দুই জোটেরই নজরে তরুণ ভোটার

দেশে মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশই তরুণ। তাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। বিশাল সংখ্যক এই ভোটার নির্বাচনের ফলাফল সহজেই পাল্টে দিতে পারে।

তাই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় দুই জোটেরই বিশেষ নজর তরুণদের দিকে। প্রার্থী মনোনয়ন থেকে শুরু করে ক্যাম্পেইন পদ্ধতিতেই পরিবর্তন আসছে। এবার রেকর্ড সংখ্যক তরুণ নেতাকে মনোনয়ন দিচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

তাদের মধ্যে- ছাত্রনেতা, সাংস্কৃতিক কর্মী, খেলোয়াড়, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ রয়েছে। উভয় জোটের নির্বাচনী ইতশেহারে তরুণদের সমস্যা, ভাবনা, আশা-আকাক্সক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারণায়ও ফেসবুক, টুইটারসহ ডিজিটাল মাধ্যমে জোর দেয়া হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যদিও যুব সমাজের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু সবার চাহিদা অভিন্ন। তারা মানসম্মত শিক্ষা ও কর্মসংস্থান চায়। চায় দুর্নীতিমুক্ত দেশ। এছাড়া তারা মুক্তবুদ্ধির চর্চার সুযোগ ও নাগরিকদের নিরাপত্তা চায়।

সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির সংস্কার এবং নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের মাধ্যমে বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে আগামী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে তরুণ ভোটার।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, আগামী নির্বাচনসহ জাতীয় ইস্যুতে যুব সমাজের মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুব সমাজ একটি গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডলে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করতে চায়।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও একত্রিত হওয়ার অধিকার চায় তারা। তার মতে, যুবকরা মেধার ভিত্তিতে কর্মে নিয়োগ ও পদোন্নতি চান। তারা চায়, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সঙ্গে আলোচনা করুক। নাগরিকরা যাতে সঠিকভাবে ভোট দিতে পারে, সেজন্য নির্বাচনে পর্যবেক্ষক থাকুক- এটাও চায় তরুণরা।

৩০ ডিসেম্বর একাদশতম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের কাজ চলছে। এবারের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ। এই ভোটারের এক-তৃতীয়াংশ যুবক।

সংখ্যায় যা প্রায় সাড়ে তিন কোটি। তাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে আবার ২ কোটি নতুন ভোটার। দেশের মোট বেকার জনশক্তির ৮০ শতাংশ যুবক। এছাড়াও যুব জনশক্তির ৩০ শতাংশই কর্মে বা শিক্ষায় নিয়োজিত নেই।

ফলে যুবকদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশে ১৪ কোটি মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। এর মধ্যে ৬ কোটি মানুষ মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। যার বেশিরভাগ তরুণ।

অর্থাৎ ডিজিটাল বাংলাদেশের ব্যানারে উন্নত প্রযুক্তির সুবিধা তারাই ভোগ করছে। ফলে উভয় রাজনৈতিক জোটই তরুণদের গুরুত্ব দিচ্ছে।

জানতে চাইলে ফেনী থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী শমী কায়সার বলেন, এবারের নির্বাচনে আমরা তরুণদের বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। আমরা বলছি, তরুণদের হাতে আগামীর বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে ৬ থেকে ৭ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। এটি আওয়ামী লীগের অবদান। ফোরজি (চতুর্থ প্রজন্ম) ইন্টারনেট সেবা চালু হয়েছে। মেট্রোরেল, পদ্মা সেতুসহ অবকাঠামো খাতে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে।

তরুণদের বলব উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে নৌকার বিকল্প নেই। তিনি আরও বলেন, আগামীতে আমরা তরুণদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছি। নির্বাচনের প্রচারণায় ডিজিটাল মাধ্যম গুরুত্ব পাবে।

এর মধ্যে রয়েছে- ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এবং প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া।

১৪ অক্টোবর রাজধানীর কৃষিবিদ ইন্সটিটিউটে যুব সম্মেলনের আয়োজন করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম। এখানে সারা দেশ থেকে দেড় হাজারেরও বেশি তরুণ অংশ নিয়েছিল।

এদের মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যয়ন শিক্ষার্থী, এনজিও প্রতিনিধি, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবীরা ছিলেন। সম্মেলনে যুবকদের মতামতে মোট ১১টি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। তবে সংক্ষেপে যুব সমাজের দাবির মূল কথা হল- দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

দেশ দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। আর যুবকদের দাবির ধারাবাহিক বিষয়গুলো হল- মানসম্মত শিক্ষা, যুব সমাজের কর্মসংস্থান, মেধার ভিত্তিতে কর্মে নিয়োগ, তরুণদের উদ্ভাবনী ক্ষমতার বিকাশ, তথ্য-প্রযুক্তি ও বাক স্বাধীনতার অধিকার, যুববান্ধব শাসন ব্যবস্থা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুব সমাজের অংশগ্রহণ, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার, উগ্রবাদের মোকাবেলা ও মাদকাসক্তির প্রতিরোধ। এ সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সমালোচনা করেন যুবকরা।

জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুম বিল্লাহ বলেন, প্রবীণদের অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির কল্যাণে তরুণরা অনেক অ্যাডভান্স চিন্তা করে।

এই অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি সমন্বয় করা গেলে দেশ অনেক এগিয়ে যাবে। ফলে আগামী নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে তরুণদের গুরুত্ব দেয়া উচিত। তার মতে, রাজনীতিবিদরা বক্তৃতায় অনেক সুন্দর কথা বলেন।

কিন্তু তা বাস্তবায়ন করেন না। তিনি বলেন, তথ্য-প্রযুক্তি আইন বাক স্বাধীনতার পরিপন্থী। যুব সমাজের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে। ফলে আইনটির যুগোপযোগী সংশোধন জরুরি।

বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ফরিদপুর-২ আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী শ্যামা ওবায়েদ বলেন, বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে তরুণদের প্রতি গুরুত্ব থাকবে। তরুণদের মূলত দুটি সমস্যা। প্রথমত : শিক্ষা আর দ্বিতীয়ত : কর্মসংস্থান।

এই দুটি বিষয়ে সমাধানে আমাদের ইশতেহারে বিশেষ গুরুত্ব পাবে। এছাড়াও তরুণদের ভাবনা, আশা, আকাক্সক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে ইশতেহার তৈরি করবে বিএনপি। তিনি বলেন, তরুণরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই নির্বাচনী প্রচারণায় এটি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

বিশেষ করে ফেসবুক, টুইটার ও ইউটিউবসহ প্রচারণা চলছে। বিএনপির অফিসিয়াল ওয়েব ও ফেসবুক পেজ রয়েছে। এছাড়াও বিভিন্নভাবে প্রচারণা চালানো হবে। তিনি বলেন, তরুণদের বাইরেও বিশাল সংখ্যক মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

ফলে প্রচারণায় এই বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব পাবে। ব্যবসায়ী নেতা আসিফ ইব্রাহিম বলেন, যুবকদের অনেক উদ্ভাবনী আইডিয়া রয়েছে। কিন্তু অর্থের অভাবে তারা তা বাস্তবায়ন করতে পারে না। তাই তরুণদেরকে সহজে পুঁজির ব্যবস্থা করতে হবে।

এজন্য দরকার যুবকদের জন্য একটি পৃথক ব্যাংক। এই ব্যাংক থেকে যৌক্তিক সুদে তাদেরকে ঋণ দেয়া যেতে পারে। নির্বাচনে প্রচারণার ক্ষেত্রে উভয় দলই ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছে। বিভিন্ন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা ফেসবুকে প্রার্থীর ছবি দিয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছে।

এতে লাইন কমেন্ট করছেন অন্যরা। পড়ছে নেতিবাচক মন্তব্যও। এছাড়াও বিভিন্ন প্রার্থীর কার্যক্রমের ওপরে ভিডিও তৈরি করে ইউটিউবে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। ভোটারদের ই-মেইলে প্রার্থীদের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে বার্তা পাঠানো হচ্ছে। মোবাইল ফোনে ক্ষুদে বার্তা যাচ্ছে।

এক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হচ্ছে। থেমে নেই বিএনপিও। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছে দলটি বিশাল সংখ্যক সদস্যের একটি গ্রুপ। লক্ষ্য একটাই ভোটারদের আকৃষ্ট করা।