবে, এটি মেনে নেয়া যায় না। এখানে একাধিকবার পুলিশি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিলো। তারপরও সেখানে জুয়া খেলা চলে।
নতুন বাজার ক্রীড়া চক্রের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক রাফিউস শাহদাত ওয়াসিম মোবাইলে জানান, নতুন বাজার ক্রীড়া চক্র প্রায় দু’মাস যাবত বন্ধ রয়েছে। সেখানে তারা অবৈধ কোন কাজের প্রশ্রয় দেন না। জুয়াসহ অন্য কোন অবৈধ খেলাও এই ক্লাবে হয় না।
অপরদিকে পুরাণবাজার ভাই ভাই ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান দাবি করছেন, তাদের ক্লাবে কোনও জুয়ার আসর বসে না। ফুটবল, ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট ছাড়া এ ক্লাবে অন্য কোন খেলার আয়োজন থাকে না। তবে ক্লাবটির উদ্যোগে বৃহত্তর পরিসরে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়।
রাতভর বাতিজ¦লা চাঁদপুরের ক্লাবগুলো এখন ঘুটঘুটে অন্ধকারে। ক্লাবগুলোতে চলে আসা জুয়া-মাদসহ বিভিন্ন অবৈধ কার্যক্রম বন্ধে কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। যদিও অভিযোগ আছে, চাঁদপুর শহরের ক্লাবগুলোর সঙ্গে জড়িত চাঁদপুরের বিভিন্ন দল ও সংগঠনের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।
সম্প্রতি ক্যাসিনো, জুয়া, মাদক, টেন্ডারবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। এরপরই দেশব্যাপী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নেয়া শুরু করে। পরদিন থেকে চাঁদপুরের স্থানীয় প্রশাসনও ব্যবস্থা নিতে শুরু করে। অভিযানে চাঁদপুরের বাবুরহাট একাদশ ক্লাব থেকে ৯ জুয়াড়িকে আটক করে পুলিশ।
অভিযানের আগে চাঁদপুর শহরের বেশ কয়েকটি ক্লাবেই সন্ধ্যার পর থেকে রাতভর বসতো জমজমাট জুয়ার আসর। সঙ্গে থাকতো মদসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের ধূমায়িত আড্ডা।
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯।