প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের সাথে সনাকের ভার্চুয়েল মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

স্টাফ রিপোর্টার
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্তৃপক্ষের আয়োজনে ও সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) চাঁদপুরের সহযোগিতায় ‘করোনাকালীন প্রাথমিক শিক্ষাঃ চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক ভার্চুয়াল মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২২ জুলাই) সভায় সভাপতিত্ব করেন সনাক সভাপতি অধ্যক্ষ মো. মোশারেফ হোসেন।
সম্মানীয় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অসিত বরণ দাস এবং মুখ্য আলোচক হিসেবে ছিলেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. সাহাব উদ্দিন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সনাক সদস্য রফিক আহমেদ মিন্টু। টিআইবি প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে বক্তব্য রাখেন টিআইবি’র সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. আতিকুর রহমান।
সম্মানীয় আলোচকের বক্তব্যে চাঁদপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অসিত বরণ দাস বলেন, দেশের যেকোন সংকটকালীন সময়ে প্রাথমিক শিক্ষকবৃন্দের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক মহামারির এই সময়ে সনাক-টিআইবি’র আজকের ভার্চুয়াল মতবিনিময় সভার যে বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়েছে ‘করোনাকালীন প্রাথমিক শিক্ষাঃ চ্যালেঞ্জ ও করনীয়’ তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরো বলেন, এই সংকটের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের সাথে যেকোন মূল্যে যোগাযোগ রাখতে হবে। বাড়িতে শিক্ষার্থীরা যেন লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগ দেয়, তাদের যেন শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক থাকে সেজন্যে শিক্ষকবৃন্দ অভিভাবকদের সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখতে হবে। যতটুকু সম্ভব অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। এই সংকটময় মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া, খেলাধুলা, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য কিভাবে ঠিক রাখা যায় সেজন্যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কাজও চলমান আছে। সরকার অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠদান অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা চালু করার চিন্তাভাবনা করছে যা প্রশংসার দাবি রাখে।
মুখ্য আলোচকের বক্তব্যে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. সাহাব উদ্দিন বলেন, এই দুর্যোগময় সময়ে আজকের এই আলোচনা কিছুটা হলেও আমাদের করণীয় সম্পর্কে চিন্তা করার সুযোগ তৈরী করেছে। তিনি বলেন, করোনাকালীন সংকটেও শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সাথে প্রাথমিক শিক্ষা কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ অব্যাহত আছে।
তিনি আরো বলেন, সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করানো হয়। কিন্তু দেখা যায় যেসব শিক্ষার্থীদের এন্ড্রয়েড মোবাইল বা অনেকের ঘরে টেলিভিশনও নেই সেসব শিক্ষার্থীরা সংসদ টেলিভিশনের পাঠগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বৈশ্বিক মহামারি করোনা কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে তা এখনো অনিশ্চিত। এই অনিশ্চতার মধ্যে থেকেও শিশুদের পাঠের সাথে সম্পৃক্ত রাখার জন্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্তৃপক্ষ শিক্ষক-অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করার লক্ষ্যে শিক্ষকদের বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, এ মুহূর্তে শিশুদের বিনোদনের প্রয়োজন রয়েছে। বিনোদনের মাধমে আমরা যেন তাদের পাঠে সাথে সম্পৃক্ত রাখতে পারি।
টিআইবি প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে বক্তব্য রাখেন টিআইবি’র সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা ভয়াবহ বৈশ্বিক মহামারির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমাদেরকে এই সংকটের মধ্যে থেকেও পরিকল্পনা সাজাতে হবে। শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকদের একটা সেতুবন্ধন তৈরি করতে হবে। শিক্ষা হচ্ছে শরীর-মন-আত্মার একটি সুসমন্বয়। ইতোমধ্যে শিক্ষকবৃন্দ করোনাকালীন সংকটে শিক্ষার মান কিভাবে ধরে রাখা যায় সে বিষয়ে সরকারকে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি আরো বলেন, যদি সোস্যাল মিডিয়া, ফেসবুক ও ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে ক্লাস্টারভিত্তিক গ্রুপ করে জ্ঞানের আদান প্রদান করা যায় সেটা শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই ফলদায়ক হবে। এই মহামারিতে শিক্ষার্থীরা যাতে আতঙ্কগ্রস্ত না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের পাঠ্যভ্যাসে ফিরিয়ে আনার জন্য শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে কিভাবে পড়ালেখা করতে পারে সেদিকে শিক্ষা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দিতে হবে।
তিনি বলেন, টিআইবি বিশ্বাস করে, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের প্রতি নজর দেওয়া শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। জাতির প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে ও প্রতিটি আন্দোলনে শিক্ষকবৃন্দের ভূমিকা ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সভাপতির বক্তব্যে সনাক সভাপতি অধ্যক্ষ মো. মোশারেফ হোসেন বলেন, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সাথে যদি যোগাযোগ বৃদ্ধি করা যায় তাহলে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা অনেক লাভবান হবে। প্রতি সপ্তাহে একবার ৩০ জন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সাথে যদি একজন শিক্ষক কথা বলতে পারেন তাহলে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় কিছুটা হলেও উপকৃত হবে। করোনাকালীন সংকটেও কিভাবে শিক্ষার্থীদের পাঠে, খেলাধুলায় ও অন্যান্য শিক্ষামূলক কর্মকান্ডে মনোনিবেশ করানো যায় সেদিকেও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।
টিআইবি’র এরিয়া ম্যানেজার মো. মাসুদ রানার সঞ্চালনায় করোনাকালীন সংকট মোকাবেলায় শিক্ষা কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ, বাস্তবায়ন এবং চ্যালেঞ্জ বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. ফরিদ উদ্দীন, ফরিদগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. মনিরুজ্জামান, হাজীগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. মিজানুর রহমান, মতলব উত্তর উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. ইকবাল হোসেন, শাহরাস্তি উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. খাজা মাইন উদ্দিন, উত্তর শ্রীরামদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শাহজাহান সিদ্দিকী এবং উত্তর তরপুরচন্ডী কাজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খোদেজা বেগম।
তারা বলেন, আমরা খুবই দুর্যোগ ও মহামারির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা খুবই চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শিশুদের স্কুল থেকে দূরে সরে যাওয়া, সিলেবাস শেষ করতে না পারা, অনেক শিক্ষার্থীদের ঘরে টেলিভিশন না থাকা, অনেকের এন্ড্রয়েড মোবাইল না থাকা, শিক্ষার্থীদের হাতে কলমে শিক্ষা দিতে না পারা এগুলো অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।
তারা আরো বলেন, এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় হলো সিলেবাস কমানো, শিক্ষকদের ছুটি কমানো, শিক্ষাবর্ষ বাড়ানো, এসএমসি ও অভিভাবকদের কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা। এছাড়া শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, বিনোদন, খেলাধুলা, শারিরীক ও মানসিক বিকাশের প্রতি খেয়াল রাখা খুবই জরুরি। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের নেতৃত্বে ইতোমধ্যে আমরা প্রতিটি উপজেলায় দরিদ্র শিক্ষার্থীদের খাদ্য সহায়তা ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করেছি।
মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তাবৃন্দ, টিআইবি’র প্রোগ্রাম ম্যানেজার কুমিল্লা ক্লাস্টার মো. হুমায়ুন কবির, চাঁদপুর সদর উপজেলার সহকারী শিক্ষা অফিসার মানসুর আহমেদ, সনাক চাঁদপুরের সদস্যবৃন্দ, ইয়েস গ্রুপের দলনেতা ও সদস্যবৃন্দ এবং টিআইবি কর্মীবৃন্দ।
২৩ জুলাই, ২০২০।