প্রেসক্লাব বলতে বুঝি চাঁদপুর প্রেসক্লাব, অনলাইন প্রেসক্লাব নয়
…………………মেয়র নাছির উদ্দিন আহমেদ
স্টাফ রিপোর্টার
চাঁদপুর প্রেসক্লাবের আয়োজনে সাংবাদিক সমাবেশের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন চাঁদপুর পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাছির উদ্দিন আহমেদ। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, চাঁদপুরের সাংবাদিকদের মধ্যে যে ঐক্য রয়েছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আর এটি সম্ভব হয়েছে ঐক্যবদ্ধ চাঁদপুর প্রেসক্লাব এবং তাঁদের যোগ্য নেতৃত্বের কারণে। আমরা চাঁদপুরে প্রেসক্লাব বলতে একটাই বুঝি, সেটি হচ্ছে চাঁদপুর প্রেসক্লাব। এর বাইরে অনলাইন প্রেসক্লাব বা অন্য নামে প্রেসক্লাব যারা করবে, বুঝতে হবে তাদের উদ্দেশ্য ভালো নয়।
তিনি চাঁদপুরের সাংবাদিকদের সাথে তাঁর সুসম্পর্কের বিষয় তুলে ধরে বলেন, চাঁদপুর প্রেসক্লাব এবং চাঁদপুরের সাংবাদিকদের যে কোনো আচার-অনুষ্ঠানে, সুখে-দুঃখে তাদের সাথে সবসময় আছি ও ভবিষ্যতেও থাকবো। এই প্রেসক্লাব ভবনটির জন্য জায়গা দিয়েছেন চাঁদপুরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় রাজনীতিবিদ, চাঁদপুর পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম আবদুল করিম পাটওয়ারী। সেজন্য এ প্রেসক্লাবের নেতৃত্বে যখনই যারা আসেন তাঁরাও পৌরসভার প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখান এবং আমরাও তাঁদের প্রতি সমসময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেই।
তিনি বলেন, আমরা যারা রাজনীতি করি তাদের উদ্দেশ্য যেমনি সমাজের সেবা করা, তেমনি সাংবাদিকতার উদ্দেশ্যও একই। তাই আমাদের সাথে তাদের সম্পর্কের একটি যোগসূত্র রয়েছে।
চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি কাজী শাহাদাতের পরিচালনায় সমাপনী পর্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু নঈম পাটওয়ারী দুলাল। সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে বক্তব্য রাখেন চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকরাম চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক লক্ষ্মণ চন্দ্র সূত্রধর, সাবেক সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন মিলন, রহিম বাদশা, জিএম শাহীন, সোহেল রুশদী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল আউয়াল রুবেল, সাংগঠনিক সম্পাদক এএইচএম আহসান উল্লাহ ও সদস্য মোশারফ হোসেন লিটন।
সবশেষে প্রেসক্লাব সভাপতি শহীদ পাটোয়ারী সমাপনী বক্তব্য রাখেন।
সাংবাদিক সমাবেশের উদ্বোধনী
জাতীয় প্রেসক্লাবের নির্বাচিত সভাপতি, দৈনিক যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, চাঁদপুরের কৃতী সন্তান সাইফুল আলম বলেছেন, সাংবাদিকতা পেশা একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। আমরা যারা এ পেশায় এসেছি তারা তা জেনে বুঝেই এসেছি। আজকে সারাবিশে^ গণমাধ্যম বিরাট একটি চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। অনেক বড় একটি কালো ছায়া গণমাধ্যমের আকাশে রয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে আমাদের সাংবাদিকতা করতে হচ্ছে। আজ পুঁজিপতিরা প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া চালু করার ক্ষেত্রে অর্থ ঢালছে, কিন্তু যারা এ মিডিয়াকে বাঁচিয়ে রাখছে, সে সাংবাদিকদের