হাজীগঞ্জে ভুল চিকিৎসায় প্রসূতি মৃত্যুর অভিযোগ

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
হাজীগঞ্জ বাজারের ইসলামিয়া মডার্ন হাসপাতালে ডা. রাইসুল ইসলাম রুবেলের ভুল চিকিৎসায় এক প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর অভিযাগ উঠেছে। এ ঘটনায় চাঁদপুরের সিভিল সার্জনের নির্দেশক্রমে গঠিত ৩ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন। রোববার (৯ এপ্রিল) দুপুরে হাসপাতাল পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেন তদন্ত কমিটির সদস্য ও হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন।
এর আগে গত বুধবার বিকেলে রোজিনা আক্তার কুমিল্লা মেডিকেল হাসপাতালে দ্বিতীয়বার অপারেশন করার সময় মৃত্যুবরণ করেন। গত ৩১ মার্চ হাজীগঞ্জ বাজারস্থ ইসলামিয়া মডার্ন হাসপাতালে তাকে সিজার করানো হয়। তিনি উপজেলার বাকিলা ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের ফজর আলী বেপারি বাড়ির ওমান প্রবাসী মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী ও একই উপজেলার কালচোঁ দক্ষিণ ইউনিয়নের বানিয়াচোঁ গ্রামের খান বাড়ির হাসান খাঁনের মেয়ে।
এ বিষয়ে ডা. রইসুল ইসলাম রুবেল সংবাদকর্মীদের বলেন, প্রসূতি রোজিনা আক্তার জানিয়েছেন, তিনি বাথরুমে পড়ে গিয়েছেন। তাই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছে। পরে হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে আমরা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করি। সেখানে তাকে দ্বিতীয়বার অপারেশন করানোর সময় তিনি হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেছেন। তার ডেথ সার্টিফিকেট দেখে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি।
তিনি আরো বলেন, বেলুন দিয়ে জরায়ু সেলাই করা হয়েছে, এমন তথ্য সঠিক নয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বন্ধে মেডিকেলের ভাষায় যা যা করা প্রয়োজন, তাই করা হয়েছে।
এদিকে গতকাল রোববার হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃক গঠিত ৩ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি হাসপাতাল পরিদর্শন করে অনেক অনিয়ম দেখতে পায়। এসময় তদন্ত কমিটির প্রধান হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন সংবাদকর্মীদের বলেন, বিষয়টি তদন্তনাধীন। তদন্ত শেষে জানানো হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. গোলাম মাওলা নঈম জানান, বিষয়টি আমরা শুনে আজ (রোববার) তদন্ত শুরু করেছি। তদন্তে সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উল্লেখ্য, ইসলামিয়া মডার্ন হাসপাতালে গত ৩১ মার্চ রোজিনা বেগমকে সিজার করানো হয় এবং ৩ এপ্রিল তাকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেওয়া হয়। ৪ এপ্রিল রাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে তাকে আবারো হাসপাতালে আনা হয়। এসময় অন দ্যা কলে গোল্ডেন হসপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. রইসুল ইসলাম রুবেল ইসলামিয়া মডার্ন হাসপাতালে ওই রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করে কুমিল্লা মেডিকেল হাসপাতালে রেফার করেন।
এ বিষয়ে রোজিনার বাবা হাসান খাঁন ও রোজিনার বোনের ছেলে মো. সোহেল সংবাদকর্মীদের বলেন, গত ৩১ মার্চ আমেনা আক্তার নামে একজনের মাধ্যমে আমরা ইসলাামিয়া মডার্ন হাসপাতালে রোজিনাকে ভর্তি করাই। ভর্তির পরেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মেয়েকে সিজার করার জন্য রাজি হই। সিজার করান হাজীগঞ্জ গোল্ডেন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. রাইসুল ইসলাম রুবেল, আর এনেসথেসিয়া করান ডা. সাদ্দাম হোসেন।
সিজার করার পর ডাক্তার ফুল কাটতে গিয়ে নির্ধারিত অংশের চেয়ে অতিমাত্রায় জরায়ু কেটে ফেলেন বলে জানতে পারি। হাসপাতালে ৪ দিন রেখে রুজিনাকে রিলিজ করে বাড়িতে পাঠানো হয়। বাড়িতে যাওয়ার পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ দেখা দিলে পুনরায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসি। মঙ্গলবার (৪ এপ্রিল) ২য় বার মেয়েকে হাসপাতালে ৪ ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়। এরপর মেয়ের অবস্থার অবনতি হলে ভুল অপারেশনের দায় থেকে রক্ষা পেতে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
তারা আরো বলেন, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনী বিভাগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানতে পারেন জরায়ু কেটে কনডম (বেলুন) বসিয়ে সেলাই করা হয়েছে। যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোনো অধ্যায়ের নিয়মে নেই। গাইনী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মেডিকেল বোর্ড জরায়ু কেটে বেলুন প্রতিস্থাপন ঘটনাটি এই প্রথম দেখেছেন। মূলত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই রোজিনার মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে বুধবার (৫ এপ্রিল) কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে রোজিনা আক্তারের মৃতদেহ নিয়ে ইসলামিয়া মডার্ন হাসপাতালের নিচে অবস্থান নেয় স্বজনরা। হাসপাতাল ভবনে চিকিৎসক ও মালিক বসবাস করলেও কেউ সহানুভূতি নিয়ে এগিয়ে আসেনি বলে নিহতের স্বজনরা দাবি করেন। এতে নিহতের স্বজনরা ক্ষুব্ধ হয়ে লাশ নিয়ে বাড়িতে চলে যান।
এ বিষয়ে হাজীগঞ্জ উপজেলা প্রাইভেট হাসপাতাল এন্ড ডায়ানস্টিক মালিক সমিতির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক তোফায়েল আহম্মেদ জানান, লাশ নিয়ে নিহতের স্বজনরা হাসপাতালের সামনে অবস্থান নিলে আমরা সুষ্ঠু সমাধানের আশ্বাসে নিহতের আত্মীয়রা লাশ নিয়ে বাড়ি যায়।
অপর এক প্রশ্নে তোফায়েল আহম্মদ জানান, ইসলামিয়া মডার্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের জানিয়েছেন, আসলে কনডম দিয়ে সেলাই নয়, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে কনডম ক্যাথেডার স্থাপন করে রোগীকে রেফার দেয়া হয়েছে।
ইসলামিয়া মডার্ন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালনা মাওলানা মো. রফিকুল্লাহ সংবাদকর্মীদের জানান, সিজারের ৪ দিন পর আমরা রোগীকে বাড়ি পাঠাই। পরে তারা প্রচুর রক্তক্ষরণের সমস্যা নিয়ে আমাদের হাসপাতালে আসে। তখন প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রোগীকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন চিকিৎসক।
এদিকে হাজীগঞ্জের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সিজারে একের পর এক প্রসূতি মায়ের মৃত্যু হলেও আইনগত ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে সচেতন মহল জানান, প্রথমত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীর স্বজনদের সাথে সমঝোতা করে নেন। দ্বিতীয়ত, মৃতের স্বজনরাও ঝামেলা এড়াতে বিষয়টি মেনে নেন।
দেখা গেছে, কোনো প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর পর তাৎক্ষণিক বা দু’-একদিন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন স্বজনেরা। পরে হাসপতাল কর্তৃপক্ষের সাথে সমঝোতা করে অভিযোগ করা থেকে স্বজনেরা বিরত থাকেন। যার ফলে কোনো প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর ঘটনায় অভিযোগের অভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে না।

১০ এপ্রিল, ২০২৩।