অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
এস এম সোহেল
দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর পর চাঁদপুর পৌর এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার (ইজিবাইক) ভাড়া পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। এতে পৌর এলাকার কয়েকটি পয়েন্টে ভাড়া কিছুটা বাড়লেও অধিকাংশ স্থানে আগের ভাড়া বহাল রয়েছে। বর্তমান বিদ্যুতের দাম ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে সবদিক বিবেচনা করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ভাড়া পুনঃনির্ধারণ করা হয়। গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকেই এ ভাড়া কার্যকর করা হয়েছে।
অটোরিকশা (ইজিবাইক) চালকরা বিভিন্ন সময় ঈদ, দ্রব্যমূল্যের ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে বিভিন্ন সময় ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সাথে চালকদের বাকবিতন্ডা ও ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। তার থেকে যাত্রী ও চালকদের রেহাই দিতে আগের ভাড়ার সাথে মিল রেখে নতুন ভাড়া পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে অটোরিকশা (ইজিবাইক) চালকদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ যাত্রীরা চরম ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতো। অটোরিকশার চার্জের কারণে একদিকে বিদ্যুতের লোডশেডিং অপরদিকে বাড়তি ভাড়ার ধকল, দুই’ই সামাল দিতে হচ্ছে চাঁদপুরবাসীকে। এর আওতায় সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ টাকা আগের মতোই বহাল থাকবে। তবে শহরের বিভিন্ন রুট অনুযায়ী আগের ৫ টাকা, ১০ টাকা, ১৫ টাকা, ২০ টাকা, ২৫ টাকা, ৩০ টাকা, ৩৫ টাকা ও ৪০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বরের পর ব্যাটারীচালিত ইজিবাইকের ভাড়া পুনঃনির্ধারণ করেছে চাঁদপুর পৌরসভা। গত ৭ সেপ্টেম্বর ইজিবাইক ভাড়া নির্ধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সবার মতামতের প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত অনুয়ায়ী ভাড়াটি নির্ধারণ করা হয়। দেশের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে সব পয়েন্টে নয়, কিছু কিছু পয়েন্টে নামে মাত্র ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এদিকে, অটোরিকশার শহর হিসেবে পরিচিত চাঁদপুর শহরে এখন পায়ে চালিত রিকশার সংখ্যা খুবই কম। বিদ্যুতে চার্জ দেওয়া ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার দাপটে রিকশা দিন দিন কমছে। চাঁদপুর পৌরসভার আসে পাশের এলাকায় পৌরসভার কর্তৃক নিবন্ধিত ২৬২৮ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রয়েছে। কিন্তু নিবন্ধনের বাইরে কয়েকগুণ বেশি চলাচল করছে।
পুনঃনির্ধারিত (জনপ্রতি ভাড়া)- শহরের বড়স্টেশন থেকে ক্লাব রোড ও নিশি বিল্ডিং এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ টাকা। একইস্থন থেকে শপথচত্তর ও মাতৃপীঠ স্কুল এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা, চিত্রলেখার মোড়, সকারি কলেজ গেইট ও বিপনীবাগ, মিশন রোড়, নতুন বাজার, ট্রাক রোড় এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ টাকা, বাসস্ট্যান্ড, ডিসি অফিস ও ষোলঘর এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২০টাকা, ইচলীঘাট, ঢালী ঘাট ও ওয়ারলেছ এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫টাকা।
এছাড়া শহরের শপথ চত্বর/কালী বাড়ি মোড় থেকে নিশি বিল্ডিং, মাতৃপীঠ স্কুল, পাল বাজার মোড়, মডেল থানা, সদর হাসপাতাল, মূখার্জীঘাট, চিত্রলেখা মোড, কলেজ গেইট, বিপনীবাগ, ছায়াবানী, নতুন বাজার, মিশন রোড, আবুলের দোকান, ট্রাক রোড এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ টাকা। একইস্থান থেকে বড়স্টেশন, লঞ্চঘাট, ৫নং ঘাট, বাসস্ট্যান্ড, চেয়ারম্যান ঘাট, ডিসি অফিস, ষোলঘার, আইডব্লিটির মোড় ও লোহারপুল এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা, পুরাণ বাজার, ওয়ারলেছ, ফিসারী গেইট, টেকনিক্যাল স্কুল, কোল্ডস্টোরেজ, ওয়ারলেছ মুন্সি বাড়ি, পাসপোর্ট অফিস ও নির্বাচন অফিস এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ টাকা, ইচলী, ঢালীঘাট ও সেনেরদিঘীর পাড় এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা, দাসাদী ও সফরমালী এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ টাকা এবং বাংলা বাজার এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ টাকা।
