হাজীগঞ্জের মাতৈন সপ্রাবির দুই কক্ষে ২১৯ শিক্ষার্থীর পাঠদান!

মানসম্মত শিক্ষা প্রদানে মারাত্মক ব্যাঘাত

 ২০১৪ সালে একাডেমিক ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা।
 পরিত্যক্ত ভবনটি যে কোন সময় ধসে পড়ার আশংকা।
 বিদ্যালয়ের মাঠ দিয়ে জনসাধারণের চলাচলের পথ।

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
প্রায় ৮ বছর আগে ৪০নং মাতৈন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মূল ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ এখনো পরিত্যক্ত ভবনের স্থলে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়নি এবং পরিত্যক্ত ভবনটিও ভাঙ্গা হয়নি। যার ফলে মাত্র ২টি শ্রেণিকক্ষে সোয়া দুইশ’ কোমলমতি শিক্ষার্থীকে পাঠদান করানো হচ্ছে। এতে একদিকে শিক্ষা কার্যক্রমের মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। অপরদিকে পরিত্যক্ত ভবনটি, যে কোন সময় ধসে পড়ে দুর্ঘটনার আংশকা করছেন এলাকাবাসী।
বিদ্যালয়টি উপজেলার হাজীগঞ্জর সদর ইউনিয়নের মাতৈন গ্রামে অবস্থিত। যা মাতৈন সপ্তগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যালয়টি চালু হওয়ার পর, ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে চার কক্ষবিশিষ্ট একটি একতলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হয়। দীর্ঘ প্রায় অর্ধ শতাব্দী পর ভবনটি জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হলে ২০১২ সালের ২২ জুলাই তৎকালীন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বিদ্যালয়টিতে পাঠদান না করার পরামর্শ দেন।
এরপর ২০১৪ সালের ২৪ আগস্ট তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী মো. আশরাফ জামিল বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। যার স্মারক নং- এলজিইডি/উপ্র/হাজী/২০১৩/৯৬/৪১১। এর মধ্যে প্রায় ৬ বছর পার হলেও পরিত্যক্ত ভবনটির স্থলে নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হয়নি এবং পরিত্যক্ত ভবনটিও ভাঙ্গা হয়নি। এতে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় এখনো দাঁড়িয়ে আছে ওই ভবনটি।
গত ১০ বছরে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরিত্যক্ত ভবনটি নিলামে বিক্রি এবং নতুন ভবন নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বেশ কয়েকবার লিখিত আবেদন করার পরও কোন কাজে আসেনি। যার ফলে বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। এবং স্কুল চলাকালীন সময়ে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা এবং স্কুল ছুটির পরে স্থানীয় শিশুরা পরিত্যক্ত ভবনে খেলাধুলা করে থাকে। এতে যে কোন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশংকা করছেন এলাকাবাসী। তাছাড়া রাতের আঁধারে পরিত্যক্ত ভবনটি মাদকসেবিদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে।
অপরদিকে বিদ্যালয় মাঠের মধ্য দিয়ে চলাচলের পথ থাকায়, স্কুল চলাকালীন সময়ে নিয়মিত লোকজন যাতায়াত করেন। সেখান দিয়ে রিক্সা, সাইকেলসহ ছোট যানবাহন (অটোরিক্সা, সিএনজি চালিত স্কুটার) চলাচল করে। যার কারণে পাঠদানে ব্যাঘাত এবং শিশুদের খেলাধুলার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এ পথটি এবং নিরাপত্তাহীনতায়ও ভুগছেন শিক্ষক ও কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন লাভ হয়নি।
জানা গেছে, তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী দীপংকর ঘোষ ২০১৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বরাবর তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচী (পিইডিপি-৩) এর আওতায় উপজেলাধীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ সম্প্রসারণের একটি প্রস্তাবিত তালিকা পাঠিয়েছেন। ওই তালিকায় উল্লেখিত ২১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে মাতৈন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামটি প্রথমেই রয়েছে।
