এস এম সোহেল
অমর একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস চাঁদপুরে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে। একুশের প্রথম প্রহর ২০ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে চাঁদপুর শহরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সড়কস্থ কেন্দ্রিয় শহীদ মিনার বেদীতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সংগঠন পর্যায়ে ৫ জন ও ব্যক্তি পর্যায়ে ২ জন শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর নির্দেশনা দিয়েছিলেন জেলা প্রশাসন। সুশৃঙ্খলভাবে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সব শ্রেণি ও পেশার মানুষ শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। পরদিন ভোরেও বিভিন্ন সংগঠন চাঁদপুর কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে।
সকালে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা, অফিস-আদালত এমনকি অনেকে নিজস্ব বাসা-বাড়িতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতভাবে উত্তোলন করে। একইভাবে বিভিন্ন উপজেলায়ও মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়। জেলা সদরে উদযাপন হয় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আর উপজেলাগুলোতে উদযাপন হয় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে।
চাঁদপুর শহরে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে গত সোমবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসন আয়োজনে জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, আজ ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর পার হয়ে যাচ্ছে। আজ কতটুকু এগিয়েছি বাংলা ভাষায় তা আমাদের ভেবে দেখতে হবে। তবে আমাদের অনেক প্রাপ্তি রয়েছে। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করে দেশকি স্বাধীন করেছি।
তিনি আরো বলেন, পরিকল্পনা করে আমাদের ঘটতি পূরণ করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন করতে পারছি না। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো বাংলা ভাষায় চর্চা করা হয় না। এছাড়া অনেক স্কুল রয়েছে যেখানে আমাদের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে শিশুদের জানানো হয় না। এগুলোর দিকে আমাদের নজর রাখা উচিত এবং বাংলা ভাষাসহ দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য বিকৃতকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
জেলা প্রশাসক আরো বলেন, আমাদের শিশুদের বিনোদনের মাধ্যমে বাংলায় চর্চায় অভ্যস্ত করা যেতে পারে। আমাদের দেশে শিশুদের বাংলায় বিনোদনের ব্যবস্থা তেমন নেই। ‘মীনা’ কার্টুনের মত আরো সুস্থ বিনোদন আমাদের শিশুদের দিতে হবে। আমাদের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরী করে দিতে হবে। বাঙালি সংস্কৃতি খুব সুস্থ ও সবল সংস্কৃতি। সম্মিলিতভাবে আমরা সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করতে পারবো।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইমতিয়াজ হোসেনে সভাপতিত্বে এবং সাংবাদিক এমআর ইসলাম বাবুর পরিচালনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন পুলিশ সুপার মো. মিলন মাহমুদ, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ নাছির উদ্দিন আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আবু নঈম পাটওয়ারী দুলাল, চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন মিলন, সাবেক সভাপতি ইকবাল হোসেন পাটওয়ারী, পুরাণবাজার ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ রতন কুমার মজুমদার, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি তপন সরকার, বিশিষ্ট ছড়াকার ডা. পিযুষ কান্তি বড়ুয়া প্রমুখ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ভাষা শহীদ স্মরণে ১ মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয়। আলোচনা সভা শেষে চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমির সহযোগিতায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত এবং আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
এছাড়া মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে চাঁদপুর জেলার সব স্কুল, কলেজসহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, শিক্ষক/শিক্ষিকারা স্বল্পপরিসরে স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে দিবসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সঙ্গীত পরিবেশন সহকারে শহরের প্রধান প্রধান সড়কে প্রভাতফেরি বের করা হয়। ঐদিন শহীদের স্মরণে জেলার সব স্কুল-কলেজসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি অধা-সরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ভবনে সঠিক নিয়মে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতভাবে উত্তোলন করা হয়েছে।
সব স্কুল-কলেজসহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বই পাঠ, স্মরচিত ছড়া ও কবিতা প্রতিযোগিতা এবং কলেজে সর্বসাধারণের জন্য ২১ সংক্রান্ত প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার আয়োজন এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলার সব মসজিদে বাদ জোহর এবং মন্দির ও গীর্জায় শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা দোয়া কামনা করা হয়।
চাঁদপুর জেলা আ.লীগের বিভিন্ন কর্মসূচি পালন : অমর একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগ। গত সোমবার সকাল সাড়ে ৭টায় জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় প্রাঙ্গণে জাতীয় পতাকা, দলীয় পতাকা ও কালো পতাকা উত্তোলন করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাছির উদ্দিন আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক আবু নঈম পাটওয়ারী দুলালসহ নেতাকর্মীরা। এরপর সকাল ৮টায় দলীয় কার্যালয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান ও ভাষা শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে জেলা আওয়ামী লীগ, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
এরপর সকাল সাড়ে ৮টায় জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ নাছির উদ্দিন আহমেদ। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবো এই হোক আমাদের আজকের শপথ। শেখ হাসিনার নেতৃত্ব আজ বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ উন্নয়নে রোল মডেল। অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিতারিত করে দলকে কলঙ্কমুক্ত করকে হবে। নতুন প্রজন্মকে দেশের ইতিহাস জানতে হবে। আওয়ামী লীগ তিলে তিলে গড়া রাজনৈতিক দল। ত্যাগীদের মূল্যায়ন ও স্থান দিতে হবে।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু নঈম পাটওয়ারী দুলাল তার বক্তব্যে বলেন, ঐক্যের বিকল্প নেই। ভাড়াটিয়া হাইব্রিড আনলে ভোট বাড়বে না, লোক বাড়বে। ১৯৭১ সাথে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যেভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, তেমনি চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ঝাঁপিয়ে পড়বো এটাই হোক আজকে আমাদের শপথ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
এসময় আরো বক্তব্য রাখেন চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইঞ্জি. আব্দুর রব, আব্দুর রশিদ সরদার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ আখন্দ, অ্যাড. জহিরুল ইসলাম, আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাড. রুহুল আমিন সরকার, দপ্তর সম্পাদক শাহ আলম মিয়া, সদস্য অ্যাড. বদরুজ্জামান কিরণ, আলহাজ বেলায়েত হোসেন গাজী বিল্লাল, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক শ্রম বিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া, সদস্য অ্যাড. জসিম উদ্দিন পাটোয়ারী, পৌর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাব্বির হোসেন মন্টু দেওয়ান, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া, শ্রম বিষয়ক সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু, জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক আলহাজ মিজানুর রহমান কালু ভূঁইয়া, জেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস মোরশেদ জুয়েল, জেলা শ্রমিক লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহবুবুর রহমান, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ওহিদুর রহমান, মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী রেনু বেগম, পৌর মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মনি বেগমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
এছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে ছিলো- বাদআছর বিভিন্ন মসজিদ-মন্দিরসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ দোয়া করা হয়।
২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২২।
