চাঁদপুরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে উদ্বেগ বাড়ছে!

প্রধান শিক্ষকসহ ২১ প্রাথমিক শিক্ষক করোনায় আক্রান্ত

এস এম সোহেল
চাঁদপুরে করোনা সংক্রমণ নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকদের মাঝে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে শহরের হাসান আলী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯ শিক্ষকসহ জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা করোনায় আক্রান্ত হয়ে হোম আইসোলেশনে আছেন। শিক্ষকদের করোনা সংক্রমণের খবরে জেলার অধিকাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত হয়ে পরছেন। যার কারণে বিদ্যালয় খুললে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কেমন হবে, তা’ই চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, করোনা সংক্রমণ শুরু থেকে গত ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ১৫০ জন শিক্ষক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্ত শিক্ষকদের পাশাপাশি কোন কোন বিদ্যালয়ের কর্মচারীদেরও আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। করোনায় আক্রান্ত এসব শিক্ষকদের মাঝে ইতোমধ্যে ১২৪ জন সুস্থ হয়েছেন। অপরদিকে সম্প্রতি (১৬ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত) ২১ জন শিক্ষক-কর্মচারী করোনায় আক্রান্ত হয়ে স্ব-স্ব বাসায় চিকিৎসাধীন বলে ঐ অফিস সূত্রে জানা গেছে।
চাঁদপুর জেলা ও সদর উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসাধীন শিক্ষক-কর্মচারী হলেন- চাঁদপুর সদর উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার মো. মানছুর আহমেদ, ষোলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তফা কামাল, চাঁদপুর হাসান আলী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইসমত আরা সাফি বন্যা, বলাখাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাবেয়া আক্তার, চাঁদপুর হাসান আলী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দিপা পাল, দিলরুবা ইয়াসমিন, মাকসুদা আক্তার, সিফাত বেগম, মো. মনির হোসেন, সৈয়দ মো. নুরুজ্জামান, দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী জসীম উদ্দিন ও আয়া সুমি দাস, লেডী দেহলভী সপ্রাবি’র মোসাম্মদ আছমা আইরিন, উত্তর রালদিয়া সপ্রবি’র নাছরিন সুলতানা, গুয়াখোলা সপ্রবি’র নাজমা আক্তার, আক্কাস আলী সপ্রবি’র শিরিন সুলতানা, ষোলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাজনীন আক্তার, হাইমচর কমলাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল হাসান, মধ্য ভিঙ্গুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সূবর্না রানী দাস ও ফাহিমা আক্তার, শাহরাস্তি সুয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আশা লতা দত্ত, পূর্ব বাকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তানিয়া আক্তার ও মো. নুর এ আমল।
চাঁদপুর ২নং বালক সপ্রবি’র প্রধান শিক্ষক দুলাল চন্দ্র গোস্মামী জানান, প্রায় সব বিদ্যালয়ের সব শিক্ষক-কর্মচারী দুই ডোজ ভ্যাকসিন ইতোমধ্যে গ্রহণ করেছেন। কেবলমাত্র প্রাথমিকের কোন শিক্ষার্থীদের ভ্যাকসিনের আওতাধীন করা হয়নি। শিক্ষকরা আক্রান্ত হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবকরা আতঙ্কিত হয়ে পরছে।
চাঁদপুর সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার নাজমা বেগম জানান, ইতোমধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন তারা সবাই নিজ নিজ বাসায় আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে। পাশাপাশি এসব বিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক-কর্মচারী আক্রান্ত হয়নি তাদের প্রত্যেককে স্যাম্পল দিয়ে করোনা পরীক্ষা করানোর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আক্রান্ত ঐ প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দিয়ে চালিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. সাহাব উদ্দিন জানান, করোনা সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। গত ২১ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সব স্কুল, কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে অনলাইনে শিক্ষার্থীদের ক্লাস চলছে। ইতোমধ্যে চাঁদপুরে করোনা সংক্রমণে বেশ কিছু শিক্ষক আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্তদের সবাই হোম আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এদিকে সারা দেশের মতো চাঁদপুরেও করোনা সংক্রমণ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধির খবর পাওয়া গেছে। গত ২৪ জানুয়ারি একদিনে ৮১ জন করোনা শনাক্ত হয়েছে বলে সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে। চাঁদপুরে হঠাৎ করে হু-হু করে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির খবরে ফের জনমনে ভীতি ছড়িয়ে পরছে। ঐদিন আরটি-পিসিআর ও আরএটি ল্যাবে ২শ’ ৭৯ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৮১ জনের রিপোর্ট পজেটিভ পাওয়া যায়। যা আক্রান্তের ২৯.০৩ শতাংশ শনাক্ত।
চাঁদপুর সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ জেলায় এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২শ’ ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে চাঁদপুর সদর উপজেলার ৯৮ জন, ফরিদগঞ্জের ৩৫ জন, হাজীগঞ্জের ২৬ জন, শাহরাস্তির ৩১ জন, মতলব দক্ষিণের ১৮ জন, মতলব উত্তরের ১৪ জন, কচুয়ার ১৩ জন ও হাইমচর উপজেলার ৭ জন।
আর এ পর্যন্ত জেলায় মোট আক্রান্তে সংখ্যা ১৫ হাজার ৮শ’ ৫৬ জন। সুস্থ হয়েছে ১৫ হাজার ৯৫ জন। চিকিৎসাধীন আছেন ৫শ’ ৩৮ জন। এখন পর্যন্ত আইসোলেশনে ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা ৯ হাজার ২শ’ ৪২ জন। এর মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৯ হাজার ২শ’ ১৬ জন। বর্তমানে আইসোলেশনে রোগীর সংখ্যা ২৬ জন।
এছাড়া জেলায় হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন ৬৬ হাজার ৭শ’ ৬১ জন। এর মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৬৩ হাজার ৬শ’ ৫৮ জন। বর্তমানে হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন ৩ হাজার ১শ’ ৩ জন। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে সতর্কতার সাথে চলাচলের অনুরোধ জানিয়েছেন সিভিল সার্জন।

৩০ জানুয়ারি, ২০২২।