বাড়ির মালিকদের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতায় অনীহা
ইল্শেপাড় রিপোর্ট
চাঁদপুরে বাসা বাড়ির মালিকদের অসচেতনতার কারণে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ। দ্রুত সংশ্লিষ্টদের সচেতনমূলক কার্যক্রমের উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। ইতোমধ্যে চাঁদপুর ও ফরিদগঞ্জে ডেঙ্গু রোগী সনাক্ত করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার কচুয়ায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ফজলে রাব্বি (২৫) নামে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে বিভিন্ন বয়সের ৭ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে। প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।
জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবার কার্যক্রম চললেও সর্বসাধারণের মাঝে কম-বেশি আতঙ্ক বিরাজ করছে। এদিকে চাঁদপুর পৌরসভাসহ অন্যান্য পৌরসভা ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা নিধন কার্যক্রম শুরু করেছে। যদিও তা অনেক কম পরিমাণ এলাকায় তা বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। বিশেষ করে চাঁদপুর শহরের বিভিন্ন বাসা-বাড়ির অভ্যন্তরে ড্রেনগুলোতে মশা নিধনের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে জানা গেছে। ফলে বাসা-বাড়ির ভেতরে থাকা অধিকাংশ ড্রেনে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা জন্মানোর সম্ভবনা রয়েছে।
অপরদিকে শহরের অধিকাংশ বাসা-বাড়ির আঙ্গিনা ও পেছনের অংশগুলো মশা নিধনের আওতার বাইরে থাকায় বাড়ছে প্রকোপ। যদিও পৌর কর্মচারীরা বলছে, বাসা-বাড়ির অভ্যন্তরে কিংবা পেছনের অংশে মশা নিধনের স্প্রে করা সম্ভব হচ্ছে না সংশ্লিষ্টদের বাড়ির বাউন্ডারির কারণে। বাড়ির মালিকদের উচিত নিজের ও শহরবাসীর সুরক্ষার জন্য নিজ দায়িত্বে বসা-বাড়ির আঙ্গিনাসহ স্যানিটারি টাংকি দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা।
তবে শহরে বসবাসকারী নাগরিকরা দাবি করছেন, বাসা-বাড়ির মালিকদের এমন পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি কোন আগ্রহ নেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পৌর কর্তৃপক্ষ সচেতনতামূলক উদ্যোগ কিংবা ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করলে বাড়ির মালিকদের টনক নড়বে।
এদিকে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আড়াইশ’ শয্যাবিশিষ্ট চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালে শতাধিক রোগী ইতোমধ্যে ভর্তি হয়েছে বলে জানা গেছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার পুরুষ ওয়ার্ড ও ৪র্থ তলার মহিলা ওয়ার্ডে চিকিৎসা চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
গত এপ্রিল মাস থেকে জুন পর্যন্ত ৩ মাসে জেলা সদরের এই হাসপাতালটিতে ৮০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে বলে জানান পরিসংখ্যান কর্মকর্তা নুরুদ্দিন মো. জাহাঙ্গীর। তিনি জানান, গত ৩ মাসে এপ্রিল মাসে ৪ জন, মে মাসে ৮ জন এবং জুন ৬৮ জন এবং চলতি জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ৩০ জন। সর্বমোট ১শ’ ১০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়।
এ বিষয়ে চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. এ কে এম মাহাবুবুর রহমান জানান, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বাড়ছে। আমরা হাসপাতালে রোগীদের দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে পুরুষ ওয়ার্ড এবং মহিলা ওয়ার্ডে আলাদা ইউনিট স্থাপন করেছি এবং ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মশারি টাঙিয়ে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু জ্বরের উৎপত্তি ডেঙ্গু ভাইরাসের মাধ্যমে এবং এই ভাইরাসবাহিত এডিস মশার কামড়ে হয়ে থাকে। ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশা কোনো ব্যক্তিকে কামড়ালে সেই ব্যক্তি চার থেকে ছয়দিনের মধ্যে সাধারণত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। এবার এই আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে সেই মশাটি ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবে একজন থেকে অন্যজনে মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে থাকে।
