দিশেহারা মধ্যবিত্ত পরিবার
স্টাফ রিপোর্টার
রমজান মাস বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ মাস হিসেবে সৌদিআরবসহ বিভিন্ন দেশে প্যণ্যের দাম কমিয়ে দিলেও আমাদের দেশে হয় তার উল্টোটা। রমজান মাস আসলেই এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ি বাড়িয়ে দেয় যাবতীয় নিত্যপণ্যের দাম। এবছর করোনার দোহাই দিয়ে ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে নিম্ন আয়ের মধ্যবিত্ত পরিবার।
চাঁদপুর জেলা শহরের বাজারগুলোতে শাক-সবজি, তেল, ডাল, মাছ ও মাংসসহ সব পণ্যের দাম বাড়তি। জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে মিনিকেট চাল (হরিণ জিরা) ৬৫ থেকে ৬৭ টাকা কেজি, নাজির ৬৭ থেকে ৭১ টাকা, কাটারি নাজির, ৭১ থেকে ৭৩ টাকা, আটাশ চাল ৫৩ থেকে ৫৫ টাকা, স্বর্ণা চাল ৫০ টাকা, পোলাওয়ের চাল ৯৮ থেকে ১২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
পুরাণবাজার এলাকায় এক ক্রেতা দৈনিক ইলশেপাড়কে বলেন, ১০ কেজি চাল কিনলে দুই দিনের আয় শেষ হয়ে যায়। বাজারে এলে দোকানিরা আমাদের নিয়ে মজা নেয়, দাম করেও কেনার সাধ্য হয় না। এমন ভাবে দাম বেড়েছে এখন দাম করারও সাহস হয় না। যে টাকা আয় করি তার তিন ভাগের দুই ভাগ চলে যায় বাড়ি ভাড়ায়, বাকি একভাগ দিয়ে কোন রকম চলি, এই ঊর্ধ্বগতির বাজারে এখন আর সেটিও সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে সরকার দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার পরও বাজারে বেড়েছে ভোজ্যতেলের দাম। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় দেশে সয়াবিন তেলের দাম পুনঃনির্ধারণ করে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১১৭ টাকা করা হয়েছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটার প্রতি ১৩৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই নির্ধারিত দামও মানছে না খুচরা দোকানিরা। তারা প্রতিলিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বাড়িয়ে ১৪০ টাকা থেকে ১৪৫ টাকা বিক্রি করছে। খোলা তেল বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকা কেজি।
গত এক মাসে মিনিকেট ও নাজির চালের দাম বেড়েছে ৪.১৭ শতাংশ। আর মাঝারি পায়জাম চালের দাম বেড়েছে ৩.৭৭ শতাংশ।
এদিকে চাল-তেলের মতো বেড়েছে মুরগিরও দাম। প্রতিকেজি বয়লার মুরগি আজ বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায়। কক মুরগি ৩০০-৩৪০ টাকা কেজি, সোনালী মুরগির কেজি ৩৫০-৩৭০ টাকা। দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়, গরুর মাংস ৫৮০ থেকে ৬৫০ টাকা, খাসির মাংস ৯৫০ থেকে ১১৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
অপরদিকে বেড়েছে মাছের দামও। প্রতি কেজি বড় সাইজের রুই মাছ ৪৫০ থেকে ৫৭০ টাকা কেজি, ছোট রুই ৩৪০ টাকাতেও পাওয়া যাচ্ছে। তেলাপিয়ার ২৫০ টাকা কেজি, পাবদা ৪৫০-৫০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। দেশীয় পাঁচ মিশালি মাছ ৫০০ থেকে ৭৫০ টাকা কেজি, চাষের পাঙ্গাস ৩৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
সপ্তাহের ব্যবধানে শহরের বাজারগুলোতে পটল, বেগুন, শিম, বরবটি, ঢেঁড়স, লাউ, টমেটোসহ প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে। করোনায় বিধিনিষেধ আরোপের কারণে সবজির গাড়ি কম আসায় এই দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন পাল বাজারের ব্যবসায়ীরা। সবজির বাজার ঘুরে দেখা যায়, পটল কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা। ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া বরবটির দাম বেড়ে ৭০ থেকে ৮০ টাকা হয়েছে। ঢেঁড়সের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল ৫০ থেকে ৬০ টাকা। দাম বাড়ার তালিকায় থাকা বেগুনের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৮০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা। লাউয়ের পিস বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল ৫০ থেকে ৬০ টাকা। গত সপ্তাহে ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া শিমের দাম বেড়ে ৫০ থেকে ৬০ টাকা হয়েছে। পাশাপাশি পাকা টমেটোর কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ২০ থেকে ২৫ টাকার মধ্যে ছিল।
বেশিরভাগ সবজির দাম বাড়লেও ফুলকপি ও বাঁধাকপি আগের মতো ৩০ থেকে ৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। ধুন্দল, চিচিঙ্গা কিনতেও ভোক্তাদের ৫০ টাকার ওপরে গুণতে হচ্ছে। বাজার ও মানসম্পন্ন ধুন্দলের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। একই দামে বিক্রি হচ্ছে চিচিঙ্গা। শশা আগের সপ্তাহের মতো ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। পালং শাকের আঁটি বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা। একই দামে বিক্রি হচ্ছে লাল শাক। পুঁই শাকের আঁটি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। এক আঁটি ডাটা কিনতে লাগছে ২৫ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত।
সবজির দামের বিষয়ে পাল বাজারের ব্যবসায়ী নেয়ামত আলী দৈনিক ইলশেপাড়কে বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ বৃদ্ধি হওয়ায় অপরদিকে এক সপ্তাহের লকডাউনের কারণে সবজির গাড়ি কম আসছে। এসব কারণেই সবজির দাম একটু বেড়েছে।
চাঁদপুরে সবজি আসতে সমস্যা হচ্ছে কি-না? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ঢাকা থেকে সবজি আসতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে ব্যাপারীরাই মাল কম পাঠাচ্ছেন। মাল বেশি পাঠালে যদি ঠিকমতো দাম না পাওয়া যায়, তেমন আশঙ্কা করেই হয় তো ঢাকার ব্যাপারীরা মাল কম পাঠাচ্ছে।
বিপণীবাগ বাজারের সবজি বিক্রেতা দেলু বেপারী দৈনিক ইলশেপাড়কে বলেন, আড়তে অন্য সময়ের তুলনায় গত কয়েকদিন মাল কম আসছে। দামও বাড়তি। বাড়তি দামে কেনার কারণে আমরাও বাড়তি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।
তিনি বলেন, এর মধ্যে লকডাউন এসে দাম বাড়ার প্রবণতা আরও উস্কে দিয়েছে। আমাদের ধারণা সহসা আর সবজির দাম কমবে না।
প্রায় একই ধরনের কথা বলেন সবজি বিক্রেতা মিলন মাঝি। তিনি বলেন, লকডাউনের কারণে সবজির সরবরাহ কমে গেছে। আর সরবরাহ কমলে দাম বাড়বে এটাই স্বাভাবিক।
উল্লেখ্য, রমজান মাস আরবি মাসসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ মাস। এ মাসের গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য অপরিসীম। দুনিয়ার কোনো সম্পদের সঙ্গে আল্লাহর এ অনুগ্রহের তুলনা চলে না। রমজানের আগমনে বিশ্বনবী (সা.) অনেক আনন্দিত হতেন। সাহাবাদের উদ্দেশে এভাবে ঘোষণা দিতেন বিশ্বনবী (সা.)- তোমাদের দরজায় বরকতময় মাস রমজান এসেছে।
১২ এপ্রিল, ২০২১।
