হাজীগঞ্জে হালট দখল ও সরকারি গাছ লুটের অভিযোগ


স্টাফ রিপোর্টার
হাজীগঞ্জে বেসরকারি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (পাতানিশ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়) স্থাপনের নামে বন্দোবস্ত বহির্ভূত ১নং খাস খতিয়ান ভুক্ত সরকারি হালট দখল ও সরকারি গাছ লুটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলার হাটিলা পশ্চিম ইউনিয়নের পাতানিশ পশ্চিম পাড়া সরকারি হালট (৩.৪৭ একর) দখল ও হালটের রাস্তায় অবস্থিত বিভিন্ন প্রজাতির ৩২টি গাছ লুটের এ অভিযোগ পাওয়া যায়।
গতকাল বুধবার সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা যায়, সরকারি ভূমিতে (হালট) পাতানিশ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য পাতানিশ পশ্চিম পাড়া মোল্লা বাড়ির ব্রিজ হতে ঈদগাহ পর্যন্ত হালটের পাশে অবস্থিত গাছগুলো কাটা হচ্ছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি গাছ কেটে হালটের পাশে রাস্তায় রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে গাছ কাটা শ্রমিকদের সাথে কথা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানান, ৩৫ হাজার টাকায় ৩২টি গাছ কাটার চুক্তি নিয়েছেন তারা। গত রোববার থেকে দৈনিক ৫-৭ জন শ্রমিক গাছ কাটার কাজ করছেন। গাছগুলোর মূল্য আনুমানিক এক থেকে দেড় লাখ টাকা হবে বলে তিনি জানান।
গাছগুলো বিক্রি করা হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ওই শ্রমিক বলেন, শুনেছি এই গাছগুলো বিক্রি করা হবে না। গাছ দিয়ে প্রস্তাবিত স্কুলের ঘর নির্মাণ, আসবাবপত্র, চেয়ার, টেবিলসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরি করা হবে। একই কথা বলেন স্থানীয় মানিক হোসেন ও সুমন মোল্লাসহ এলাকাবাসী।
তারা জানান, পাতানিশ গ্রামসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামে হাই স্কুল নেই। যার ফলে ৩-৫ কিলোমিটার দূরে এসব এলাকার শিক্ষার্থীদের হাই স্কুলে যেতে হয়। তাই গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে এলাকার লোকজন পাতানিশ গ্রামের পশ্চিম পাড়ায় সরকারি হালটে একটি হাইস্কুল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যার অনুমতি প্রশাসন থেকে নেয়া হয়েছে। তাই এ গাছগুলো কাটা হচ্ছে এবং যা স্কুলের কাজে ব্যবহার করা হবে। তবে সরকারি হালট দখল করে স্কুল নির্মাণ ও হালটে অবস্থিত গাছ কাটার অনুমতির বিষয়ে কোন কাগজপত্র তারা দেখাতে পারেননি।
হাটিলা ইউনিয়ন ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ৬৮নং ধড্ডা মৌজার ২৫৪৭ দাগে হালট ১.৮১ একর ও ৬৯নং পাতানিশ মৌজার ১ দাগে হালট ১.৬৬ একর ভূমি ১নং খাস খতিয়ান ভুক্ত মোট ৩.৪৭ একর ভূমি রয়েছে। মৌজা দু’টি আলাদা হলেও ভূমি পাশাপাশি অবস্থানের কারণে একখন্ডে একাধিক মাইল ব্যাপী দৈর্ঘ্য। যা বন্দোবস্ত বহির্ভূত ভূমি হিসাবে সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক (চাঁদপুর) নামে রেকর্ডভুক্ত। উক্ত ভূমির একপ্রান্তে চলাচলের পাকা রাস্তা, অন্য প্রান্তে পানি চলাচলের জন্য খাল।
উল্লেখিত ভূমির (৩.৪৭ একর) চৌহদ্দি নির্ধারণ, হালট জমি ইউনিয়নের জনস্বার্থে সংরক্ষণ ও পর্যায়ক্রমে নিচের তালিকাভুক্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য উল্লেখিত ভূমি বরাদ্দের জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেন স্থানীয় প্রকৌশলী সফিকুর রহমান ভুইয়া। প্রকল্পগুলো হলো- পাতানিশ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, ইউনিয়ন তহশিল অফিস, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, কমিউনিটি সেন্টার, কৃষি পণ্য দ্রুত বাজারজাত করার লক্ষ্যে গ্রোথ সেন্টার, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারিভাবে একটি টেকনিক্যাল ট্রেনিং কলেজ/ ইনিস্টিটিউট স্থাপন।
উক্ত আবেদনের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসকে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয় এবং উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) স্থানীয় (হাটিলা) ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তাকে দায়িত্ব প্রদান করেন। ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক পাটওয়ারী সরেজমিন তদন্ত শেষে এবং উপজেলা সার্ভেয়ার রফিকুল ইসলাম ও কানুনগো আবুল কাশেমের উপস্থিতিতে ৩.৪৭ একর ভূমি চৌহদ্দি নির্ধারণ করেন।
পরে গত ১১ জুলাই ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক পাটওয়ারী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জিয়াউল ইসলাম চৌধুরী বরাবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ৬৮নং ধড্ডা মৌজার ২৫৪৭ দাগে হালট ১.৮১ একর ও ৬৯নং পাতানিশ মৌজার উক্ত ১ দাগে হালট ১.৬৬ একর ভূমি ১নং খাস খতিয়ান ভুক্ত মোট ৩.৪৭ একর ভূমি রয়েছে। যা বন্দোবস্ত বহির্ভূত ভূমি হিসাবে সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক (চাঁদপুর) নামে রেকর্ডভুক্ত।
অথচ বন্দোবস্ত বহির্ভূত ভূমি (সরকারি হালট) দখল এবং হালটের রাস্তায় অবস্থিত সরকারি গাছ কাটা শুরু করেন প্রস্তাবিত পাতানিশ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোক্তারা। এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বরাবর ভূমি বন্দোবস্তের আবেদনকারী প্রকৌশলী সফিকুর রহমান ভূঁইয়ার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোনটি রিসিভ না করে কেটে দেন।
এ বিষয়ে ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক পাটওয়ারী বলেন, যেহেতু বন্দোবস্ত বহির্ভূত ভূমি সেহেতু এখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা বা অনুমতি ছাড়া কোন প্রকার স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই। গাছ কাটার বিষয়ে তিনি বলেন, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) স্যারের নির্দেশনা পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে গাছ কাটা বন্ধ করে দিয়েছি।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জিয়াউল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বৈশাখী বড়ুয়া বলেন, এ ব্যাপারে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে ব্যবস্থাগ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছি এবং তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে লোক পাঠানো হয়েছে।

২২ আগস্ট, ২০১৯।