শাহ্ আলম খান
প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির মধ্যে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে নেমে পড়া জেলেদের নিবৃত্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বেপরোয়া জেলের দল সংঘবদ্ধ হয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসনের উপরও চড়াও হচ্ছে। ফলে নদীতে এসব জেলেদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
চাঁদপুরের পদ্মা ও মেঘনা নদীতে অভিযান শেষে এমন তথ্য জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জামান। তিনি বলেন, প্রায় প্রতি রাতেই পদ্মা ও মেঘনা নদীর বিভিন্নস্থানে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। একটি স্পিডবোট এবং দু’টি ট্রলার নিয়ে জেলা প্রশাসনের অর্ধশত স্বেচ্ছাসেবক, মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা এই অভিযানে অংশ নেন। এসময় নদীতে মাছ ধরা অবস্থায় শতাধিক জেলে নৌকাকে ধাওয়া করে তীরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। নদীতে জেলেদের ফেলে রাখা জাল জব্দ করা হয়েছে।
এদিকে, সন্ধ্যার পর সুযোগ বুঝে আবারো কয়েকশ’ নৌকা নিয়ে জেলেরা নদীতে মাছ ধরতে নেমে পড়ে। এসময় জেলেদের উদ্দেশে মাইকিং করে এবং ধাওয়া দিয়েও তাদের নিবৃত্ত করা যায়নি। কারণ, তাদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি স্পিডবোটও যোগ দেয়।
ফলে জেলেদের বেপরোয়া আচরণের কারণে অভিযানকারীরা নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে নদী থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পদ্মা ও মেঘনা নদীবেষ্টিত দুর্গম চর রাজরাজেশ্বর ও তার আশপাশের কতিপয় জেলেরা দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে সশস্ত্র অবস্থায় নদীতে নির্বিচারে ইলিশ শিকার করছে। মা ইলিশ সংরক্ষণের এই সময় গোটা রাত জুড়েই এসব জেলেদের নিয়ন্ত্রণে থাকে বিশাল নদী। এমন পরিস্থিতিতে গত রোববার সেখানে অভিযান চালাতে গিয়ে নৌ পুলিশের একটি বহর হামলার শিকার হয়। এতে নৌ-পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজিসহ অন্তত ২০ পুলিশ কমবেশি আহত হন। সেই ঘটনায় প্রায় সাড়ে ছয় শ’ ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করা হয়। এরমধ্যে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও নতুন করে গ্রেপ্তার আতঙ্কে না থেকে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে জেলেরা। শুধু তাই নয়, গত মঙ্গলবার চাঁদপুর সদর উপজেলার রনাগোয়াল, বহরিয়া ও হরিণাঘাট এলাকায় র্যাব, কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ, প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। এসব এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ জাল ও নৌকা জব্দ করা হলেও সংঘবদ্ধ জেলেদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে অভিযান সীমিত করা হয়। কারণ, সেখানেও হামলার চেষ্টা করে বেপরোয়া হয়ে উঠা শত শত জেলে। অভিযোগ রয়েছে, নদীপাড়ের কতিপয় জনপ্রতিনিধিরা জেলেদের সচেতন না করে তাদের নদীতে মাছ ধরতে উৎসাহ দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচিতে এসব জনপ্রতিনিধিরা প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কোনো ধরনের সহায়তাও করছে না।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আসাদুল বাকী জানান, খাদ্য সহায়তা হিসেবে এবারে চাঁদপুরের ৫০ হাজার জেলেকে মাথাপিছু ২০ কেজি হারে চাল দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এই ২২ দিন নদীতে নামতেও নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু জেলেরা বেপরোয়া আচরণ করায় সরকারের শত চেষ্টার মাঝেও মা ইলিশ সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যতো বাঁধাই আসুক না কেনো- নদীতে অভিযান অব্যাহত রাখা হবে।
উল্লেখ্য, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ সংরক্ষণে গত ১৪ অক্টোবর থেকে আগামি ৪ নভেম্বর পর্যন্ত দেশের উপকূলীয় ১৯টি জেলার নদ-নদীতে সবধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এসময় ইলিশ বিক্রি, পরিবহন ও মজুদও নিষিদ্ধ করা হয়।
০৩ নভেম্বর, ২০২০।
