চাঁদপুরে রমজানে লাগামহীন সবজি ও মাছ-মাংসের বাজার

গলি ভেদে দামের ফারাক, বিপাকে সাধারণ ক্রেতারা!

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
রমজান মাসকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমানোর উদ্যোগ নেন সরকার। আর সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেন ব্যবসায়ীরা। অথচ আমাদের দেশে ভোগ্যপণ্যের দাম কমানোর লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ ও পণ্যের শুল্কমুক্ত কিংবা শুল্ক কমিয়ে দিলেও উল্টো নিয়ন্ত্রণহীন হয় ভোগ্যপণ্যের বাজার। বিশেষ করে রমজানের দুই/একদিন আগে অস্থির হয়ে ওঠে শাক-সবজিসহ কাঁচামাল ও মাছ-মাংসের বাজার।
দেশে মঙ্গলবার (১২ মার্চ) থেকে রোজা শুরু হলেও সৌদিআরবের সাথে মিল রেখে গত সোমবার থেকে অনেকে রোজা রেখেছেন। আর এই রমজানকে ঘিরে প্রতিবছর রোজার আগেই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনী সব পণ্যের দাম বেড়ে যায়। পাশাপাশি রোজার দুই/একদিন আগে লেবু, বেগুন, শসা, কলা, মাছ ও মাংসের দাম নিয়ে চলে তুঘলকি কাণ্ড। চাহিদা বিবেচনায় অসাধু বিক্রেতারা ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে দেন এবং ক্রেতারাও কিনতে বাধ্য হন। সারাদেশের মতো চাঁদপুরেও এর ব্যতিক্রম নয়।
বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি কাঁচামালের মধ্যে প্রতিকেজি বেগুন সর্বোচ্চ ৮০-৯০ টাকায় বিক্রি করছেন। অথচ রোববারও পণ্যটি ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। লেবুর হালি ছিল ২০-৩০ টাকা, এখন ৪০-৮০ টাকা। কলা প্রকারভেদে হালি ছিল ১০-২৫ টাকা, এখন ২০-৬০ টাকা। ক্ষিরা ও শসার কেজি ৪০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৭০-৮০ টাকা, ধনেপাতা কেজিপ্রতি ৪০ টাকা বেড়ে ১২০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৪০ থেকে ১০০-১২০ টাকা হয়েছে।
এছাড়া মুরগি ব্রয়লার ১৮০ টাকা থেকে ২২০ টাকা, গরুর মাংস হাড়সহ ৬৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০০ টাকা, হাড়ছাড়া ৮০০ থেকে বেড়ে ৯০০ টাকা, সবজাতীয় মাছে কেজি প্রতি সর্বোচ্চ ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আবার গলি ভেগে রয়েছে দামের বিস্তর ফারাক। হাজীগঞ্জ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মেইন রোড, হকার্স মার্কেট ও তরকারি পট্টির সামনে বেগুন ৯০টাকা, অথচ তরকারি পট্টির ভিতরে ৬০টাকা।
প্রতিবছরের মতো এবারও রমজানের আগেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। আবার রমজানের আগের দিন চাহিদার তুলনায় যোগান কম হওয়ায় ছোলা, খেসারি ও চিনির দাম আরেক দফা বেড়েছে। ১০৬ টাকার খেসারি ১৬৫ টাকা, ১১০ টাকার ছোলা ১৫০ টাকা, চিনির দাম কেজি প্রতি ১০-২৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
কাঁচামালের বিষয়ে বিক্রেতারা বলছেন, গত দু’দিনের ব্যবধানে প্রতি হালি লেবু ২৫-৩০ টাকা, বেগুন ও শসা কেজিপ্রতি ৩০-৫০ টাকা বেড়েছে। কাঁচা মরিচ ও ধনেপাতা কেজিপ্রতি ৫০-৮০ টাকা বেড়েছে। অর্থাৎ রমজান ও ইফতারে ব্যবহার হয় এমন অনেক পণ্যের দাম বেড়েছে গত দু’দিনে। এতে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। তবে সেগুলোর আমদানি সংকট ও ডলারের দাম বাড়ার মতো কারণ আছে।
নিত্যপ্রয়োজনী পণ্য বিক্রেতারা বলেন, যে দামে কিনা (ক্রয়), সেই দামের সাথে খরচ ও লভ্যাংশ যোগ করে বিক্রি করা হচ্ছে। আমরা স্থানীয়ভাবে ব্যবসায়ী করছি। এখানে আমাদের কিছু করার নেই। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী রয়েছেন বলেও তারা স্বীকার করেন। এদিকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, যারা মালামাল আমদানি ও স্টকের ব্যবসা করেন। সেখানে নিয়মিত মনিটরিং করলে ক্রেতা সাধারণ উপকৃত হবে।
অন্যদিকে ক্রেতারা বলছেন, প্রতিবছরই রোজা এলেই জিনিসের দাম বাড়ে। পরে বাজার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষগুলো কিছুদিন লোক দেখানো অভিযান চালাবে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসবে এবং পণ্যের দাম ১০০ টাকা বাড়ার পর ৫ টাকা কমবে। এটাই নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে। এতে সাধারণ জনগণের কষ্ট ভোগ করতে হবে।
এদিকে পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে হাজীগঞ্জে বাজার মনিটরিং সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসময় উপস্থিত ক্রেতা, বিক্রেতা, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা মতামত উপস্থাপন করে তারা বক্তব্য দেন।
সভায় ব্যবসায়ীদের প্রতি পণ্য মজুদ না করা, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী এবং ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনী পণ্য বিক্রি, দোকানে মূল্য তালিকা প্রদর্শন, ভেজাল বা মানহীন পণ্য বিক্রি না করা এবং ক্রেতাদের প্রতি গুজবে কান না দেওয়া, একবারে বা একসাথে বেশি এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য ক্রয় না করাসহ ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সচেতন এবং যার যার ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নীতি নৈতিকতার মধ্যে থাকার আহ্বান জানানো হয়।
সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা দোকানের দৃশ্যমান স্থানে মূল্য তালিকা টানাবেন। যখন যে মূল্যে পণ্য ক্রয় করবেন, সে মূল্যের সাথে লভ্যাংশ যোগ করে বিক্রি করবেন। দোকানে পাকা রশিদ সংরক্ষিত রাখবেন। স্টকে থাকা মালামালের সাথে বাজারে বর্ধিতমূল্যে পণ্য বিক্রি করবেন না। এর ব্যতিক্রম হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।

১৩ মার্চ, ২০২৪।