নতুন বাজার থেকে আইডব্লিউটিএ’র মোড় এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ টাকা। একইস্থান থেকে ৫নং ঘাট, বাসস্ট্যান্ড, কোল্ডস্টোরেজ মোড় এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা, ইচলী ঘাট, ঢালী ঘাট, বড়স্টেশন ও পালবাজার ব্রিজের গোড়া এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ টাকা।
পৌরসভা/পালবাজার গেট/ব্রিজের গোড়া থেকে পুরাণবাজার ব্রিজের গোড়া এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ টাকা। একই স্থান থেকে চিত্রলেখা, ছায়াবাণীর মোড়, কলেজ গেট, বিপণীবাগ, নতুন বাজার, আবুলের দোকান, ট্রাক রোড ও লোহারপুল এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা, পুরাণবাজার, পাটওয়ারী পুল, বাসস্ট্যান্ড, ডিসি অফিস, ষোলঘর ও লঞ্চঘাট এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ টাকা এবং জাফর খান বাড়ি (ওয়াপদা রাস্তা সংলগ্ন), ওয়ারলেছ বাজার, ঢালীঘাট ও ইচলীঘাট এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা।
লোহারপুল থেকে পুরাণবাজার ব্রিজের গোড়া, মেয়র রোড, পুরাণবাজার, হরিসভা রোড ও জুট মিল এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ টাকা।
পুরাণবাজার থেকে আল আমিন মিল, পুরাণ বাজার ব্রিজের গোড়া, ১০নং ঘাট ও জুট মিল এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা।
ডিসি অফিস/জজ কোর্ট থেকে কাশেম বাজার ২০ টাকা, দাসাদী ২৫ টাকা, সফরমালী ৩০টাকা, বাংলা বাজার ৩৫ টাকা ও কাজীর বাজার এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ টাকা।
পাটওয়ারী পুল থেকে লোহারপুল, পুরাণবাজার ব্রিজের গোড়া ও পুরাণবাজার কলেজ ১০টাকা এবং পালবাজার ব্রিজের গোড়া এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ টাকা।
রঘুনাথপুর ওয়াপদা থেকে পুরাণবাজার কলেজ ১০টাকা, পুরাণবাজার ব্রিজের গোড়া ও পালবাজার ব্রিজের গোড়া ১৫ টাকা এবং মেয়র রোড পুরাণবাজার এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা।
দোকানঘর থেকে পুরাণবাজার কলেজ ১০টাকা, বটগাছ মোড়, ব্রিজের গোড়া, মেয়র রোড পুরাণবাজার ২০টাকা এবং পালবাজার ব্রিজের গোড়া এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা।
লক্ষ্মীপুর থেকে পুরাণবাজার কলেজ ও ব্রিজের গোড়া এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা।
বাবুরহাট থেকে ওয়ারলেছ ও জজকোর্ট ১৫ টাকা, বাসস্ট্যান্ড ও বিপণীবাগ ২০ টাকা, কোর্ট স্টেশন, হকার্স মার্কেট ও পালবাজার এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ টাকা।
বাগাদী চৌরাস্ত থেকে ওয়ারলেছ ১০ টাকা, জজকোর্ট, বাসস্ট্যান্ড ও কলেজ গেইট ১৫ টাকা, শপথচত্তর ও পালবাজার ২০ টাকা, বড়স্টেশন ও লঞ্চঘাট এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ টাকা।
বিষ্ণুদী রোডের মোড় (আমিন হোসেন খান ফিলিং স্টেশনের পাশ) থেকে জহিরের দোকান ও আনন্দ বাজার এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা।
মৈশাদী তালতলা থেকে বাবুরহাট বাজার ১০ টাকা, ওয়ারলেছ, জজ কোর্ট ও বাসস্ট্যান্ড ২০টাকা, বিপনীবাগ ২৫ টাকা, হকার্স মার্কেট, কালীবাড়ি ও পালবাজার এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ টাকা।
ওয়ারলেছ বাজার থেকে রেলগেট, মুন্সিবাড়ি, কাজী বাড়ি মসজিদ, পাসপোর্ট অফিস, নির্বাচন অফিস, বঙ্গবন্ধু সড়কের পূর্ব মাথা ও গুচ্ছগ্রাম ৫ টাকা, টোলঘর, শেখের হাট, গাছতলা পীর সাহেবের বাড়ি ও কাদির গাজীর মার্কেট ১০ টাকা এবং ইটখোলা ও চৌরাস্তা মোড় এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ টাকা।
মিশন রোড মোড় থেকে দর্জি ঘাট ৫টাকা, ট্রাক রোড, বিআইডব্লিউটিএ’র মোড়, গুচ্ছগ্রাম, বঙ্গবন্ধু সড়কের পূর্ব মাথা, পাসপোর্ট অফিস ও নির্বাচন অফিস ১০ টাকা এবং চৌরাস্তা মোড় এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা।
