স্টাফ রিপোর্টার
স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করা চাঁন মিয়ার খুঁটির জোর কোথায়? এমন প্রশ্ন আজ রাজারগাঁও গ্রামের সাধারণ মানুষের। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি নিজেই প্রায় অর্ধশত মামলার বাদী হয়ে মামলা পরিচালনা করে দীর্ঘদিন ধরে শতাধিক পরিবারকে হয়রানি করে আসছেন। অন্যের মামলা-মোকদ্দমার কোর্ট পাওয়ার নিয়ে মামলা পরিচালনা যার নেশা এবং পেশায় পরিণত হয়েছে।
জানা যায়, চাদঁপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলার রাজারগাঁও গ্রামের মৃত ছিদ্দিক বেপারির ছেলে চাঁন মিয়া স¦াধীনতার দীর্ঘ সময় পর হঠাৎ নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করে ২০১০ সালের ২৩ এপ্রিল হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট সেকশনে একটি রিট দায়ের করেন। বিষয়টি নিয়ে দৈনিক প্রথম আলোসহ কয়েকটি জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে তাকে নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠে। তাই তিনি রিট আবেদনটি শুনানি না করে নিজেকে প্রশাসনের কাছ থেকে আড়াল করতে ঢাকা ছাড়েন এবং নিজ গ্রাম রাজারগাঁওয়ে অবস্থান করেন।
সে সময় থেকেই মূলত শুরু হয় চাঁন মিয়ার মামলা বাণিজ্য। নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নাম ভাঙ্গিয়ে মানুষকে হয়রানি করতে অকারণেই কথায় কথায় মামলা দিয়ে টাকা রোজগারের নতুন কৌশল উদ্ভাবন করেন। মানুষের সাথে ঝগড়া লাগানো এবং ঝগড়া মিট করে দেয়ার কথা বলে টাকা নেয়া তার যেন এখন নেশায় পরিণত হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে এরকম অপকর্মের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে জানা যায়, এ চাঁন মিয়া পশ্চিম রাজারগাঁও গ্রামের এক অসহায় পরিবারের জায়গা দখল করতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাইনবোর্ড টানিয়ে দেন। এ ঘটনায় পূর্ব রাজারগাঁও গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের প্রতিবাদ করে চাঁন মিয়াকে রাজারগাঁও বাজারে প্রকাশ্যে মারধর করে। তারপরও চাঁন মিয়া শোধরায়নি।
২০১৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ২টায় রাজারগাঁও বাজারে আব্দুস সামাদ মার্কেটে দুর্বৃত্তদের লাগানো আগুনে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ক্ষতি হয় যা সকল স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত মার্কেটের মালিক নতুন করে ঘর তুলতে গেলে চাঁন মিয়া বাঁধা দেন এবং বিভিন্নভাবে হয়রানি করেন। রাজারগাঁও ইউনিয়নের অসংখ্য মানুষের মনে প্রশ্ন- ১৯৭১ সালে মাত্র ১২ বছরের একজন শিশু কোন খুঁটির জোরে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করে হাইকোর্টে রিট করেন। মুক্তিযুদ্ধ ভাতা গ্রহণ বিষয়ে সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন- এমনটাই আশা করেন সচেতন মহল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অ্যাডভোকেটের দেয়া প্রাপ্ত তথ্যমতে, চাঁন মিয়া নিজেই একা প্রায় অর্ধশত মামলা পরিচালনা করে আসছেন। এর মধ্যে বেশিরভাগ অন্য মানুষের কাছ থেকে মামলা পরিচালনার করার পাওয়ার নিয়েছেন। ২০১২ খ্রি. থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত চাঁন মিয়া বাদী হয়ে করা মামলার নং জি আর ৫০/২০১২,২৪০/২০১২, দায়রা জজ আদালত ১৭২/২০১৫,৫২০/২০১৫, ১৭১/ ১১৪ বিবাদী ছামাদ পাটওয়ারী ৪৬/২০১৮, চাঁদপুর জজ কোর্ট বন্টন স্বত্ত্ব-বিবাদী ৮০ জন। মামলা নং- ১৬৭৩/২০১৯ ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুনাল মামলায় বিবাদী নাজিমুদ্দিন গং মামলা নং ১৬৯৪/২০১৯ এ মামলায় বিবাদী করা হয় ১০২জন। মামলা নং ৩১৮.৩০.৪,২০১৮ এ মামলা বিবাদী ১৪ জন। মামলা নং ১৬৯৩/২০১৯ বিবাদী রফিকুল ইসলাম গং। মামলা নং ১৬৯১/১৯ বিবাদী লোকমান বেপারী।
মামলা নং ১৬৯৫/১৯ বিবাদী ফজলুল হক মামলা নং ১৬৯৬/২০১৯ বিবাদী অলি উল্লাহ ১৬৯৬/২০১৯ বিবাদী গফুর গং ১৬৯৬/১৯ বিবাদী কাসেম পাটওয়ারী গং ১৬৯৬/১৯বিবাদী রাজ্জাক ১৬৯৬/১৯ বিবাদী ওসমান মৌলবি গং ১৬৯৬/১৯বিবাদী নূরুল ইসলাম গং মামলা নং ১৬৯৭/১৯ বিবাদী সেলিম গং মামলা নং ১৬৯৮/১৯ বিবাদী রফিক, ১৬৯৯/২০১৯ এসব মামলা দিয়ে মানুষকে হয়রানি বিষয়ে রাজারগাঁও ইউপির চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ আব্দুল হাদী মিয়ার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, মামলাগুলো আদালতকেন্দ্রিক হওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে কোন প্রকার ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের পক্ষ থেকে ইউনিয়ন পরিষদে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করলে সংসদ সদস্যের সাহযোগিতা নিয়ে তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থাগ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হবে।
ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. আলমগীর হোসেনের সাথে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চাঁন মিয়ার গ্রামের আশ-পাশের কিছু লোক রয়েছে তাকে কোর্ট পাওয়ার দিয়ে মামলা পরিচালনা করে থাকে। এতে করে চান মিয়া মানুষকে হয়রানি করার সুযোগ পেয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ইউনিয়ন পরিষদে অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব পাটওয়ারী বলে, চাঁন মিয়ার অপকর্মে রাজারগাঁও ইউনিয়নের মানুষ অতিষ্ট তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এমপি মহোদয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
এ বিষয়ে চাঁন মিয়ার কাছে মোবাইল ফোনে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, বর্তমানে আমি চারটি মামলা পরিচালনা করছি। এ সময় ২০১২ সাল থেকে অন্য মামলার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। অতপর বলেন, এগুলো ষড়যন্ত্র।
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০।