তাই এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। বাসা-বাড়ির ফুলের টবে পানি জমিয়ে না রাখা, ড্রেন পরিস্কারসহ বাসা বাড়ি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে এই চিকিৎসক অনুরোধ জানান।
ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার: ডেঙ্গু জ্বর একটি মশাবাহিত ভাইরাল সংক্রমণ। এডিস মশার কামড়ে মানুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এই রোগে কেউ তখনই আক্রান্ত হন, যখন মশা সংক্রমিত কোনো ব্যক্তিকে কামড়ে তারপর ভাইরাস বহন করার সময় একজন অ-সংক্রমিত ব্যক্তিকে কামড় দেয়।
এদিকে দেশে দিন দিন বেড়েই চলেছে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রেল রুমের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তির সূত্র বলেছ, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। ৪ জুলাই সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড ছিলো ৫ জনের।
সাধারণভাবে ডেঙ্গুর লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। ১০১ ডিগ্রি থেকে ১০৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকতে পারে। জ্বর একটানা থাকতে পারে, আবার ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে দেয়ার পর আবারও জ্বর আসতে পারে। ডেঙ্গুর অন্যতম লক্ষণ শরীরে ব্যথা। সঙ্গে মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা হতে পারে। সঙ্গে চামড়ায় লালচে দাগ বা র্যাশ থাকতে পারে। শরীর ঠান্ডা হচ্ছে মনে হতে পারে। ক্ষুধা কমে যাওয়া, শরীর ম্যাজম্যাজ করার লক্ষণও দেখা দিতে পারে।
তবে সিভিয়ার ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে তীব্র পেট ব্যথা, পেট ফুলে যাওয়া, রক্তবমি, মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ, ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ, শ্বাসকার্য কঠিন বা দ্রুত হওয়া, শরীর ঠান্ডা অনুভব বা ঘাম হওয়া, দ্রুত নাড়ি স্পন্দন এবং ঘুম ঘুম ভাব, চেতনা হারানো।
ডেঙ্গুর শক সিনড্রোম থেকে মানবদেহে পানিশূন্যতা তৈরি হয়। সঙ্গে সঙ্গে পাল্স রেট অনেকটা বেড়ে যায় এবং রক্তচাপ খুব কমে যায়। শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়। শ্বাসপ্রশ্বাস খুব দ্রুত চলে। রোগী অস্থির হয়ে ওঠেন। তখন সময় নষ্ট না করে হাসপাতালে ভর্তি করানো উচিত।
ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা: ডেঙ্গু হলে ওষুধ হিসেবে শুধু প্যারাসিটামল খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা। অনেকে না জেনে শরীরের বিভিন্ন অংশের তীব্র ব্যথা কমানোর জন্য ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে বিপদ ঘটতে পারে বলে সতর্ক করছেন চিকিৎসকরা। কারণ, ব্যথানাশক ওষুধ শরীরে রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে, যা ডেকে আনতে পারে মৃত্যু।
ডেঙ্গু হলে চিকিৎসকরা বেশি বেশি তরল খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। যেমন- ভাতের মাড়, স্যালাইন, ডাবের পানি, স্যুপ, ফলের রস, লেবুর পানি ইত্যাদি। তরল খাবার ৯০ শতাংশ কমায় ডেঙ্গুর তীব্রতা। শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে প্রোটিন-সমৃদ্ধ খাবার ডাল, ডিম, মুরগির মাংস, ছোট মাছের ঝোল বেশি করে রাখতে হবে খাদ্যতালিকায়।
ডেঙ্গুজ্বরে রক্তে প্লাটিলেট কমে গেলে কী খাবেন : ডেঙ্গু রোগীর প্লাটিলেট কমে যায়। তাই প্লাটিলেট বাড়ে এমন খাবার খেতে হবে। যেমন- সাইট্রাস ফল, কাঠবাদাম, দই, সূর্যমুখী বীজ, গ্রিন টি, ক্যাপসিকাম, ব্রোকলি, পালংশাক, আদা, রসুন ও হলুদ।
পেয়ারার শরবত পান করা যেতে পারে। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ এই পানীয়টি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে ডেঙ্গু সংক্রমণ উপশম করবে।
রক্তের প্লাটিলেট বাড়াতে নিম পাতার রস ভালো কাজ করে। এটি শ্বেত রক্তকনিকার সংখ্যাও বৃদ্ধি করে। নিম পাতার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর গুণও আছে।
১৩ জুলাই, ২০২৩।
