সদর উপজেলার প্রায় অর্ধেক (৮৩টি) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ওয়াশব্লক বা টয়লেট নেই।
প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষক-শিক্ষার্থী নিরাপদ সৌচাগার সেবা থেকে বঞ্চিত।
সদ্য বদলিকৃত চাঁদপুর সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার নাজমা বেগমের অসহযোগিতা ও দায়িত্বহীনতায় এই ওয়াশব্লক না থাকা।
ইলশেপাড় রিপোর্ট
বর্তমান সরকার দেশে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগতমান পরিবর্তনে যুগপোযোগী একের পর এক সিদ্ধান্ত নিলেও সরকারের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অভিযোগ উঠছে সদ্য বদলিকৃত চাঁদপুর সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার নাজমা বেগমের বিরুদ্ধে। প্রাথমিকের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অভিযোগ আনছেন- তিনি দীর্ঘ ৮ বছর সময় ধরে এই চেয়ারে বসে এমন দায়িত্বহীনতার কাজ করে আসছেন।
চাঁদপুর সদর উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অভিযোগ করছেন, নাজমা বেগমের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের জন্য উপজেলার ৮৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীরা ওয়াশব্লক বা টয়লেট সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। এতে করে কোমলমতী শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়তই স্কুলমুখী হতে আগ্রহ হারাচ্ছে। যার কারণে বাড়ছে ঝড়ে পরা শিক্ষার্থীর সংখ্যাও।
এমন পরিস্থিতির উন্নতি হবে কিনা তার কোন উত্তর খোদ শিক্ষা অফিসার নাজমা বেগম নিজেও দিতে পারেনি। ফলে এই উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার অবনতি কোথায় গিয়ে পৌঁছবে তার উত্তর এখনি দিতে পারছেন না কর্মরত কর্মকর্তাসহ শিক্ষকরা।
চাঁদপুরের বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ইলশেপাড়কে জানান, বিদ্যালয়গুলোতে ওয়াশব্লক স্থাপন করার জন্য শিক্ষা অফিসে বছরের পর বছর তাগাদা দিলেও এই শিক্ষা কর্মকর্তা তার দায়িত্বহীনতা আড়াল করতে বলে আসছেন আপনাদের প্রতিষ্ঠানের জায়গা (ভূমি) নেই। এছাড়া জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস স্থান নির্বাচন করে কোন ম্যাপ না দেয়ায় ওয়াশব্লক নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস তার কাছে কোন বিদ্যালয়ের ওয়াশব্লকের প্রস্তাব নিয়ে গেলে মাসের পর মাস তিনি তাদের ঘুরাতেন। নানা কৌশলে ঐ ওয়াশব্লক না হওয়া যেনো তাকে অনেক আনন্দ দিতো বলে মনে হয়। এ নিয়ে তিনি বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের নাজেহালও করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিজের অদক্ষতা ঢাকতে নানা সময় তিনি ঐসব বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ‘অকর্মা’ বানিয়ে রাখতেন। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করতেন, ঐসব শিক্ষকদের কারণেই ওয়াশব্লক হচ্ছে না। কিন্তু এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ইঞ্জিনিয়াররা বেশ হয়রানীর শিকার।
প্রধান শিক্ষকদের দাবি প্রতিনিয়তই কোন না কোন বিদ্যালয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে। এছাড়া প্রায় অধিকাংশ বিদ্যালয়গুলোতেই বহুতল ভবন আছে। কেবল অর্থ বরাদ্দ দিয়ে ঐ সব ভবনগুলোতে ওয়াশব্লক স্থাপন করলেই শিক্ষার্থীসহ শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অসহনীয় দুর্ভোগ থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব।
জায়গা নেই কিংবা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস কোন প্রতিবেদন দেয়নি এমন অভিযোগ আনা বর্তমান উন্নয়নের যুগে কখনোই ন্যায়সঙ্গত নয় বলে মনে করেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। কেবল উর্ধ্বতনদের আন্তরিকতার অভাবেই এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যার কারণে প্রাক-প্রাথমিকে (৪ থেকে ৬ বছরের) অধ্যয়নরত অনেক শিক্ষার্থী প্রাকৃতির চাপ সহ্য করতে না পেরে অধিকাংশ সময় শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ নষ্ট করে ফেলে। যার কারণে বিদ্যালয়ের পাঠদানও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
এছাড়া বিদ্যালয়ের আশপাশের বাড়িগুলোতে শিক্ষার্থীরা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেলে নানাভাবে নাজেহাল হতে হয়। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় শিক্ষকরা এগিয়ে আসলে তারা লাঞ্ছিত হতে হয় প্রায় সময়ই। সেই সাথে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রীরা অনেক সময় উঠতি বয়সী বখাটেদের হাতে নিপীড়নের শিকার হয়ে বিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য হয়।
কর্মরত শিক্ষকদের একাংশ বলছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মোট শিক্ষকের অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষক নারী হওয়ায় প্রকৃতগত কারণে প্রতি মাসের নির্দিষ্ট সময়গুলোতে শারীরিক অসুস্থতার কারণে ওয়াশব্লক ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি হয়ে পরে।
ঐ সময়গুলোতে শিক্ষকরা স্বাচ্ছন্দবোধ করার জন্য অনেক সময় বিদ্যালয় ত্যাগ করতে হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষক, শিক্ষা অফিসার কিংবা সহকারী শিক্ষা অফিসার এমন পরিস্থিতিতেও কোন সহযোগিতা করেন না বলে নারী শিক্ষকরা অভিযোগ করেন।
এমন অভিযোগের বিষয়ে দৈনিক ইলশেপাড়ের পক্ষ হতে চাঁদপুর সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার নাজমা বেগমের কাছে অতি সম্প্রতি তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ এর বিধি ৩ মোতাবেক তথ্য চাওয়া হলে তিনি কিছু তথ্য দিলেও ব্যক্তিগত দায়িত্বহীনতার বিষয়টি এড়িয়ে যান।
চাঁদপুর সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার নাজমা বেগম যে তথ্যগুলো ইলশেপাড়কে দেন তা হলো- তার উপজেলায় ৮৫টি (যদিও তার দেয়া তালিকায় ৮৩টি বিদ্যালয়ের নাম রয়েছে) প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ওয়াশব্লক নেই। তার মধ্যে ৪০টি বিদ্যালয়ে ওয়াশব্লক করার অনুমতি পাওয়া গেছে, বাকিগুলোতে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় ওয়াশব্লক নির্মাণ হবে না। ঐসব বিদ্যালয়গুলোতে ওয়াশব্লক সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও তিনি দাবি করেন এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং তা পর্যায়ক্রমে হবে। না হওয়ায় দায়িত্বহীনতা কার- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি কোন জবাব দেননি।
যেই ৮৫টি বিদ্যালয়ে ওয়াশবল্ক নেই তার মাঝে ৮৩টি বিদ্যালয়য়ের তালিকা ইল্শেপাড়কে সরবরাহ করেন তিনি। বিদ্যালয়গুলো হলো- দামোদরদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর বিষ্ণুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ বিষ্ণুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ধনপর্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খেরুদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লালপুর বালুধুম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম ডাসাদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সফরমালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব ডাসাদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কল্যান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমানউল্যাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সেনগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হোসেনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কেআর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর পাইকাস্তা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জুবলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কুমারডুগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর শাহতলী যোবাইদা বালক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্য শাহতলী কাদেরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কেতুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ পাইকদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম ভাটেরগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলগী পাঁচগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্য রাড়ীরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর কামরাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাঁচগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মির্জাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর-পশ্চিম মৈশাদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খলিশাডুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সিলন্দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ মৈশাদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর পশ্চিম তরপুরচন্ডী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্য তরপুরচন্ডী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গুণরাজদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ষোলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (জায়গা নেই), ব্রাহ্মণসাখুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সকদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর মেয়াসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম সাপদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর পূর্ব সাপদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঘারুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্য মদনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম বাখরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব বাখরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাজরাজেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিষ্ণুদী আজিমিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (জায়গা নেই), ২নং বালিকা (আ.বা.) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩নং বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩নং বালক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫নং বালক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কে.জি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২নং বালিকা (সি.হল) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লেডি দেহলভী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাসান আলী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হিন্দুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম জাফরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরফতেজংপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আবদুল আউয়াল গাজী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্যমচরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দামোদরদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (জায়গা নেই), পূর্ব বিষ্ণুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর পশ্চিম বিষ্ণুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ বিষ্ণুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ লালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্য আশিকাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর রালদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর সেনগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্য আশিকাটি (দক্ষিণ) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ ডাসাদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভড়ঙ্গারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ ভাটেরগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বড়সুন্দর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর বড়সুন্দর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ হামানকর্দ্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর তরপুরচন্ডী কাজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নিজ গাছতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চাপিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম চরফতেজংপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর চরফতেজংপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মধ্য বাখরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
০৮ মার্চ, ২০২২।