এই ২১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে কয়েকটির নির্মাণ কাজ হয়েছে, আবার কিছু চলমান রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আহমেদাবাদ লুৎফুননেছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু তালিকায় প্রথমে থেকেও আজ পর্যন্ত মাতৈন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণের কোন খবর নেই। সহসা হবে কিনা তাও জানা নেই বলে জানান বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. কামরুল আলম।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয়ে ২ শিফটে পাঠদান করা হচ্ছে। এই পাঠদান কার্যক্রমে প্রাক-প্রাথমিকসহ প্রতি শিফটে চারটি কক্ষের প্রয়োজন। এছাড়া স্টোর রুম এবং দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরীর জন্য আরো একটি কক্ষের প্রয়োজন। অথচ বিদ্যালয়ে ২০০৩-০৪ অর্থ বছরে নির্মিত ৩ কক্ষবিশিষ্ট একটি ভবন রয়েছে। যার একটিতে অফিস এবং দু’টিতে শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এবং ১৯৬৮ সালে নির্মিত ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
কিন্তু ২১৯ জন শিক্ষার্থী নিয়ে বিপাকে রয়েছেন শিক্ষকেরা। মাত্র দু’টি কক্ষে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়ে বিদ্যালয়ের বারান্দার একটি অংশে শ্রেণি কার্যক্রম এবং অপর একটি অংশে দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী ব্যবহার করছেন। এছাড়া এককক্ষ বিশিষ্ট একটি টিনের ঘরকে শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে শিক্ষা পাঠদান কার্যক্রমসহ আনুসাঙ্গিক বিষয়ে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে এবং মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে বেশ কয়েকজন অভিভাবকের সাথে কথা হলে হয়। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্কুল, কলেজ ও মাদরাসাসহ উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন ভবন হচ্ছে। কিন্তু কোন অদৃশ্য কারণে আমাদের বিদ্যালয়টির ভবন হচ্ছে না। তাছাড়া পরিত্যক্ত ভবনটিও ভাঙ্গছে না এবং রাস্তাটিও (বিদ্যালয়ের মাঠ দিয়ে চলাচলের পথ) বন্ধ হচ্ছে না। তাই শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা ও নিরাপত্তার স্বার্থে পরিত্যক্ত ভবনটি ভেঙ্গে ফেলা এবং ওই স্থানে দ্রুত ভবন নির্মাণসহ অন্যান্য সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানান তারা।
প্রধান শিক্ষক মো. কামরুল আলম বলেন, শ্রেণিকক্ষের অভাবে পাঠাদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তাছাড়া পরিত্যক্ত ভবনটি ধসে পড়ার ভয়ে আছি। সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসসহ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বেশ কয়েকবার জানিয়েছেন বলে তিনি জানান।
এ ব্যাপারে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বুলবুল সরকার বলেন, মাতৈন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব বিদ্যালয়ের তথ্য (ভবন সংক্রান্ত) উপজেলা প্রকৌশলী কর্মকর্তাসহ শিক্ষা ও প্রকৌশল বিভাগের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রতিমাসে এর আপডেট (হালনাগাদ) তথ্যাদি প্রেরণ করা হয়। ঝুঁকিপূর্ণ পরিত্যক্ত ভবনটি ভাঙ্গার বিষয়ে তিনি বলেন, শীঘ্রই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উপজেলা প্রকৌশলী রাহাত আমিন পাটওয়ারী বলেন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ৪৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য চাহিদাপত্র (তালিকা) দেয়া হয়েছে। ওই চাহিদাপত্র অনুযায়ী সাংসদ মেজর অব. রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম ডিও লেটার দিয়েছেন। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ডিও লেটারসহ বিদ্যালয়গুলোর তালিকা পাঠানো হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাহাব উদ্দিনের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে কথা বলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, যেসব বিদ্যালয়ে পরিত্যক্ত ভবন রয়েছে তা যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে ভেঙ্গে দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে।