বিপণীবাগ বাজার থেকে মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধারে মামলা দায়ের

রাজুর বাবার খুনী রাজু!

 

এস এম সোহেল
নামে নামে জমে টানে, এটি একটি প্রবাদ বাক্য। আবার নামের মিল থাকার কারণে অনেকের জীবনে দিতে হয়েছে অনেক মাশুল। কিন্তু এবার নামের কারণে বিব্রত নিহতের পরিবার। গত বৃহস্পতিবার (১৬ সেপ্টেম্বর) শহরের মিষ্টান্ন ও দধি ব্যবসায়ী নিহত নারায়ণ ঘোষকে হত্যা করে শহরের বিপণীবাগ বাজারের পৌর মার্কেটের পাশে পাবলিক টয়লেটের পরিত্যক্ত স্থানে বস্তাভর্তি করে লাশ রেখে যায় দুর্বৃত্তরা।
পরবর্তীতে বাজারের নাইটগার্ড ইসমাইল হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী পুলিশসহ সবাই মোটামুটি নিশ্চিত বিপণীবাগ টিপটপ সেলুনের কর্মচারী রাজুই হচ্ছে নিহত নারায়ণ ঘোষ হত্যার খুনী।
এদিকে নিহত নারায়ণ ঘোষের ২ ছেলের মধ্যে ছোট ছেলের নাম রাজীব ঘোষ রাজু। ফলে বিষয়টি নিয়ে বিব্রত নিহতের পরিবার।
এদিকে নারায়ণ ঘোষ নিহতের ঘটনায় ছোট ছেলে রাজীব ঘোষ রাজু বাদী হয়ে টিপটপ সেলুন কর্মচারী রাজুকে ১ নম্বর এবং অজ্ঞাতনামা আরো বেশ ক’জনকে আসামি করে চাঁদপুর সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। যার নং-৩০, তাং-১৬/৯/২০২১। এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মডেল থানার ইন্সপেক্টর (ইন্টেলিজেন্স এন্ড অপারেশন) মো. এনামুল হককে।
এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর এনামুল হক বলেন, ঘটনার পর থেকেই বাজারের নাইটগার্ডের বক্তব্য অনুযায়ী এবং টিপটপ সেলুন কর্মচারী রাজুকে আটকের বিষয়ে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। শুধু তাই নয়, জেলা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরামর্শে মামলার ১নং আসামিকে গ্রেফতারে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। আশা করছি, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনার রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হবো।
এদিকে ঘটনার দিন আসামি রাজু সর্বশেষ সেলুন থেকে বের হয়ে গুয়াখোলা রোডে তার ভাড়া বাসায় এসে শার্ট-প্যান্ট পরিবর্তন করে দ্রুত পালিয়ে যায়। পুলিশ ঘটনার পর রাজুর ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে রক্তমাখা শার্ট-প্যান্টসহ বেশ কিছু সরঞ্জাম উদ্ধার করে। যদিও পুলিশ বলছে তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে কিছু বলা সম্ভব নয়।
একটি সূত্র জানায়, ঘটনার পরপরই পুলিশ সেলুন মালিক কৃষ্ণ, রাজুর স্ত্রী ও তার শ্যালককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসে। এরপর রাত ৯টায় উল্লেখিত ৩ জনকে সংশ্লিষ্টদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে প্রধান শর্ত ছিলো পুলিশের ডাকে যে কোনো মুহূর্তে আসতে হবে। এ বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য হচ্ছে, ঘটনা উদঘাটনে বা রহস্য উন্মোচনে আমরা অনেকের সাথে কথা বলতে পারি। অথবা কাউকে গ্রেফতার দেখিয়ে প্রয়োজনে পুলিশের জিম্মায় রাখতে পারি।
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শুক্রবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজুর স্ত্রীকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুনরায় থানায় ডেকে এনে কথা বলছেন বলে জানা গেছে। যদিও পুলিশ বিষয়টি নিয়ে কোনো কথা বলেননি।
