বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে দিশেহারা সাধারণ মানুষ
এস এম সোহেল
চাঁদপুর জেলায় ব্যাটারিচালিত রিক্সা-অটোরিক্সা প্রায় ১০ হাজারের বেশি। এসব রিক্সা চার্জের জন্য চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে শত-শত চোরাই চার্জার গ্যারেজ গড়ে ওঠেছে। এতে সরকার হারাচ্ছে প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব আয়। তবু চলছে অবৈধ অটোরিক্সা ও ব্যাটারিচালিত রিক্সা। ফলে শহরসহ অলিতে-গলিতে যানজট বাড়ছে। বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে। এর ফলে সারাদিন বিদ্যুতের লোডশেডিং তো হয়েই থাকে। এছাড়া মানুষ যখন ঘুমাতে যাবে রাত ১টার পর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত আন্তত ৪/৫ বার বিদ্যুতের লোডশেডিং হয়। চাঁদপুরের ১৫০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০২২ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে গ্যাস বুস্টারের কারণে বন্ধ আছে। অবৈধ অটোরিক্সা ও ব্যাটারিচালিত রিক্সা গ্যারেজের কারণে লাভবান হচ্ছে চোরাই বিদ্যুৎ সংযোগকারী সিন্ডিকেট চক্র। বিদ্যুতের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে দিন-দিন চাঁদপুরে বেড়ে চলেছে এই অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের জাল।
সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, চাঁদপুর শহরে বিভিন্ন এলাকায় সড়কে পাশে অন্তঃত শতাধিক গ্যারেজে বিদ্যুতের চোরাই লাইন আছে। প্রতি রাতে এসব গ্যারেজে শত শত অটোরিক্সা চার্জ দেন চালকেরা। একেকটি অটোরিক্সা চার্জে নেওয়া হচ্ছে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা। ১১ হাজার কেভির মেইন লাইন থেকে চোরাই লাইন নামিয়ে বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয়েছে এসব গ্যারেজে। অবৈধ কোন গ্যারেজের মালিকের সাথে অসাধু কর্মকর্তার ভাগ-বাটোয়ারা নাহলে মাঝে-মধ্যে দেখা যায়, ঐ গ্যারেজে বিদ্যুতের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দিয়ে অভিযান চালিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ আইনে মামলা করা হয়।
আগে বিভিন্ন সময় দেখা যেতো পৌরসভা ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথ অভিযান চালিয়ে রিক্সা থেকে মোটর জব্দ করে। জব্দকৃত রিক্সার মোটর খুলে ছেড়ে দেওয়া হতো। এতে রিক্সা অলিতে-গলিতে চললেও শহর এলাকায় চলতো না। শহরে কিছুটা যানযট কমতো। বেশ কয়েকমাস ধরে অটোরিক্সার তেমন অভিযান চোখে পড়েনি। এতে একপ্রকার নিরাপদেই মোটরে চালিত রিক্সা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা চলছে। বর্তমানে শহরে যাত্রীদের চেয়ে রিক্সা ও অটোরিক্সা বেশি। একজন অথবা দু’জন যাত্রী নিয়ে রিক্সা ও অটোরিক্সা দাবরিয়ে বেড়াচ্ছে। আর এর ফলে শহরে লেগে থাকে প্রায় সারাক্ষণ যানজট।
চাঁদপুর শহরে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য সিএনজি স্কুটার, ব্যাটারিচালিত অটোবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিক্সা চার্জের গ্যারেজ। এসব গ্যারেজে ২০/৩০টি করে গাড়ি চার্জ দেয়া হয়। আর এসব গাড়ি চার্জ দিতে গ্যারেজ মালিকরা অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে এসব ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা চার্জ দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগে গাড়ি চার্জ দিতে গিয়ে বেশ কয়েকজন চালক বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে হতাহতের সংবাদ প্রকাশ হয়েছে স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে।
