সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার নাজমা অবশেষে বদলি!

ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতিতে বহুল সমালোচিত

ইলশেপাড় রিপোর্ট
অবশেষে চাঁদপুর ছাড়ছেন বহুল আলোচিত শিক্ষা অফিসার নাজমা বেগম। তিনি চাঁদপুর সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে দীর্ঘ প্রায় ৮ বছর এক কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেন। তাকে ফেনী সদর উপজেলায় শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করা হয়েছে। গতকাল ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তাকে সেখানে যোগ দিতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র।
চাঁদপুরে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতিসহ শিক্ষকদের হয়রানির জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত ছিলেন সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার নাজমা বেগম। তার ব্যাক্তিগত আক্রোশের শিকার হয়ে অনেক শিক্ষক প্রায় সময় কর্মস্থলে বিব্রত থাকতেন। গতকাল সোমবার তার বদলিজনিত বিদায়ে সদর উপজেলায় কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে। এছাড়া তিনি ছিলেন চরম সাংবাদিকবিমুখ একজন কর্মকর্তা। তার অনিয়মগুলো প্রকাশের ভয়ে তিনি বেশিরভাগ সময় সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলতেন। বিশেষ করে সাংবাদিকদের ফোন তেমন একটা তিনি ধরতেন না। শুধুমাত্র যাদের সাথে সখ্যতা ছিল বা মোবাইল নম্বর তার কাছে ছিলো সেসব ফোন তিনি রিসিভ করতেন।
জানা গেছে, নাজমা বেগম ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই চাঁদপুর সদর উপজেলায় শিক্ষা অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকে তিনি মন চাইলে কর্মস্থলে বসতেন। মন না চাইলে কর্মস্থলে আসতেন না। দুপুরের পর তো তাকে অফিসেই পাওয়া যেতো না। দাপ্তরিক কাজে শিক্ষক-কর্মচারীরা অফিসে আসলে দিনের পর দিন অপেক্ষা কিংবা হয়রানির শিকার হওয়ার পর পেতেন কাক্সিক্ষত সেবা। আবার কোন কোন শিক্ষককে তিনি মানসিক শাস্তি হিসেবে দিনের পর ঘুরাতেন তার দপ্তরে। এমনকি কোন শিক্ষকের ছুটি অধিদপ্তর থেকে পাস হলেও তার কাছ থেকে ছাড়পত্র নিতে গিয়েও দিনের পর দিন ঘুরতে হয়েছে। ফলে পাসকৃত ছুটি কোন কাজেই আসেনি। গত ডিসেম্বরে একজন শিক্ষকের বহির্বাংলাদেশ ছুটি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে পাস হলেও শুধুমাত্র তার অসহযোগিতায় ঐ শিক্ষক তার ছুটি ভোগ করতে পারেননি।
চাঁদপুরে কর্মরত শিক্ষকরা জানান, নাজমা বেগম দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তিনি জড়িয়ে পরেন নানা অনিয়মে। তিনি শিক্ষক বদলি ও পদায়নে অনেক সময় ব্যাক্তিগত সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির পর কাক্সিক্ষত সেবা প্রদান করতেন। এমনকি শিক্ষকরা আরো অভিযোগ করেন, গত ৮ বছরে তিনি ব্যাক্তিগত সুবিধার বিনিময়ে অনেক সিনিয়র শিক্ষককে বদলির সুযোগ না দিয়ে জুনিয়রদের সুযোগ করছেন বিধি লঙ্ঘন করে। এছাড়া সিলেবাস, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরির নামে তার ছিলো অবাধ বাণিজ্য। নানা সময় শিক্ষকদের চাপে ফেলে বিভিন্ন উপায়ে চাঁদা তুলে নিতেন। তার অফিসের বিশুদ্ধ পানি খাবার জন্যও লক্ষাধিক টাকা শিক্ষকদের কাছ থেকে নিয়েছিলেন। এছাড়া তো রয়েছে অডিট বা অন্য কথা বলে চাঁদা আদায়। এসব বিষয়ে কোনক্রমেও সাংবাদিকদের তথ্য দেয়া ছিল বারণ। কোন তথ্য সাংবাদিকরা জেনে ফেললে শিক্ষকদের চাপ প্রয়োগ করে সাদা কাগজে তাদের স্বাক্ষর নিয়ে রাখতেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, কোন কোন শিক্ষক প্রশাসনিক সহযোগিতা কিংবা প্রত্যয়নের জন্য কোন আবেদন করলে তিনি তা ফেলে রাখতেন মাসের পর মাস। আর্থিক সুবিধা বা উর্ধ্বতন কিংবা রাজনৈতিক তদবির ছাড়া তিনি সহজেই শিক্ষকদের এমন কাজে সহযোগিতা করতেন না। এতে করে অনেক শিক্ষক মানসিকভাবে এই কর্মকর্তার কাছে হয়রানির শিকার হয়েছেন।
চাঁদপুরের প্রাথমিক শিক্ষক নেতাদের অভিযোগ, এই কর্মকর্তা দাপ্তরিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের সাথে অনেকটাই ব্যক্তিগতভাবে সময় দেয়ার কারণে শিক্ষকরা প্রশাসনিক সেবা থেকে বঞ্চিত থাকতেন। তার ব্যাক্তিগত কর্মকান্ড নিয়ে প্রশাসনিক মহলে নানা কিছু চাউর থাকলেও এই শিক্ষা অফিসার রাজনৈতিক নেতাদের কাছের মানুষ (মনগড়া) হওয়ায় বার বার পার পেয়ে আসছিলেন। এতে করে মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষক সমাজ প্রায় সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কিংবা সামাজিক কর্মকান্ডে নানা প্রশ্নের মুখে পরতেন।
চাঁদপুর সদর উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, অতি সম্প্রতি যখন দাপ্তরিকভাবে বদলির আদেশ আসে, ঠিক তখনি এই কর্মকর্তা তদবির শুরু করেন অধিদপ্তরে। যতে তাকে চাঁদপরে অপর কোন উপজেলায় বদলি করা হয়। তবে অন্যান্য উপজেলার কর্মকর্তারা নাজমা বেগমের উপর সন্তুষ্ট না থাকায় তিনি এই যাত্রায় সফল হতে পারেননি। জানা গেছে, তিনি আশা ছাড়েননি। বদলিকৃত স্থানে যোগ দিয়ে আবারো চাঁদপুরের অন্য কোন উপজেলায় আসার চেষ্টা তিনি চালিয়ে যাবে বলে জানা গেছে। তারপরও শেষ পর্যন্ত ৮ বছরের দীর্ঘ যাত্রার ইতি টেনে তাকে চাঁদপুরের কর্মস্থল ছাড়তে হচ্ছে। এতে করে কর্মরত শিক্ষকদের মাঝে আনন্দ ছড়িয়ে পরে। প্রকাশ্যে অনেকে তার বিদায়ের বিষয়ে মুখ না খুললেও সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন।
চাঁদপুর সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসের সূত্র বলছে, নাজমা বেগমের ব্যক্তিগত খামখেয়ালিপনার কারণে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও ছিলো অনেকটা অতিষ্ঠ। যার কারণে এ উপজেলার শিক্ষার মান বৃদ্ধির বিপরীতে অবনতি হয়েছে। নাজমা বেগমের বিদায়ের মধ্য দিয়ে হয়তো আবার ফিরবে সুন্দর পরিবেশ- এমন প্রত্যাশা এখন সংশ্লিষ্টদের।

০১ মার্চ, ২০২২।