মধ্যরাত হতে ইলিশ শিকারে জেলেরা
ইলশেপাড় রিপোর্ট
চাঁদপুর মেঘনা-পদ্মায় মা ইলিশ রক্ষার ২২ দিনের অভিযান সোমবার (২৫ অক্টোবর) রাতে শেষ হয়েছে। মধ্যরাত থেকে জেলেরা নদীতে মাছ শিকারে নামছে। মা ইলিশ রক্ষা জেলা প্রশাসন ও টাস্কফোর্সের অভিযানে মেঘনায় মাছ শিকারের অভিযোগে প্রায় ৮শ’ জেলেকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ২শ’ ১৮ জনকে ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড প্রদান করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
ইলিশ রক্ষা অভিযানে ১ লাখ ১১ হাজার ৯শ’ ৫০ কেজি মা ইলিশ ও ১০ কোটি ৭ লাখ ২শ’ ১৯ মিটার কারেন্ট জালসহ ২শ’ ৬৮টি নৌকা জব্দ করে টাস্কফোর্স।
এছাড়া নদীতে ইলিশ রক্ষায় ২শ’ ৭১টি অভিযানে ৯২টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। অভিযানগুলোতে ১শ’ ৮টি মামলার বিপরীতে ৯ হাজার ৫০টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। জব্দকৃত মা ইলিশ নিলামে বিক্রয় করে ১ লাখ ৯ হাজার ৫০ টাকা রাজস্ব আয় দেখানো হয় বলে নিশ্চিত করেন চাঁদপুর জেলা মৎস্য দপ্তর।
এদিকে প্রতি বছরই এই সময়ে মা ইলিশ রক্ষায় নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করে সরকার। প্রশাসন কঠোর নজরদারীর মাধ্যমে জেলেদের মাছ শিকার থেকে বিরত রাখছে। এবারের মা ইলিশ রক্ষার অভিযানের সক্ষমতার অভিযোগ উঠছে শুরু থেকেই। নদী অঞ্চলের সাধারণ মানুষরা অভিযোগ করছে, অবাধেই জেলেরা মা ইলিশ নদীতে শিকার করছে। প্রতিদিনই শত-শত নৌকা নিয়ে জেলেরা মাছ ধরেছে। দিন-রাত সর্বত্রই তারা সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে মাছ ধরা অব্যাহত রাখে। ফলে অভিযানে তেমন কোন সুফল বয়ে আনবে না বলে মনে করা হচ্ছে।
এতে এবারে চাহিদার তুলনায় কম মাছ উৎপাদন হলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। স্থানীয়রা দাবি করছেন, ইলিশ রক্ষায় নদীতে অভিযান পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসন স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন করেন। আবার এই টিমের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ছিলেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. গোলাম মেহেদী হাসান।
জেলেরা অভিযোগ করছেন, মা ইলিশ রক্ষা কার্যক্রম চলাকালীন সময়ে প্রতিবছর প্রায় ৫২ হাজার জেলেকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হতো। এ বছর প্রায় ৪৫ হাজার জেলেকে খাদ্য সহায়তা দেয় প্রশাসন। এতে করে বাদ পড়া ৭ হাজার জেলে জীবন-জীবিকার প্রয়োজনেই ইলিশ শিকারে নামে। জেলে ইয়াছিন ও হযরত আলীর দাবি, খাদ্য সহায়তা বঞ্চিত অধিকাংশ জেলেই নিষেধাজ্ঞা অবজ্ঞা করে নদীতে এসে মা ইলিশ নিধন করেছে।
জেলেরা আরো দাবি করছেন, তাদের শিশু ও কিশোর সন্তানদের মাধ্যমে মা ইলিশ নিধনে নদীতে জাল ফেলেন। কারণ এসব শিশু-কিশোররা অভিযানে ধরা পড়লে প্রশাসন শিশু আইনে তাদের জরিমানা আদায় করে ছেড়ে দেন। যার ফলে জেলেরা মা ইলিশ নিধনে অনেকটাই সফল হন।
জেলেদের অভিযোগ ইলিশের প্রজনন মৌসুম হওয়ায় সাগরের সব ইলিশই নদীতে চলে আসায় জাল ফেললেই মনে-মনে ডিমওয়ালা মা ইলিশ জালে আটকা পড়তো। এতে করে জেলেরা প্রতিদিনই নদীতে জাল ফেলতে উৎসাহ পেত। পাশাপাশি প্রশাসনিক সহায়তা পাওয়ায় তারা মাছ শিকার করে অনেকটাই নিশ্চিন্তে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. গোলাম মেহেদী হাসানের দাবি, অভিযানকে গতিশীল করকে জেলা প্রশাসন র্যাবের সহযোগিতা চায়। কিন্তু তারা আসবে বলে সময় নিলেও শেষ পর্যায়ে আর অভিযানে অংশ নেয়নি র্যাব। যার কারণে কিছু-কিছু এলাকায় জেলেরা মাছ শিকারে নদীতে নামতে দেখা গেছে।
জেলেদের নিধনকৃত মা ইলিশ নদী তীরবর্তী হরিণা, আখনের হাট, দোকানঘর, বহরিয়া, আলুর বাজার, আনন্দ বাজার, কোড়ালিয়া নদীর পাড়, টিলাবাড়ি, পুরানবাজার হরিসভা, নন্দীগো দোকান, চান্দ্রা নদীর পাড়, লক্ষ্মীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে মা ইলিশ প্রকাশ্যেই বিক্রি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে।
মৎস্য ব্যবসায়ী, জেলেসহ স্থানীয়রা বলছে, প্রশাসন আরো আন্তরিক হলে জাতীয় সম্পদ ইলিশ রক্ষায় কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হতো। পাশাপাশি প্রতিবারই ইলিশের অভায়শ্রম ও মা ইলিশ রক্ষার অভিযান পরিচালনায় যেসব দুর্বলতা থাকে তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই সুফলতা আসবে। পাশাপাশি যেহেতু অর্ধ লক্ষ জেলেকে খাদ্য সহায়তা দেয়ার পরও যেহেতু তারা নদীতে নামছে সে হিসেবে ঐ সহায়তাও বাতিল করা প্রয়োজন। এসময় তারা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে।
২৬ অক্টোবর, ২০২১।
