
অর্ধশতাধিক বসতঘর ঝুঁকিতে
এস এম সোহেল
চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধের ৩শ’ মিটার এলাকায় সিসি ব্লক ধসে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গতকাল রোববার সকাল পর্যন্ত ওই এলাকার ৩টি দোকানসহ সেমিপাকা টিনের ১৫টি বসতঘর প্রমত্তা মেঘনায় বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে রয়েছে ঐ এলাকার হরিসভা, কালী, স্কন ও লোকনাথ মন্দির এবং চলাচলের সড়ক। এছাড়া বহু বসতঘর ভেঙে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ওই এলাকায় গত শনিবার রাত থেকেই বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
এর আগে শনিবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে ভাঙন শুরু হয়। রাতেই পানি উন্নয়ন বোর্ড ঘটনাস্থলে বালি ভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করে। শনিবার রাত থেকে রোববার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে ২১শ’ ৪ বস্তা বালি ভর্তি জিইও টেক্সটাইল ব্যাগ ভাঙনস্থানে ফেলা হয়েছে। তবে সন্ধ্যার পর থেকে কাজ বন্ধ করায় এলাকার নারী-পুরুষরা রাত সাড়ে ১০টায় পুরাণবাজারে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলটি পুরাণবাজারের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে নতুন রাস্তায় আসলে পুলিশের বাঁধায় তা’ পণ্ড হয়ে যায়।
ভাঙনের শিকার পরিবারগুলো হচ্ছে- হরিসভা এলাকার শম্ভুনাথ মজুমদার, চয়ন সাহা, গোপিনাথ সাহা, দিপক দে, বিমল দে, ধ্রুব সাহা, ওয়াহেদ আলী, আমজাদ হোসেন, তাপস দে’র বসতভিটে এবং সঞ্জয় চক্রবর্তী, মানিক সাহা ও সুশান্ত মজুমদাদের দোকান।
এছাড়া ভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে- লিটন নন্দী, সুখরঞ্জন নন্দী, অনিল দে, লিটন দে, সুভাস দাস, বিশ্বনাথ বণিক, দুলাল বণিক, দেবু বণিক, বাপ্পী বণিক, শিশির বণিক, লিটন ঘোষ, নিতাই পোদ্দার, নারায়ন ঘোষ, শ্যামল রায়, গোপাল রায়, ভুলু দাস, সুবাস ঋষি, খোকন দাস, বুলু দাস, দ্বিগুন চন্দ্র দাস, রাম চন্দ্র দাস, গনেশ সরকার, সুরেশ সরকার, কর্ত্তিক চন্দ্র সাহা, পুষ্প চক্রবর্তী, শহীদুল ইসলামসহ আরো অনেকের বসতভিটে ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
গতকাল রোববার ভাঙন স্থান পরিদর্শন করেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ারসহ জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। ভাঙনস্থানের পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া মানুষের জানমাল রক্ষায় চাঁদপুর উত্তর ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের ঘটনাস্থলে প্রস্তুত থাকতে দেখা গেছে।
এলাকাবাসী জানান, মেঘনা তীর প্রবল পানি প্রবাহের সাথে ঘূর্ণিস্রোতে নদীর উত্তাল রুদ্ররূপ এখন ভয়ঙ্কর অবস্থা ধারণ করেছে। চট্টগ্রাম-দক্ষিণাঞ্চল, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ অন্যান্য রুটের সব নৌযান চাঁদপুর নদী এলাকা অতিক্রমকালে পুরাণবাজার শহর রক্ষাবাঁধের খুব কাছ দিয়ে চলাচল করছে। এতে এলাকাবাসী মনে করেন চাঁদপুর শহর রক্ষাবাঁধের বড় স্টেশন মোলহেড, পুরাণবাজার ঠোঁটা, হরিসভা ও রনাগোয়াল পর্যন্ত পয়েন্টে নদীর ব্যাপক গভীরতা রয়েছে। এলাকাবাসীর ধারণা, পানির প্রবল চাপ ও ঘূর্ণিস্রোতে শহর রক্ষাবাঁধের বিভিন্ন স্থান দিয়ে তলদেশে বড় আকারে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। পুরাণবাজার হরিসভা পয়েন্টসহ চাঁদপুর শহর রক্ষাবাঁধের বিভিন্ন স্থান দিয়ে আরো ব্যাপক নদী ভাঙনের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্ষার পানি নামার সময় ভয়াবহ ভাঙনের আশঙ্কা আরো রয়েছে।
চাঁদপুর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুভাষ চন্দ্র রায় জানান, ভাঙন শুরু হওয়ার পরই প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়েছি। গত বছরও একই স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। স্থানীয় সাংসদ ও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি রক্ষায় বিশেষ বরাদ্দ দেন। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়োজিত ঠিকাদার সঠিকভাবে কাজটি সম্পন্ন না করায় আবারো ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় ভাঙন অব্যাহত থাকলে আরো বসতিসহ হরিসভা, কালী, স্কন ও লোকনাথ মন্দির মেঘনা গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জামান জানান, খবর পেয়ে রাতেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় জিইও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। বর্তমানে সেখানে পুলিশ ও দমকল বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছেন।
চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু রায়হান জানান, গত কয়েক বছরই একই স্থানে ভাঙন দেখা দিচ্ছে। পুরাণবাজার এলাকার বাকি অংশ ভাল থাকলেও প্রায় ৩শ’ মিটার এলাকায় প্রতিবছর সমস্যা হচ্ছে। তাৎক্ষণিক জিইও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করছি। পরবর্তীতে ব্লক ফেলে স্থায়ী বাঁধ দেয়া হবে।
০৫ আগস্ট, ২০১৯।