পুরাণবাজার মেয়র রোড থেকে বহরিয়া, ওয়াপদা এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা।
লঞ্চঘাট থেকে মাতাব্বর বাড়ি রোড, মাঝি বাড়ি রোড ও কলেজ গেট ১৫ টাকা এবং বাসস্ট্যান্ড, চেয়ারম্যান ঘাট ও ষোলঘর এলাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা।
চাঁদপুর পৌরসভার লাইসেন্স পরিদর্শক মো. মোশারফ হোসেন বলেন, ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর চাঁদপুর পৌর এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার (ইজিবাইক) ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিলো। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর পর গত ৭ সেপ্টেম্বর ইজিবাইকের ভাড়া পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমান বিদ্যুৎ ও দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধির কারণে পৌর এলাকার কয়েকটি পয়েন্টে ভাড়া কিছুটা বাড়লেও অধিকাংশ স্থানে আগের ভাড়া বহাল রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, চাঁদপুর পৌরসভায় বর্তমানে ২৬২৮ ইজিবাইক লাইসেন্স রয়েছে। বর্তমান প্লেটের ভিতরে কিউআর কোড স্ক্যানার রয়েছে। আগের লাইসেন্সের প্লেট ভাড়া দেওয়া হতো, এমন অভিযোগও আমাদের কাছে রয়েছে। কিন্তু এবার সেকেন্ড কপি লাইসেন্স করার সুযোগ নেই। আমরা চাঁদপুর পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রতিটি ইজিবাইকে রেপিড দিয়ে নম্বর প্লেট লাগিয়ে দেওয়া হবে। প্লেট দেওয়ার পরপর নম্বরবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে অভিযান করা হবে। চলতি মাসের শেষের দিকে নম্বর প্লেট দেওয়া শুরু হবে।
চাঁদপুর পৌরসভার মেয়র অ্যাড. জিল্লুর রহমান জুয়েল জানান, পৌর এলাকায় বিভিন্ন পয়েন্টে যাত্রী হয়রানি করা হতো। ভাড়া বিন্যাসটা সঠিক ছিল না। সবার মতামতের ভিত্তিতে পৌরবাসী ও ইজিবাইক চালকদের কথা বিবেচনা করে পৌর এলাকায় চলাচলকারী ব্যটারিচালিত অটোরিকশার ভাড়া পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। যা গত ৭ সেপ্টেম্বর ঘোষণা অনুযায়ী থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে অস্বাভাবিকভাবে কোনো ভাড়া বাড়ানো হয়নি। কিছু কিছু পয়েন্টে নামে মাত্র ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। রুট ভেদে এক থেকে সর্বোচ্চ ৫ টাকা ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। যাত্রী হয়রানি রোধে শহরের বিভিন্ন স্থানে ভাড়া তালিকা প্রকাশ করা হবে।
উল্লেখ্য, এছাড়া ইজিবাইক চালকেদের প্রতি চাঁদপুর পৌরসভার ১২টি শর্ত আরোপ করা হয়। তা হলো:- ১. রাত্রীকালীন সময়ে ইজিবাইক চালানোর সময় গাড়িতে হেডলাইট জ্বালিয়ে রাখতে হবে। ২. গাড়িতে যাত্রী থাকাবস্থায় ধূমপান করা যাবে না। ৩. ধার্য্যকৃত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ৪. গাড়ি যত্রতত্র স্থানে রেখে যানজট সৃষ্টি করা যাবে না। ৫. স্ট্যান্ডে দাঁড়ানো অবস্থায় অথবা খালি ইজিবাইক থাকা অবস্থায় যাত্রীকে কোনো অবস্থায় ভাড়া যেতে নিষেধ অথবা অপারগতা প্রকাশ করা যাবে না। ৬. রিজার্ভ করা কোনো ইজিবাইক স্ট্যান্ডে অবস্থান করা যাবে না। ৭. প্রত্যেক ইজিবাইক চালক গাড়ির মালিকানা স্মার্ট কার্ড, সার্টিফিকেট পেপার, ব্যাংক চালানের কপি, ভাড়ার তালিকা ও ড্রাইভিং লাইসেন্স অবশ্যই সাথে রাখতে হবে। ৮. ইজিবাইক মালিকরা ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া চালকের কাছে ইজিবাইক ভাড়া দিতে পারবে না। ৯. পৌরসভায় ইজিবাইক গাড়ি চলাচল অবস্থায় প্রতিদিন নির্ধারিত হারে গাড়ির মালিককে ইজারার টোল প্রদান করিতে হইবে। ১০. এসএস পাইপ দ্বারা ইজি বাইক গাড়ির ডান পাশে বন্ধ করে দিতে হবে। ১১. স্কুল কলেজের ছাত্র/ছাত্রীদের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী ভাড়া বলবৎ থাকবে। ১২. উপরোক্ত শর্তাবলী ভঙ্গের কারণে পৌর কর্তৃপক্ষ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণসহ লাইসেন্স বাতিল করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন।
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২২।
