কর্মকর্তা জানালেন উপজেলা অফিস ম্যানেজ করতে টাকা লাগে!
মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্ :
‘দুর্নীতির দিন শেষ, গড়বো সোনার বাংলাদেশ।’ দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সরকার নানমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সব সেক্টরে বেতন-ভাতা দ্বিগুণ করেছেন। তারপরও কিছু কিছু সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের চাহিদার শেষ নেই। তারা উৎকোচ, ঘুষ বা বাড়তি টাকা ছাড়া তিল পরিমাণ কাজ করতেও রাজি নয়। টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাহিদানুযায়ী টাকা না দিলে কালক্ষেপণ।
এমন পথে চলছে রাজারগাঁও ইউনিয়ন ভূমি অফিস। অফিস সহায়কদের দাপটে জিম্মি হয়ে পড়ছে সেবা নিতে আসা সাধারণ গ্রাহকেরা। হাজীগঞ্জের রাজারগাও ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা ও অফিস পিয়নদের বিরুদ্ধের একের পর এক ঘুষ বাণিজ্য ও প্রতারণার অভিযোগ করে স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ভূমি জটিলতা নিয়ে ছুটে আসা গ্রাহকের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়াসহ নানা অনিয়মে জর্জরিত এ ইউনিয়ন ভূমি অফিস। জমি খারিজ করতে এসে ঘুষের টাকা দিয়েও হয়রানি হতে হয় কর্মকর্তা আব্দুস ছাত্তারের কাছে। দালাল বা মাধ্যম ছাড়া কোন কাজই করতে আগ্রহী নন তিনি। তার দুই অফিস সহকারী ফজলুর রহমান ও এসকান্দারকে দিয়ে চুক্তি করে কাজ করছেন। খারিজ আবেদন করতে সরকারি ফি যেখানে ১,০৫০ টাকা, অথচ সেখানে সর্বনি¤œ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা ছাড়া খারিজ খতিয়ান হয় না। ওই কর্মকর্তা তার দুই সহকারীর কথার বাইরে কাজ করেন না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
পশ্চিম রাজারগাঁও গ্রামের পাটওয়ারী বাড়ির মিয়া রাজা পাটওয়ারীর ছেলে গিয়াস উদ্দিন পাটওয়ারী নামের এক ভুক্তভোগী জানান, বিদেশ যাওয়ার উদ্দেশে ১৪ শতক জায়গা তার পৈত্রিক ক্রয়কৃত ভূমি খারিজ করতে আসেন রাজারগাঁও ইউনিয়ন ভূমি অফিসে। অফিস পিয়ন এসকান্দার ১৫ দিনের মধ্যে খারিজ করে দেয়ার বিনিময়ে ১৫ হাজার টাকা দাবি করেন। নিরূপায় গিয়াস উদ্দিন নগদ ১০ হাজার টাকা অফিস পিয়ন এসকান্দারের হাতে তুলে দেন। বাকি ৫ হাজার কাগজপত্র বুঝে পাওয়ার পর দেয়া হবে মর্মে চুক্তিবদ্ধ হয় তিনি।
এক মাস পার হয়ে যাওয়ার পরও খারিজ করতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েন গিয়াস উদ্দিন। ইউনিয়ন অফিস কর্মকর্তা ও পিয়নদের কাছে গিয়ে এ বিষয়ে জানতে চেয়ে বার-বার অপমানিত হয়ে ফিরে আসেন। তারা পাঠান উপজেলা ভূমি অফিসে। এখানে এসেও হয়রানির শিকার হতে হয়। তারা টাকা দাবি করেন গিয়াস উদ্দিনের কাছে। বিদেশে যাওয়া বন্ধ হওয়ার অবস্থা দেখা দিলে অবশেষে নিরূপায় হয়ে তিনি সংবাদকর্মীর শ্মরণাপন্ন হন। বিষয়টি সাংবাদিকরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বৈশাখী বড়–য়াকে গত ৩ ডিসেম্বর রাতে মোবাইল ফোনে জানান। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দৃষ্টান্ত দেখিয়ে ৪ ডিসেম্বর গিয়াস উদ্দিনের জমির খারিজ সম্পন্ন করে তাকে কাগজপত্র বুঝিয়ে দেন। যার নং ১০১২/১৭-১৮।