এদিকে বৃহস্পতিবার সকাল ৭টায় চাঁদপুর শহরের বিপণীবাগ বাজার এলাকায় থেকে নারায়ন ঘোষ (৬০) নামের এক দধি-মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীর বস্তাবন্দী গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। বিপণীবাগ বাজারের শরীফ স্টিল ওয়ার্কসপের কারখানার পাশ থেকে বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলের পাশের একটি সেলুন থেকে হত্যার আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশ। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদীপ্ত রায়।
নিহত নারায়ন ঘোষ চাঁদপুর শহরের ঘোষপাড়ার মৃত যোগল কৃষ্ণ ঘোষের ছেলে। তার ২ ছেলে ও ১ মেয়ে রয়েছে। তিনি পাইকারি দধি-মিষ্টি বিভিন্ন দোকানে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিক্রি করতেন। সন্ধ্যার পর সেইসব দোকান থেকে টাকা কালেকশন করে বিপণীবাগের মার্কেটের টিপটপ হেয়ারকাটিং সেলুনের সামনে এসে গল্প করতেন।
নিহতের ছোট ছেলে রাজু ঘোষ ও ফুফাতো ভাই চন্দ্রনাথ ঘোষ চন্দ্র জানান, নারায়ন ঘোষ বহুকাল ধরে পাইকারিতে দধি-মিষ্টি বিক্রি করতেন। বুধবার সন্ধ্যায় তিনি টাকা কালেকশন করতে বাজারে যান। এরপর আর বাড়ি ফিরেননি। নারায়ন ঘোষ রাতে বাসায় না ফেরায় আমরা পুরো শহরে হন্নে হয়ে খুঁজেছি। সকালে তার বস্তাবন্দী লাশের খবর পাই। ঘটনার রাতে তার সাথে বিপণীবাগ বাজার থেকে কালেকশন করা টাকা এবং হাতে একটি স্বর্ণের আংটি ছিলো। বুধবার রাতে তিনি কৃষ্ণ কর্মকারের সেলুনে সেভ করতে যান।
তারা আরো জানান, কৃষ্ণ কর্মকার এই সেলুনটি ভাড়া নেওয়ার সময় নারায়ন ঘোষের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা সুদের মাধ্যমে নিয়েছিল। ওই টাকা পরিশোধ না করায় গত ২ দিন আগেও তাদের মধ্যে ওই টাকা নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। এ কারণেই নারায়ন ঘোষকে হত্যা করা হয়েছে বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে।
বিপণীবাগ বাজারের নৈশপ্রহরী মো. ইসমাইল বকাউল জানান, রাত অনুমান ২টায় কৃষ্ণ কর্মকারের সেলুনের কর্মচারী রাজু শীল দোকান খুলে একটি বস্তা নিয়ে দোকানে প্রবেশ করে। আমি দূর থেকে জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, সামনে পূজা, তাই দোকান পরিস্কার করছে। কিছুক্ষণ পর সে বস্তাটি টেনে-হিঁচড়া মার্কেটের পেছনে পাবলিক টয়লেটের কাছে নিয়ে যায়। পুনরায় তাকে জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, দোকানের ময়লা-আবর্জনা পাবলিক টয়লেটের কাছে ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছে। এরপর ভোর ৪টায় রাজু শীল সেলুন বন্ধ করে বেরিয়ে যায়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) সুদীপ্ত রায় জানান, আমরা সকালে বস্তাবন্দী লাশের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এ হত্যার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেছি। প্রত্যক্ষদর্শী নৈশপ্রহরী এবং পরিবারের বক্তব্য নিয়েছি। বিষয়টি অধিকতর তদন্ত করে অভিযুক্তকে আটক করা হবে।
তিনি আরো বলেন, এ ঘটনার সাথে অন্য কোন বিষয় জড়িত আছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ঘাতককে আটক করা যায়নি বলে জানান তিনি।
পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আসিফ মহিউদ্দিন ও চাঁদপুর মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ আব্দুর রশিদসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিহত নারায়ন ঘোষ সুদের ব্যবসা করতেন। তিনি বিপণীবাগ বাজারের অনেক ব্যবসায়ীকে সুদে টাকা দিতেন।
ঘটনার পর থেকে কৃষ্ণ কর্মকারের সেলুনের কর্মচারী রাজু শীল পলাতক রয়েছে। নারায়ন ঘোষের হত্যার ঘটনায় টিপটপ সেলুন মালিক কৃষ্ণ কর্মকার ও রাজু শীলের স্ত্রীসহ ৪ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ থানায় ডেকে আনে।
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১।