বেতন-ভাতাসহ নানা সুবিধা দেয়ার প্রশ্ন আসলেই তখন তাদের অনীহা এবং নানা প্রশ্ন, আপত্তি। অথচ গণমাধ্যমে যদি আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য না থাকে তাহলে সে গণমাধ্যম গণমুখী হয় না, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করা যায় না। এ সত্য বিষয়টি এখনো উপলব্ধিতে আসছে না আমাদের সরকার এবং পুুঁজিপতিদের। সাংবাদিকদের রুটি-রুজি এবং চাকরির নিশ্চয়তা বিধানে জাতীয় সংসদে গণমাধ্যম আইনটি একবছর যাবৎ ঝুলে আছে। এ আইনটি পাস হলে সাংবাদিকদের অধিকার সংরক্ষিত হবে। আমরা চেষ্টা করছি আইনটি যাতে দ্রুত পাস হয়।
দেশের বরেণ্য এই সাংবাদিক নেতা গতকাল শুক্রবার চাঁদপুর প্রেসক্লাবের আয়োজনে সাংবাদিক সমাবেশের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উদ্বোধকের বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
চাঁদপুর প্রেসক্লাব মিলনায়তনে শহরসহ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আগত দুই শতাধিক সাংবাদিকদের অংশগ্রহণে সাংবাদিকদের এমন অভূতপূর্ব মিলনমেলা দেখে এই সাংবাদিক নেতা অভিভূত হয়ে বলেন, আজ রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতিসহ চারদিকে শুধু বিভক্তি। এমন বিভক্তির মাঝে চাঁদপুর প্রেসক্লাবের আয়োজনে ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাবেশ সত্যিই দৃষ্টান্তস্বরূপ। জাতীয় প্রেসক্লাবের অনেক আয়োজনে আমি চাঁদপুর প্রেসক্লাবের আজকের এ আয়োজনটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে পারবো। চাঁদপুরের সন্তান হিসেবে এটি আমার জন্যে খুবই আনন্দের এবং গর্বের।
সাংবাদিক নেতা সাইফুল আলম বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভ্যানগার্ড হিসেবে গণমাধ্যম কাজ করবে। আর সে গণমাধ্যম দুর্বল হয়ে গেলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে যাবে। রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে এ বিষয়টি উপলব্ধি করা দরকার। তাই গণমাধ্যমকে গণমানুষের মুখপত্র হয়ে এগিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। তিনি চাঁদপুর প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে তাকে যে সম্মান দেয়া হয়েছে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ। আমি এখানে অতিথি হয়ে আসিনি। আমি ঘরের মানুষ। চাঁদপুরের সাথে আমার নাড়ির সম্পর্ক রয়েছে। চাঁদপুরে এখন আমি বসবাস না করলেও নাড়ির টান এ মাটির সাথে রয়েছে। তিনি চাঁদপুর প্রেসক্লাবের অভূতপূর্ব এ আয়োজন প্রসঙ্গে পুনরায় বলতে গিয়ে বলেন, ডিজিটাল যুগে সর্বত্র সম্পর্ক যখন শিথিল হচ্ছে, আমরা যখন পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি তখন চাঁদপুর প্রেসক্লাব নানা মত ও চিন্তাকে এক পাশে রেখে যে সমাবেশের আয়োজন করলো, তা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রম। এটি ঐতিহাসিক আয়োজন। মানুষের ভালোবাসাটাই মূল কথা। আপনারা আজ আমাকে যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন তার জন্যে আমি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ভালোবাসতে না পারলে মানুষ হিসেবে স্বার্থকতা কোথায়? ভালোবাসার কারণেই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার বিকল্প নেই। ঐক্যই শক্তি। আমাদের যাবতীয় আন্দোলন-সংগ্রাম ঐক্যের মাধ্যমেই হয়েছে। ঐক্যের বিকল্প নেই। বাঙালি যতবার ঐক্যবদ্ধ হয়েছে ততবার বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। আজ চাঁদপুর প্রেসক্লাবে এসে সাংবাদিকদের মাঝে এ ঐক্য দেখে সত্যিই আমি আনন্দিত এবং গর্বিত।
তিনি সাংবাদিকতা পেশা সম্পর্কে বলেন, আমি বিশ্বাস করি একজন সাংবাদিক ২৪ ঘণ্টাই সাংবাদিক হবেন। পার্টটাইম সাংবাদিকতা হয় না। আর সে বিবেচনায় আমরা কতটুকু সাংবাদিক হতে পেরেছি, তা বিবেচনার বিষয়। এ প্রসঙ্গে তিনি নিজের সাংবাদিকতা পেশার বিষয়ে বলেন, আমি গত ২০ বছরে কোনো ছুটি নেইনি, যদি দেশের বাইরে কোথাও যাই, সে সময়টি ছাড়া। এখন প্রেসক্লাবের সভাপতি হিসেবে প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০ টার মধ্যে প্রেসক্লাবে যাই, সেখানে এক ঘণ্টা থাকি। এরপর যুগান্তর অফিসে গিয়ে একটানা রাত ১০টা পর্যন্ত থেকে প্রথম পৃষ্ঠা মেকআপ দিয়ে বাসায় ফিরি।
এই সাংবাদিক নেতার এসব উপদেশ এবং পেশাগত নানা বিষয় নিয়ে জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য উপস্থিত সব সাংবাদিক মন্ত্রমুগ্ধের মতো শ্রবণ করেন।
উদ্বোধনী পর্বসহ দিনব্যাপী এই সাংবাদিক সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি শহীদ পাটোয়ারী। চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সহ-সভাপতি রহিম বাদশার উপস্থাপনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক লক্ষ্মণ চন্দ্র সূত্রধর। সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে বক্তব্য রাখেন চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকরাম চৌধুরী, কাজী শাহাদাত, শরীফ চৌধুরী ও ইকবাল হোসেন পাটওয়ারী। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ফরিদগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাড. জাহিদুল ইসলাম রোমান।
পরে উন্মুক্ত পর্ব শুরু হয়। উন্মুক্ত পর্বে জেলার প্রত্যেক উপজেলা থেকে আগত সাংবাদিক এবং চাঁদপুর শহরের সাংবাদিকরা বক্তব্য রাখেন। এরা হচ্ছেন- কচুয়ার রাকিবুল হাসান ও আবুল হোসেন, মতলব উত্তরের গোলাম নবী খোকন ও বোরহান উদ্দিন ডালিম, মতলব দক্ষিণের গোলাম সরোয়ার সেলিম, রোকনুজ্জামান রোকন ও আরিফ বিল্লাহ, শাহরাস্তির কাজী হুমায়ুন, মাঈনুল ইসলাম কাজল ও ফয়েজ আহমেদ, হাজীগঞ্জের কবির হোসেন ও এসএম মিরাজ মুন্সী, ফরিদগঞ্জের নবী নোমান, প্রবীর চক্রবর্তী, আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও মহিউদ্দিন এবং হাইমচরের ইসমাঈল হোসেন।
আর চাঁদপুর শহরে কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- একে আজাদ, তালহা জুবায়ের, কেএম মাসুদ, মানিক দাস, মিজান লিটন, শাওন পাটওয়ারী ও আশিক বিন রহিম। আর অতিথিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন চাঁদপুর প্রেসক্লাবের আজীবন সদস্য আনোয়ার হাবিব কাজল এবং আক্তার হোসেন সোহেল ভূঁইয়া। উদ্বোধনী পর্বের শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন মাও. আবদুর রহমান গাজী এবং গীতা পাঠ করেন শ্যামল চন্দ্র দাস।
সমাবেশের উদ্বোধক জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি সাইফুল আলমকে প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা, উত্তরীয়, ক্রেস্ট, প্রেসক্লাবের কোটপীন এবং উপহার প্রদান করা হয়।
পরে নামাজের বিরতি এবং মধ্যাহ্নভোজের পর বৈকালিক পর্ব এবং সমাপনী পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
২১ জুলাই, ২০১৯।