শিক্ষার্থীর অভাবে বন্ধ হওয়ার পথে সিহিরচোঁ মধ্যপাড়া সপ্রাবি

জন্ম হার কম, তাই শিক্ষার্থীও কম। -প্রধান শিক্ষক
তারা বুঝিয়ে-শুনিয়ে মাদরাসায় নিয়ে যায়। -স্কুল সভাপতি
দক্ষ সভাপতি ও কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল মনিটরিং প্রয়োজন। -সচেতন অভিভাবক
ব্যবস্থা নেয়া হবে। -উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
নিয়মিত সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার পরও দিন-দিন শিক্ষার্থীহীন হয়ে পড়ছে হাজীগঞ্জ উপজেলার ১২৯নং সিহিরচোঁ মধ্যপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শুরুর দিকে বিদ্যালয়টি ভালোভাবে পরিচালিত হলেও জাতীয়করণের পরবর্তী সময় থেকে আশংকাজনকহারে শিক্ষার্থী কমতে থাকে।
বিদ্যালয়টি উপজেলার কালচোঁ উত্তর ইউনিয়নের সিহিরচোঁ গ্রামের মধ্যপাড়ায় একটি মনোরম নিরিবিলি পরিবেশে অবস্থিত। জানা গেছে, ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যালয়টি চালু হওয়ার পর ২০০০-০১ খ্রিস্টাব্দে একতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। বিদ্যালয়ে রয়েছে ছোট-বড় চারটি কক্ষ। একটি কক্ষে অফিস এবং অপর তিনটি কক্ষে প্রাক-প্রাথমিকসহ অন্যান্য শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, মাত্র ৫৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে চলছে বিদ্যালয়টি। যদিও শুরুর দিকে এবং জাতীয়করণের আগে বিদ্যালয়ে শতাধিকের উপরে শিক্ষার্থী ছিলো। কিন্তু জাতীয়করণের পর শিক্ষার্থী দিন-দিন আশংকাজনক হারে ঝরে পড়তে থাকে। প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিলো ৯৪ জন, ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে ৭৯ জন, ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ৬৯ জন, ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে ৬৮ জন এবং সর্বশেষ গত বছর থেকে চলতি বছরে ১০ জন শিক্ষার্থী কমে দাঁড়ায় মাত্র ৫৮ জন শিক্ষার্থী।
বর্তমানে বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণিতে ১০ জন, প্রথম শ্রেণিতে ৯ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ১০ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ৯ জন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ১০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। অথচ বিদ্যালয়ে প্রতিমাসে শিক্ষক বেতন বাবদ সরকার প্রায় লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করছে। পেয়েছে স্লিপের ৫০ হাজার এবং প্রাক-প্রাথমিকে জন্য ১০ হাজার টাকাসহ মোট ৬০ হাজার টাকা। এছাড়া শিক্ষার্থী উপবৃত্তিসহ নিয়মিত সরকারি সব বরাদ্দ পাচ্ছে বিদ্যালয়টি। অর্থাৎ সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার পরও বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ করতে না পারায় বিদ্যালয়টি দিন-দিন শিক্ষার্থীহীন হয়ে পড়ছে। বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটিও এ ব্যাপারে কোনো ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি বিদ্যালয়ে ৫ জন শিক্ষক থাকার পরও তারা শিক্ষার্থী বাড়ানোর বিষয়ে ন্যূনতম চেষ্টা করেনি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সম্প্রতি একজন শিক্ষক বদলিজনিত কারণে বর্তমানে বিদ্যালয়ে ৪ জন শিক্ষক রয়েছে।
এদিকে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে প্রতি মাসে একবার করে ক্লাস্টার প্রধান বা উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তারা বিদ্যালয় পরিদর্শন করার কথা থাকলেও গত ৩ মাসে কোন কর্মকর্তা বিদ্যালয় পরিদর্শনে যাননি। যারা আগে দায়িত্ব পালন করেছেন তারা শিক্ষার্থী বাড়ানোর বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে কার্যকর কোন তথ্য দিতে পারেননি প্রধান শিক্ষক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক জানান, বিদ্যালয় পরিচালনায় ম্যানেজিং কমিটি ও শিক্ষকদের আন্তরিকতার ঘাটতি ছিলো। যার ফলে দিন-দিন শিক্ষার্থী হ্রাস পাচ্ছে। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে পড়ালেখার মান ভালো নয়, তাই দৃশ্যমান ফলাফল নেই। যার কারণে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের এই বিদ্যালয়ে ভর্তি করাচ্ছেন না। অথচ একটি বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন (কেজি) স্কুলেও ন্যূনতম শতাধিক শিক্ষার্থী থাকে বলে তিনি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিদ্যালয়টি বন্ধ হওয়ার উপক্রম- বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অপর এক অভিভাবক জানান, বিদ্যালয়ে দক্ষ একজন সভাপতির নেতৃত্বে পরিচালনা পর্ষদ, শিক্ষকদের আন্তরিকতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল মনিটরিং প্রয়োজন।
অবশ্য এ ব্যাপারে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবুল খায়ের খান জানালেন ভিন্ন তথ্য। তিনি বলেন, এই এলাকায় জন্মহার কম, তাই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কম। তিনি আরো বলেন, সিহিরচোঁ ছোট একটি গ্রাম। এই গ্রামে আরো একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি ফাজিলা মাদরাসা রয়েছে। যার ফলে, তার বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে।
যতটুকু চেষ্টা করা দরকার, ততটুকু করেছি জানিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের টানা তিনবারের সভাপতি ডা. আব্দুল হাই বলেন, পাশে মাদরাসা (নেছারাবাদ ফাজিল মাদরাসা) থাকার কারণে আমরা ছাত্র-ছাত্রী পাই না। তারা (মাদরাসা কর্তৃপক্ষ) গ্রামের মানুষদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে মাদরাসায় নিয়ে যায়।
এ ব্যাপারে ক্লাস্টার প্রধান (বলিয়া ক্লাস্টার) ও উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আফতাবুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি ক্লাস্টারের দায়িত্ব পেয়েছি। যত শীঘ্র সম্ভব বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সাথে বসবো। সবার সমন্বিত চেষ্টায় ইনশআল্লাহ, আগামি শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পাবে।
ভারপ্রাপ্ত উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এ কে এম মিজানুর রহমান জানান, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী হ্রাসের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং আগামি শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী বৃদ্ধির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯।