জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় চাঁদপুরে সনাক-এর মানববন্ধন


প্রেস বিজ্ঞপ্তি
জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক জরুরি সম্মেলনকে সামনে রেখে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় দায়ী দেশসমূহের প্রতিশ্রুতি রক্ষার দাবিতে তরুণদের অংশগ্রহণে ‘বৈশি^ক জলবায়ু ধর্মঘট’ এর অংশ হিসেবে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। একযোগে সারা বাংলাদেশে মানববন্ধনের অংশ হিসেবে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) চাঁদপুর গত শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় অঙ্গীকার পাদদেশে বৈশি^ক জলবায়ু ধর্মঘটের অংশ হিসেবে ইয়েস ও ইয়েস ফ্রেন্ডস্সহ তরুণ সমাজের আহ্বানে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় দায়ী শিল্পোন্নত দেশসহ বিশে^র প্রতিটি দেশের প্রতিশ্রুতি রক্ষার দাবিতে মানববন্ধনের আয়োজন করে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অর্থায়নের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার, ন্যায্যতা ও সুশাসন নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য রাখেন সনাক সভাপতি অধ্যক্ষ মো. মোশারেফ হোসেন, সাবেক সভাপতি কাজী শাহাদাত, সহ-সভাপতি ইসমত আরা সাফি বন্যা, জলবায়ু বিষয়ক জনঅংশগ্রহণ কমিটির সদস্য ব্যাংকার মুজিবুর রহমান, টিআইবি’র এরিয়া ম্যানেজার মো. মাসুদ রানা, ইয়েস দলনেতা জয় ঘোষ ও সদস্য দীন মোহাম্মদ দিলরাজ।
এসময় উপস্থিত ছিলেন সনাক সদস্য অধ্যাপক সবিতা বিশ^াস, মো. আলমগীর হোসেন পাটওয়ারী, রফিক আহমেদ মিন্টু, জলবায়ু বিষয়ক জনঅংশগ্রহণ কমিটির সদস্য আহসান উল্যাহ বাতেন, সুফি খায়রুল আলম খোকন, তাছলিমা মুন্নী, রফিকুজ্জামান রনি, ষোলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তফা কামাল বাবুলসহ চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমির সদস্যবৃন্দ, আনন্দধ্বনি সংগীত একাডেমির সদস্যবৃন্দ, চাঁদপুর সেন্ট্রাল রোটার‌্যাক্ট ক্লাব, চাঁদপুর রুপসী রোটার‌্যাক্ট ক্লাবের সদস্যবৃন্দ, সনাক চাঁদপুরের ইয়েস, ইয়েস ফ্রেন্ডস, স্বজন ও বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থীবৃন্দ এবং টিআইবি’র কর্মীবৃন্দ।
বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নীতি-নির্ধারকরা জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় পর্যাপ্ত গুরুত্ব প্রদান এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করার প্রেক্ষিতে সুইডিস কিশোরী পরিবেশবাদী এবং অ্যাকটিভিস্ট গ্রেতা থর্নবাগ ২০১৮ সালের জলবায়ু সম্মেলনে এককভাবে প্রতিবাদ করেছিলেন। এরই ধারাহিকতায় তিনি ২০১৮ সালের ২০ আগস্ট থেকে সুইডেনের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের দিন ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্কুলে না গিয়ে সুইডিস পার্লামেন্টের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন যা বিশ^ব্যাপী সাড়া ফেলে। তার অনুপ্রেরণায় এর পরপরই দেশে দেশে স্কুল শিক্ষার্থীরা একই ধরনের বিক্ষোভে সামিল হয়। সেই প্রতিবাদকে কিশোর-কিশোরীদের মাঝে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে এ বছর জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক জরুরি সম্মেলনকে সামনে রেখে ২০ ও ২৭ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর ১২০টি দেশে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিশ^ব্যাপী ধর্মঘট, গণ প্রতিবাদ ও র‌্যালির আয়োজন করছে, যা বৈশি^ক জলবায়ু ধর্মঘট বা ‘গ্লোবাল ক্লাইমেট স্ট্রাইক’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের সাথে মিল রেখে রাজনীতিবিদদের পদক্ষেপ গ্রহণ, জলবায়ু পরিবর্তনকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা, জীবাশ্ম জালানি ব্যবহার বন্ধ করা, সকলে একত্রে কাজ করা, ন্যায়বিচার ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে বিশে^র প্রধান শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বন্ধ করে ২০ ও ২৭ সেপ্টেম্বর শ্রেণিকক্ষের বাইরে বেরিয়ে আসে। তরুণ শিক্ষার্থীদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সম্পৃক্ত বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের কর্মীরাও তাদের অফিস ও কাজ বন্ধ রেখে এই গণ প্রতিবাদ র‌্যালিতে অংশগ্রহণ করছেন। এই প্রতিবাদ ও র‌্যালির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দায়িত্বপ্রাপ্ত নীতি-নির্ধারকদের দেখানো যে, যারা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করে শুধু তারাই নয় বরং সারা বিশে^র ঝুঁকিতে থাকা লাখ লাখ মানুষ এই দাবির সাথে একাত্ম। এ প্রেক্ষাপটে শিল্পোন্নত দেশের প্রতিশ্রুতি রক্ষার আহবানসহ বৈশি^ক জলবায়ু ধর্মঘট বা গ্লোবাল ক্লাইমেট স্ট্রাইকের সাথে সংহতি প্রকাশ করে টিআইবি ও বিশেষ করে টিআইবির উদ্যোগে অনুপ্রাণিত দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের মূল স্তম্ভ সনাক ও স্বজন এবং এর চালিকাশক্তি তরুণ ইয়েস ও ইয়েস ফ্রেন্ডস্ সদস্যগণ ও তাদের আহবানে সারাদেশের তরুণ প্রজন্ম বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করে:
বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার সীমিত করা: বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার লক্ষ্যে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে শিল্পোন্নত দেশসমূহকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি প্রদান করতে হবে। শিল্পোন্নত দেশগুলোতে তেল, কয়লা এবং গ্যাসভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট পর্যায়ক্রমে দ্রুততার সাথে বন্ধ করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বন ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নতুন কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশকেও এক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর সরকারের চলমান প্রাধান্যের অবসান করে অনতিবিলম্বে নবায়নযোগ্য জ¦ালানি নির্ভর প্রকল্পে বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ¦ালানির ব্যবহার বৃদ্ধিতে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও অর্থায়নসহ কার্যকর পদক্ষেপ যেমন, ভর্তুকি প্রদান করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু অর্থায়ন: শিল্পোন্নত দেশগুলোর প্রস্তাবিত ১০০ বিলিয়ন ডলার রূপরেখায় অভিযোজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যাপ্ত জলবায়ু তহবিল বরাদ্দ নিশ্চিতের পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে।
উন্নয়ন সহায়তার অতিরিক্ত ‘নতুন’ এবং ‘অতিরিক্ত’ জলবায়ু তহবিল: বিশ্বব্যাপী অভিযোজনের জন্য ২০২৫ সাল নাগাদ প্রতি বছরে কমপক্ষে ১৫০ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন। ‘দূষণকারী কর্তৃক ক্ষতিপূরণ প্রদান’ নীতি মান্য করে ঋণ নয়, ক্ষতিপূরন হিসেবে সরকারি অনুদান প্রদান করতে হবে। একইসাথে উন্নয়ন সহায়তার ‘অতিরিক্ত’ এবং ‘নতুন’ প্রতিশ্রুতিকে স্বীকতি দিয়ে তদনুযায়ী বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে;
জলবায়ু অর্থায়নে ন্যায়বিচার ও ন্যায্যতা: জলবায় অর্থায়নে বিশ্বব্যাংক ও এডিবিসহ আন্তর্জাতিক অর্থ-লগিকারী পতিষ্ঠানের চাপ বা কৌশল উপেক্ষা করে বাংলাদেশের ন্যায্য পাপ্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে অনুদান সংগ্রহে সরকারকে আরো সক্রিয় হতে হবে। জলবায়ু তাড়িত বাস্তুচ্যূতদের পুনর্বাসন, কল্যাণ এবং অর্থনৈতিক সমদ্ধি নিশ্চিতে সবুজ জলবায়ু তহবিল (জিসিএফ) এবং অভিযোজন তহবিল থেকে বিশেষ তহবিল বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে জনঅংশগ্রহণমূলক কর্মকৌশল: প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল নির্ধারণ ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ, নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে অন্তর্ভূক্ত করে জাতীয় পর্যায়ে সনির্দিষ্ট সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯।