জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ৭ মেয়র, ৮ উপজেলার চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যানদের অপসারণ

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
দেশের ১২টি সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, ৬০টি জেলার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ৩২৩টি পৌরসভার মেয়র, ৪৯৩টি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, নারী ও পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যানকে অপসারণ করা হয়েছে। সোমবার (১৯ আগস্ট) সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, জেলা ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং রোববার পৌরসভার মেয়রদের অপসারণ করে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত পৃথক পৃথক প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার।
অপসারণকৃত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে চাঁদপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ ওচমান গণি পাটওয়ারী, ৭ জন পৌরসভার মেয়র ও ৮ উপজেলা পরিষদের ২৪ চেয়ারম্যান ও নারী-পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান রয়েছেন। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের অপসারণের প্রজ্ঞাপনে বলা হল জেলা পরিষদ ‘সংশোধন’ অধ্যাদেশ, ২০২৪ এর ধারা ১০খ প্রয়োগ করে নিম্নবর্ণিত চেয়ারম্যান জেলা পরিষদবৃন্ধকে স্ব-স্ব চেয়ারম্যানের পদ থেকে অপসারণ করলো। অপসারণকৃত চেয়ারম্যানের স্থলে জেলা প্রশাসক দায়িত্ব পালন করবেন।
অপরদিকে একই দিনে চাঁদপুরের ৮ উপজেলা ২৪ জন চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও নারী ভাইস চেয়ারম্যানসহ দেশের ৪৯৩ উপজেলা পরিষদের ১৪৮২ জন চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান ও নারী ভাইস চেয়ারম্যানকে স্ব-স্ব পদ থেকে অপসারণ করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ- ২০২৪ এর ধারা ১৩(ঘ) প্রয়োগ করে বাংলাদেশের ৪৯৩টি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও নারী ভাইস চেয়ারম্যানকে স্ব-স্ব পদ হতে অপসারণ করা হলো। অপসারণকৃত চেয়ারম্যানদের স্থলে সংশ্লিষ্ট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) দায়িত্ব পালন করবেন।
এছাড়া গত রোববার (১৮ আগস্ট) একটি প্রজ্ঞাপনে চাঁদপুরের ৭ জন মেয়রসহ দেশের ৩২৩ পৌরসভার মেয়রকে স্ব-স্ব পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪ এর ধারা ৩২(ক) প্রয়োগ করে বাংলাদেশের নিম্নবর্ণিত পৌরসভার মেয়রদের স্ব-স্ব পদ হতে অপসারণ করা হলো। পৃথক আদেশে দেশের ৩৩০টি পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে।
এর আগে গত ১৭ আগস্ট ‘স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪, ‘স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪, ‘জেলা পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ ও ‘উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪ এর খসড়া অনুমোদন করে অন্তর্র্বতীকালিন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। এতে বিশেষ পরিস্থিতিতে চেয়ারম্যানকে অপসারণের বিধান রাখা হয়। পরে তা অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হয়।
জানা গেছে, ২০২২ সালের ১৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জেলা পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনিত প্রার্থী হিসেবে আলহাজ ওচমান গণি পাটওয়ারী দ্বিতীয়বারের মতো চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। গতকাল সোমবার (১৯ আগস্ট) সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকেসহ দেশের ৬০ জন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে অপসারণ করে এবং অপর একটি প্রজ্ঞাপনে প্রশাসক হিসেবে জেলা প্রশাসককে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অপরদিকে চলতি বছরের (২০২৪ সাল) ২১ মে অনুষ্ঠিত চাঁদপুর সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অ্যাড. হুমায়ন কবির সুমন, ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল হায়দার সংগ্রাম, নারী ভাইস চেয়ারম্যান রেবেকা সুলতানা মুন্না, হাজীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আলহাজ হেলাল উদ্দিন মিয়াজী, ভাইস চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সুমন, নারী ভাইস চেয়ারম্যান রাবেয়া আক্তার ও শাহরাস্তি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মো. মুকবুল হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান মো. ইমদাদুল হক মিলন, নারী ভাইস চেয়ারম্যান হাসিনা আক্তার, ৮ মে অনুষ্ঠিত মতলব দক্ষিণ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, ভাইস চেয়ারম্যান শওকত আলী দেওয়ান বাদল, নারী ভাইস চেয়ারম্যান নাজমা আক্তার আসমা (আখিঁ) ও মতলব উত্তর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মানিক, ভাইস চেয়ারম্যান রিয়াজুল হাসান রিয়াজ, নারী ভাইস চেয়ারম্যান লাভলী চৌধুরী নির্বাচিত হন।
এছাড়া চলতি বছরের (২০২৪ সাল) ৫ জুন অনুষ্ঠিত কচুয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচেন মো. মাহবুব আলম, ভাইস চেয়ারম্যান শাহজালাল প্রধান জালাল, ভাইস চেয়ারম্যান জোসনা আক্তার ও ফরিদগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে খাজে আহমেদ মজুমদার, ভাইস চেয়ারম্যান মো. আকবর হোসেন মনির, নারী ভাইস চেয়ারম্যান মাজুদা বেগম এবং ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত হাইমচর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নূর হোসেন পাটোয়ারী, ভাইস চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন, নারী ভাইস চেয়ারম্যান শাহনাজ বেগম উপজেলা চেয়ারম্যান র্নিবাচিত হন।
সোমবার সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চাঁদপুরের ২৪ জন নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও নারী ভাইস চেয়ারম্যানসহ দেশের ৪৯৩ উপজেলা পরিষদের ১৪৮২ চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও নারী ভাইস চেয়ারম্যানকে অপসারণ করা হয়। অপসারণকৃত চেয়ারম্যানদের স্থলে প্রশাসক হিসেবে সংশ্লিষ্ট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) দায়িত্ব পালন করবেন।
এদিকে চাঁদপুরের ৭টি পৌরসভার মধ্যে ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচনে মো. জিল্লুর রহমান জুয়েল, ২০২১ সালের ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হাজীগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে আসম মাহবুব-উল আলম লিপন, ২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত কচুয়া পৌরসভার নির্বাচনে মো. নাজমুল আলম স্বপন ও ফরিদগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচনে মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের পাটোয়ারী পৌর মেয়র নির্বাচিত হন।
এছাড়া ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত শাহরাস্তি পৌরসভার নির্বাচনে হাজী আব্দুল লতিফ ও মতলব পৌরসভা নির্বাচনে আওলাদ হোসেন লিটন এবং ২০২৩ সালের ১৭ জুলাই অনুষ্ঠিত ছেংঙ্গারচর পৌরসভা নির্বাচনে আরিফ উল্যাহ সরকার মেয়র নির্বাচিত হন।
গত রোববার (১৮ আগস্ট) সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চাঁদপুরের ৭ জন নির্বাচিত পৌরসভার মেয়রসহ দেশের ৩২৩ পৌরসভার মেয়রকে স্ব-স্ব পদ থেকে অপসারণ করা হয় এবং পৃথক আদেশে অপসারণকৃত মেয়রদের স্থলে দেশের ৩৩০টি পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগ করে সরকার।
উল্লেখ্য, সারাদেশে কোটা সংস্কারের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে যান। পর স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে দেশের অধিকাংশই জনপ্রতিনিধি আত্মগোপনে চলে গেছেন।
এসব জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে জেলা ও উপজেলা পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার প্রায় সব শীর্ষ পদই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের দখলে ছিল। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল। পরে বিকল্প ব্যবস্থা করে সরকার। যেমন উপজেলা চেয়ারম্যান অনুপস্থিত থাকলে দায়িত্ব পালন করবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এখন অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইন সংশোধন করে মেয়র ও চেয়ারম্যানদের অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার।

২০ আগস্ট, ২০২৪।