চাঁদপুর শহরে দিনের বেলা সড়কগুলোতে হাঁটা-চলাফেরা করতে শহরবাসী চরমভাবে দুর্ভোগ পোহাতে হয় যানজটের কারণে। একটি অশুভ চক্র নিজ বাড়িতে কিংবা অলিতে-গলিতে দোকান অথবা বাসা ভাড়া নিয়ে গাড়ি রাখা ও গাড়ির ব্যাটারি চার্জের ব্যবসায় নেমেছে। এ অশুভ চক্রটি অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ এনে চার্জের ব্যবসায় করে যাচ্ছে মাসের পর মাস। এক একটি গাড়ি চার্জ দিতে কমপক্ষে ৪/৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। যার ফলে শহর এলাকায় বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিং দেখা দিয়ে থাকে।
চাঁদপুর শহরের ট্রাকরোড, ট্রাকঘাট, ৫নং খেয়াঘাট, ৩নং কয়লাঘাট, বড়স্টেশন রিক্সা স্ট্যান্ড, জামতলা, কাচ্চা কলোনী, বাস স্টেশন, চেয়ারম্যানঘাটা, দর্জি ঘাট, বঙ্গবন্ধু সড়ক, তরপুরচন্ডী, আনন্দবাজার, বিটিরোড, জিটি রোড, ওয়্যারলেছ, মঠখোলা, বাবুরহাট, পুরাণবাজারের রঘুনাথপুর, দোকানঘর, বালিয়া, বাগাদী, লক্ষ্মীপুর, হানারচরসহ পুরাণবাজারের বিভিন্ন এলাকা ও পৌর এলাকায় বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় কয়েক শতাধিক এ ধরনের গ্যারেজ গড়ে উঠেছে। এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ না থাকায় নির্দ্বিধায় একদল অসাধু লোকজন দোকান/বাসা ভাড়া করে অভৈধ গ্যারেজ নির্মাণ করে বিদ্যুৎ সংযোগ এনে ব্যাটারিচালিত গাড়ি চার্জের ব্যবসা করে যাচ্ছে। এসব অবৈধ গ্যারেজের কারণে আর অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে শহরবাসী যেমনি চরম ভোগান্তির শিকার পোহাতে হচ্ছে, তেমনিভাবে দেখা দিয়েছে শহরে ঘন ঘন বিদ্যুতের লোডশেডিং। এ লোডশেডিংয়ের কারণে স্কুল, কলেজে পড়–য়া শিক্ষার্থীদের চরমভাবে পড়ালেখায় বিঘœ ঘটছে। ইতোমধ্যে শহরের স্কুল ও কলেজে পরীক্ষা চলমান রয়েছে। তাদের কথা বিবেচনা করে প্রশাসন এসব অবৈধ গাড়ি চার্জের গ্যারেজগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে এমনটাই চায় শহরবাসী।
একজন রিক্সা মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, পায়েচালিত বৈধ রিক্সাগুলোতে এখন আর যাত্রীরা উঠে না। আস্তে আস্তে পায়েচালিত রিক্সা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আর অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিক্সা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে সরকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একটি ব্যাটারিচালিত রিক্সার ব্যাটারি চার্জে ৫ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। প্রতি রিক্সায় চার্জ হিসেবে খরচ হয় প্রায় ২০০ টাকা। শুধু শহরেই নয় গ্রামেগঞ্জে দিন দিন এসব ব্যাটারিচালিত রিক্সা ছড়িয়ে পড়ছে। আর সরকার প্রতি মাসে বিদ্যুৎ থেকে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
একইভাবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যুৎ বিভাগের এক মিটার রিডার জানান, একটি অটোরিক্সায় ৩টি থেকে ৫টি ব্যাটারি থাকে। তিন ফেজের লাইনে চার্জ দেওয়ার সময় লাইনে লোড বেড়ে যায়। তখন ট্রান্সফরমারগুলো ঘনঘন বিকল হয়ে যায়।
২৮ মে, ২০২৩।
