চাঁদপুরে প্রশাসনের তৎপরতায় সর্বাত্মক লকডাউন

সংক্রমণ বাড়ছেই, বিপাকে দিনমজুর ও শ্রমজীবীরা

ইলশেপাড় রিপোর্ট
চাঁদপুরে সর্বাত্মক লকডাউন বাস্তবায়নে তৎপর সংশ্লিষ্ট প্রশাসনসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। সরকার ঘোষিত ৭ দিনের কঠোর এই লকডাউনে বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হলে জরিমানা করছে জেলা প্রশাসন। গত ৩ দিনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সর্বসাধারণকে ঘরে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রাখছে। সাথে প্রশাসনের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং করছেন। প্রথম দিনের তুলনায় গত দুই দিনে চাঁদপুরে দোকান-পাট এক প্রকার বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। সেনাবাহিনী, র‌্যাব, বিজিবি ও পুলিশ সদস্যদের যৌথ তৎপরতায় রাস্তায় যানবাহনও অনেকটাই শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে দেখা গেছে।
এদিকে দেশে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধিও উর্ধ্বমুখিতা কিছুতেই কমছে না। সাথে বাড়ছে মৃত্যুর হারও। শনিবার (৩ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলিটিনে দেখা গেছে- দেশে আরও ১শ’ ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত করোনায় দেশে মোট মৃত্যু হয়েছে ১৪ হাজার ৯শ’ ১২ জনের। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে করোনা আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ৬ হাজার ২শ’ ১৪ জন। এ নিয়ে দেশে মোট শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৯ লাখ ৩৬ হাজার ২শ’ ৫৬ জনে।
অপরদিকে চাঁদপুর জেলা পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, গত শুক্রবার করোনা পরীক্ষায় ১৭ পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। ঐ দিনে ৪৬ পুলিশ সদস্যকে করোনা পরীক্ষা করা হলে তাদের মধ্যে ১৭ জন পুলিশ সদস্য পজিটিভ রিপোর্ট আসে। তারা হলেন- মো. আক্তার হোসেন, মো. কাউছার, মো. বশিরুজ্জামান শাকিল, বকুল বড়ুয়া, মো. সালাম, মো. আলাউদ্দিন, মো. ইসমাইল হোসেন, মো. ইসমাইল হোসেন, মো. নজরুল ইসলাম, মো. আতিকুল ইসলাম, মামুন, ফারুকুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর ও মো. নিজাম উদ্দিন।
চাঁদপুর ২৫০ শয্যার সরকারি জেনারেল হাসপাতালের আরএমও ও করোনা ফোকালপার্সন ডা. সুজাউদৌলা রুবেল জানান, শুক্রবার চাঁদপুর জেলা পুলিশের ৪৬ জন পুলিশ সদস্য করোনার স্যাম্পল দিলে সন্ধ্যায় ১৭ জনের পজিটিভ রিপোর্ট আসে। এর মধ্যে বেশি অসুস্থ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
দেশব্যাপী চলমান এই সর্বাত্মক কঠোর লকডাউনের পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমের কারণে চরম বিপাকে পরেছে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। শহর কিংবা গ্রাম সর্বত্রই এখন হাহাকার বিরাজ করতে দেখা গেছে নিম্ন আয়ের মানুষদের। তারা এখন নিজ পরিবারের জন্য কিভাবে খাবার যোগাড় করবেন কিংবা সংসার চালাবেন এ নিয়েই চিন্তায় আছে। চাঁদপুরের বিভিন্ন উপজেলায় দেখা যায়, রাস্তার মোড়ে কিংবা বাজারের পাশে বসেন জুতা, তালা-চাবি মেরামত কিংবা ছাতার কারিগররা। একদিকে থেমে থেমে বৃষ্টি আবার অন্যদিকে লকডাউনের কারণে সাধারণ মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে। এমন পরিস্থিতিতে এসব শ্রমজীবীরা উদ্বেগ করতে দেখা গেছে।
চাঁদপুরে সর্বাত্মক লকডাউন চলমান থাকায় অনেকেই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তারমধ্যে বিদেশগামী শ্রমিকরা অনেকটাই বিপাকে আছেন। তারা ভ্যাকসিনের রেজিস্ট্রেশনের জন্য জেলা জনশক্তি কর্মসংস্থান কার্যালয়ে ভিড় অব্যাহত রাখছেন। জেলা জনশক্তি কর্মসংস্থান কার্যালয়ে গত দুই দিনে শত-শত প্রবাসী শ্রমিক করোনা ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা যায়। অনেকে আবার ‘সুরক্ষা’ পোর্টালে রেজিস্ট্রেশন করতে ব্যর্থ হয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে দেখো গেছে।
চাঁদপুর জেলা জনশক্তি জরিপ কর্মকর্তা মো. মোহছেন পাটওয়ারী জানান, সরকার প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মস্থলে গমন নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত করতে বিদেশগামী কর্মীদের অপ্রাধিকার ভিত্তিতে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিএমইটির স্মার্টকার্ড আছে সেসব কর্মীর টিকার জন্য সুরক্ষা অ্যাপে নিবন্ধনের সুবিধার্থে বৈধ পাসপোর্ট দিয়ে ২ জুলাই থেকে বিএমইটির ডাটাবেজে নিবন্ধন করতে হয়। প্রবাসীদের সুবিধার্থে রেজিস্ট্রেশন শুরু হলেও সারাদেশে অনলাইন সার্ভার সমস্যা দেখা দিয়েছে। তা কখন ঠিক হবে বলা যাচ্ছে না।
অপরদিকে চাঁদপুরে লকডাউন অমান্য করায় লকডাউনের দ্বিতীয় দিনে শহরের বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১৩ হাজার ৫শ’ টাকা অর্থদণ্ড আদায় করছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। শহরে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান মাহমুদ ডালিম। তিনি স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন ও ভোক্তা অধিকার আইন লঙ্ঘনসহ সরকারি বিধিনিষেধ অমান্য করায় ৯টি মামলায় ১৩ হাজার ৫শ’ টাকা জরিমানা আদায় করেন।
লকডাউনের তৃতীয় দিনে চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলার হাট-বাজারের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রশাসনিক কড়াকড়ির কারণে রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা ছিল অনেক কম। এছাড়া দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ার কারণেও সাধারণ লোকজনও ছিলো অনেকটাই ঘরবন্দি। বিভিন্ন এলাকার বাজার ও অলিগলিতে মানুষের জটলা এবং স্বাস্থ্যবিধি না মেনে আড্ডা দিতেও দেখা গেছে অনেকইে। অনেক এলাকায় পুলিশের টহল দেখে মানুষ দৌঁড়ে ঘরে ঢোকা এবং পুলিশ চলে গেলে আবারও ঘর থেকে বের হয়ে আসতে দেখা গেছে। তবে স্থানীয় সব হাট-বাজারেই উপেক্ষিত ছিল স্বাস্থ্যবিধি।
দেশে চলমান করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণে ৭ দিনের লকডাউন আরো এক সপ্তাহ বৃদ্ধির চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার। তবে মাঠ পর্যায়ে এ লকডাউন কার্যকরে আরো কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে সরকার নির্দেশিত বিধিনিষেধ লোকজনকে মানাতে পাড়া-মহল্লায়ও অভিযান পরিচালনা করবে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। গতকাল শনিবার লকডাউনে র‌্যাবের কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা জানান র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কামান্ডার খন্দকার আল মঈন।

০৪ জুলাই, ২০২১।