হাজীগঞ্জে ধর্ষণে কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা, ইউপি সদস্যসহ আটক ৫

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
হাজীগঞ্জে ১৫ বছর বয়সি এক কিশোরের ধর্ষণে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক কিশোরী দেড় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ও এই ঘটনা টাকার বিনিময়ে রফাদফা এবং দামাচাপা দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত কিশোর ও এক ইউপি সদস্যসহ ৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
তারা হলেন- অভিযুক্ত কিশোর মো. রায়হান, তার বোন মোসা. হাজেরা বেগম (২৫) ও খালেদা আক্তার (২২), চাচাতো ভাই মো. হাবিবুর রহমান সর্দার ও ইউপি সদস্য মো. রহমত উল্যাহ্ (৪৩)।
আটকদের মধ্য থেকে অভিযুক্ত কিশোর মো. রায়হান ছাড়া অন্য আসামিদের সোমবার (১৫ মে) দুপুরে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। এর আগে রোববার দিবাগত রাত ও সোমবার সকালে চার আসামি এবং বিকালে অভিযুক্ত ও আসামি মো. রায়হানকে আটক করে পুলিশ। এ দিন তাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের শিকার কিশোরীর বাবা হাজীগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।
জানা গেছে, উপজেলার হাটিলা পূর্ব ইউনিয়নের লাওকরা গ্রামের সর্দার বাড়ির সিরাজুল ইসলাম ছেরু সর্দারের ছেলে মো. রায়হান গত ২১ মার্চ বিকালে ওই কিশোরকে ধর্ষণ করে। এতে সে দেড় মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। ওই কিশোরী একই বাড়ির ও স্থানীয় একটি মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তারা সম্পর্কে চাচা-ভাতিজি। এ ঘটনায় ইউপি সদস্যের নেতৃত্বে গত শুক্রবার (১২ মে) ১ লাখ ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে রফাদফা করা হয়।
ওই দিন বিকালে ইউপি সদস্য রহমত উল্যাহ্ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও দুই পরিবারের লোকজনকে নিয়ে সালিসি বৈঠক করেন। বৈঠকে ধর্ষণের শিকার কিশোরীর পরিবারকে চাপ-সৃষ্টি করে টাকার বিনিময়ে রফাদফা এবং দুই পক্ষের একটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেন। ওই সময় স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কাইয়্যুম বেপারী ও কুদ্দুস সর্দারসহ ৪ জন সালিসদার এবং দুপক্ষের পরিবারের লোকজন উপস্থিত ছিলেন বলে কিশোরীর পরিবার জানান।
এ বিষয়ে ধর্ষণের শিকার কিশোরীর স্বজনরা জানান, মেম্বারসহ (ইউপি সদস্য) সবাই চেয়েছে বিষয়টির সমাধান হোক। তাই, তাদের কথায় আমরা রাজি হয়েছি এবং তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি।
আটকের আগে ইউপি সদস্য রহমত উল্যাহর সাথে সংবাদকর্মীদের কথা হলে তিনি জানান, উপর মহলের সঙ্গে কথা বলে এবং এলাকার শান্তির জন্য গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে এ সালিসি বৈঠক করা হয়েছে। তবে উপর মহলের কে বা কার সঙ্গে কথা হয়েছে, তা জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কাইয়্যুম বেপারীর সাথে কথা হলে সালিসি বৈঠকের সত্যতা নিশ্চিত করে তিনি জানান, গত শুক্রবার মেম্বার (ইউপি সদস্য) রহমত উল্যাহ তাকে নিয়ে ওই বাড়িতে যায়। এরপর মেম্বারের উপস্থিতিতে দুই পক্ষের চারজন সালিসদার ও দুই পরিবারের লোকজন বসে বিষয়টির সমাধান করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছেলে-মেয়ে উভয় অপ্রাপ্ত বয়স এবং তারা সম্পর্কে চাচা-ভাতিজি হয়। তাই, আমি তাদের থানা বা কোর্টে (আদালত) যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু মেম্বার, দুই পক্ষের লোকজন ও পরিবারের সদস্যরা বিষয়টির সমাধান করে নেয়। পরে শুনেছি মেয়ের চিকিৎসার জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। তখন আমি ছিলাম না।
অপর সালিসদার কুদ্দুস সর্দারের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি শারীরিক অসুস্থতার কথা বলেন এবং পরে তিনি আমাদের প্রতিনিধির সাথে দেখা করবেন বলে জানান।
ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, এ বিষয়ে আমি জানি না। যদি এমনটি হয়ে থাকে, তাহলে আমার ইউপি সদস্য রহমত উল্ল্যাহ এমন ঘটনার সমাধান না করে, ধর্ষিতার পরিবারকে আইনি সহায়তায় দিতে পারতেন।
হাজীগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নজরুল ইসলাম জানান, কিশোরির বাবা অভিযুক্ত মো. রায়হান ও ইউপি সদস্য মো. রহমত উল্যাহ্সহ ৫ জনকে আসামি করে একটি অভিযোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে ইউপি সদস্যসহ চার আসামিকে আটক করে সোমবার আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, অভিযোগে মো. রায়হানের বয়স ১৮ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। তার প্রকৃত বয়স নির্ধারণে আমরা কাজ করছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্য সালিসদার বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। ঘটনার সাথে জড়িত থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
হাজীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ জোবাইর সৈয়দ জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন- ২০০০ সংশোধীত ২০০৩ এর ৯ (১) এর ২০২/২১২/২১৩ ধারায় দায়েরকৃত মামলার সব আসামি আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, সোমবার চাঁদপুর সদর হাসপাতালে কিশোরীর মেডিকেল রিপোর্ট সম্পন্ন এবং আটক চারজনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

১৬ মে, ২০২৩।