গিয়াস উদ্দিন ইউনিয়ন অফিস পিয়ন এসকান্দারের কাছে খারিজের বিনিময়ে নেয়া টাকা ফেরৎ চাইলে ৪ ডিসেম্বর রাতে উপজেলা ভূমি অফিসে কানুনগো আবুল কাসেমের কাছে পিয়ন ফজলুর রহমান ঘুষের টাকার কথা স্বীকার করলেও টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
গিয়াস উদ্দিন এ প্রতিনিধিকে বলেন, ৫ ডিসেম্বর বিদেশ যাওয়ার কথা ছিল। খারিজের কারণে জায়গা বিক্রি করতে না পারায় বিমানের ফ্লাইট মিস হয়েছে। ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে চুক্তির টাকা দিয়েছি। উপজেলা ভূমি অফিসের আসলাম, সেখানেও দিদি কয়েকজনের নাম করে টাকা চাইলেন। তাদের কারণে ফ্লাইটের তারিখ পরিবর্তন করতে অতিরিক্ত ১৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ইউএনও স্যার আমার বিষয়টি সাংবাদিকের মাধ্যমে জানার পর কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করে দেন। স্যারের আন্তরিকতায় আমার বিদেশে যাওয়ার নিশ্চিত হয়েছে। এ জন্য তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তিনি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় ও হয়রানি বিষয়ে বন্ধের দাবি জানান।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ১০-১৫ হাজার টাকার নিচে খারিজ হয় না। কাগজপত্রে ত্রুটি থাকলে-তো কথা নেই। টাকার অংক দ্বিগুণ হয়ে যায়। তাও আবার কালক্ষেপণ। তারা উপজেলা অফিসে পাঠায়, সেখানেও টাকা দিতে হয়।
এ বিষয়ে ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা আব্দুস ছাত্তার বলেন, টাকা নেয়ার বিষয়টি শুনেছি, কত টাকা নিয়েছে আমার জানা নেই। তবে উপজেলা অফিস ম্যানেজ করার জন্য টাকা লাগে। তাই সরকারি ফি’র অতিরিক্ত কিছু টাকা নেয়া হওয়া হয়। তিনি আরো বলেন, উপজেলা অফিসে টাকা না দিলে ফাইল সাক্ষরে গড়িমসি করে। আমরা তো নিরূপায়। এই অফিসে যে কাজ রয়েছে, তা এক ব্যক্তিই করতে পারে। অথচ আমরা ৪ জন রয়েছি। অনেক সময় অবসর সময় কাটাতে হয়।
অফিস সহকারী এসকান্দারের সাথে মুঠো ফোনে কয়েকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে ভূমি কার্যক্রমের উন্নতি হলেও দূর হয়নি ঘুষ-বাণিজ্য। নামজারি, দলিল তোলা, বিভিন্ন ধরনের ফরম নিতে এসে ভূমি অফিসে ঘুষ দিতে হয়। ভূমি কর্মকর্তা এবং অফিসের নিজস্ব দালালদের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি সাধারণ মানুষ। একটি ছোট কাজও ঘুষ ছাড়া করা যায় না। সিন্ডিকেটগুলো সংগঠিতভাবে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আদায় করে থাকে। উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের টেবিল ম্যানেজ করার জন্য এসব অর্থ আদায় করা হয়।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওয়ালিউজ্জামানের পদোন্নতিজনিত বদলি হওয়ার পর থেকে আগের অবস্থানে ফিরে আসে ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোতে। চৌকস ঐ কর্মকর্তা হাজীগঞ্জ উপজেলায় যোগদানের পর-পরই পরিবর্তন আসে ভূমি সংক্রান্ত সেবা প্রদানে। সারা দেশের মধ্যে প্রথম অনলাইনভিত্তিক ভূমি তথ্য সেবা কার্যক্রম চালু করেন এই কর্মকর্তা। ওয়ালিউজ্জামানের বদলির সংবাদ শুনে উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের মাঝে মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে বলে জানা যায়।
- Home
- প্রথম পাতা
- টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না রাজারগাঁও ইউনিয়ন ভূমি অফিসে