ভিটে-মাটিহীন পরিবারের মানবেতর জীবন-যাপন

পাবে কি বসতভিটে সহায়-সম্বলহীন হাজীগঞ্জের স্বপন ঘোষ?

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
দুই পুকুরের মাঝখানে একটি পাড়। সেই পাড়ে জীর্ণ-শীর্ণ ঝুপড়ি ঘর। ঝুপড়ি ঘরের ছাউনিতে পলিথিন। আর বেড়ায় পাটখড়ি। সেই পলিথিনের ছিদ্র এবং পাটখড়ির ভিতর দিয়ে ঘরে ঢুকছে বর্ষায় বৃষ্টির পানি ও শীতে কনকনে ঠান্ডা বাতাস। স্ত্রীকে সাথে নিয়ে ডানার নিচে আগলে রাখেন সন্তানদের। এভাবে কত যে, বর্ষা আর শীত পার হলো, কিন্তু তার জীবনে বসন্ত আসেনি। বরং এ ঝুঁকিপূর্ণ ঝুপড়ি ঘরেই স্ত্রী আর পাঁচ সন্তানকে নিয়ে রোগে-শোকে, জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে দিন কাটাচ্ছেন, ভিটে-মাটি ও সহায়-সম্বলহীন হাজীগঞ্জের স্বপন চন্দ্র ঘোষ।
রোগে-শোকে আক্রান্ত স্বপন চন্দ্র ঘোষ। অর্থের অভাবে চিকিৎসা নিতে পারছেন না। ভারি ও পরিশ্রমের কাজ করাতো দূরের কথা, বেশি দূর হাঁটা-চলাও তার পক্ষে অসম্ভব। তাই কোন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের সম্মুখে, বাজার কিংবা ব্রীজ-কালভার্টের উপর বসে বুট-বাদাম বিক্রি করছেন। দিন শেষে দু-তিনশ’ টাকা যা মুনাফা হয়, তা দিয়েই অর্ধাহারে কিংবা অনাহারে চলছে তার পরিবার।
স্বপন চন্দ্র ঘোষ উপজেলার বড়কুল পশ্চিম ইউনিয়নের নাটেহরা গ্রামের মৃত লালমোহন ঘোষের ছেলে। ভিটে-মাটিহীন অস্থায়ী আস্তানায় স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে থাকছেন তিনি। ইতোমধ্যে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র ছেলে ফ্রিজ মেরামতের কাজ শিখছে। মেজো মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে এবং সেজো মেয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ালেখা করছে। আর ছোট মেয়ে আসছে বছর (২০২০ সালে) শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হবে।
যেখানে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, টাকার অভাবে সেই বসতঘরটি সংস্কার করতে পারছেন না স্বপন চন্দ্র ঘোষ। দিন শেষে যে সামান্য আয় হয় তার, তা দিয়ে কোন মতে জীবিকা-নির্বাহ করছেন তিনি। যেখানে ঔষুধ-পথ্য ক্রয় করতে পারছেন না, সেখানে ভূমি ক্রয় করবেন কোত্থেকে? আবার বসতঘর! এতসব দুঃশ্চিন্তায় এবং রোগে-শোকে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি।
সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা যায়, নাটেহরা গ্রামে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মনির হোসেন গাজী বাড়ির সাথে দুই পুকুর পাড়ের মাঝখানে অন্যের ভূমিতে জীর্ণ-শীর্ণ দো-চালা একটি ঝুপড়ি ঘর। ঘরের চালায় পলিথিন, বেড়ায় পাটখড়ি আর পলিথিন। সামনে ত্রিপাল সাঁটানো। যেনো, এই মুহূর্তেই ঘরটি মাথার উপর ভেঙে পড়ছে। অথচ এ ঝুপড়ি ও কুঁড়ে ঘরেই স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর বসত করছেন স্বপন চন্দ্র ঘোষ।
ঘরের সামনে উদাম গায়ে (শরীর) দাঁড়িয়ে আছেন তিনি (স্বপন ঘোষ)। রোগে-শোকে জর্জরিত। ঘরের অবস্থা যেমন, তার শরিরের অবস্থাও ঠিক তেমন। তার এবং তার পরিবার ও ঘরের অবস্থা দেখে, মনের অজান্তেই সত্যিই চোখের কোনে জল এসে গেলো। কথা হয়, তার সাথে। তিনি বলেন, নাটেহারা ঘোষ বাড়ি পৈত্রিক নিবাস। কিন্তু তার বাবার কোন সহায়-সম্পদ না থাকায় বাধ্য হয়েই এ ঝুপড়ি ঘরেই কোন মতে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকছেন।
স্বপন চন্দ্র ঘোষ জানান, নিজের ভিটেমাটি না থাকায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় অন্যের ভূমিতে কোন মতে থাকছেন। তিনি বলেন, যেখানে টাকার অভাবে ঠিকমতো সংসার চালাতে পারছি না। সেখানে ঔষুধ, পথ্য কিনবো (ক্রয়) কি দিয়ে, আর বসতঘরই বা ঠিক (সংস্কার) করবো কি করে ?
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মনির হোসেন গাজী বলেন, গৃহহীনদের জন্য সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ঘর নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। কিন্তু স্বপন ঘোষের নিজস্ব সম্পত্তি (ভূমি) না থাকায়, তাকে ঘর করে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া সরকারিভাবে ১০ টাকা কেজি ধরে চালসহ অন্যান্য সুবিধা দেয়া হচ্ছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বৈশাখী বড়ুয়া জানান, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ভূমির ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বপন চন্দ্র ঘোষকে বসতঘর করে দেয়া হবে।