শাহরাস্তিতে বিএনপি’র দু’গ্রুপের তৃণমূলে কমিটি-কমিটি খেলা

নেতাকর্মীরা চরম হতাশ

নোমান হোসেন আখন্দ
শাহরাস্তিতে বিএনপির কমিটি-কমিটি খেলায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে যাচ্ছে। দু’টি গ্রুপের ভিন্ন-ভিন্ন কমিটি দেখাকে তারা ব্যক্তিগত আখের গোছানো এবং দল ধংসের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। এ ব্যাপারে জেলার নেতাদের তেমন কোন পদক্ষেপ দেখতে না পেয়ে তারা আরো হতাশ হয়ে যাচ্ছেন।
জানা যায়, শাহরাস্তি উপজেলা বিএনপির দীর্ঘদিনের মতিন-মমিন গ্রুপিংয়ের দ্বন্দ্বের অবসান হয় গত একাদশ জাতীয়  সংসদ নির্বাচনে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ ৪ বারের সাবেক সংসদ সদস্য এমএ মতিন একাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়ায় গ্রুপিং ভুলে নেতাকর্মীরা একাকার হয়ে ধানের শীষ প্রতিকের প্রার্থী সাবেক জেলা বিএনপির সভাপতি লায়ন ইঞ্জি. মমিনুল হকের পক্ষে কাজ করতে দেখা গেছে। সংসদ নির্বাচনের পর ৬ মাসের মাথায় দু’গ্রুপের চলমান বিরোধ আবারো স্পষ্ট হয়ে উঠে। দলীয় কর্মকাণ্ডে নিষ্কিৃয় এবং বিএনপি দলীয় ফোরামে আলোচনা ছাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার অভিযোগে সাবেক ২ বারের উপজেলা চেয়ারম্যান ও শাহরাস্তি  উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেন মিয়াজীকে (দলীয় বৈঠক) থেকে সভাপতি পদ থেকে বহিস্কার করেন একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন (ধানের শীষ) প্রতিক পাওয়া জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি লায়ন ইঞ্জি. মমিনুল হক। সেই সাথে তিনি হাজীগঞ্জে তার বাসায় দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে একই বৈঠকে শাহরাস্তি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে আবদুল মান্নান (মান্নান কোম্পানী), সহ-সভাপতি আয়েত আলী ভূঁইয়া, হাবিবুর রহমান পাটোয়ারী, শাহ মোহাম্মদ আলী, মমতাজ উদ্দিন, সেলিম পাটোয়ারী লিটন, জোবায়েদ কবির বাহাদুরসহ ১১ সদস্যবিশিষ্ট শাহরাস্তি উপজেলা বিএনপির একটি আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা দেন।
এ কমিটি ঘোষণার পর দু’গ্রুপের চলমান বিরোধ আবারো স্পষ্ট হয়ে উঠে। শাহরাস্তিতে শুরু হয় বিএনপির আবারো গ্রুপিংয়ে দ্বিধা-বিভক্তির রাজনীতি। সাবেক তুখোড় ছাত্রনেতা, উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক, সদস্য সচিব ও সাবেক পৌর মেয়র মো. মোস্তফা কামালের সাথে জোটবদ্ধ হন সাবেক ২ বারের উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেন মিয়াজী।
একদিকে ইঞ্জি. মমিনুল হক গ্রুপের আবদুল মান্নান, আয়েত আলী ভুইঁয়া, হাবিবুর রহমান পাটোয়ারীসহ নেতৃবৃন্দ এবং অপর গ্রুপে দেলোয়ার হোসেন মিয়াজী, মোস্তফা কামাল, শেখ বেলায়েত হোসেন সেলিমসহ নেতৃবৃন্দ উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন, পৌরসভা ও পৌরসভার আওতাধীন ১২টি ওয়ার্ডের কমিটি পৃথক-পৃথকভাবে ঘোষণা করছেন। উপজেলার প্রত্যেকটি ইউনিয়নে দু’গ্রুপের ২টি, পৌরসভায় দু’গ্রুপের ২টি ও প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে দু’গ্রুপের ২টি করে কমিটি দেয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে ইঞ্জি. মমিনুল হক গ্রুপের ৯টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৮টি ওয়ার্ডে এবং দেলোয়ার হোসেন মিয়াজী গ্রুপে ৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৫টি ওয়ার্ডে তৃণমূলে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সুচীপাড়া দক্ষিণ বিএনপি নেতা মোহাম্মদ আলী, সুচীপাড়া উত্তর বিএনপি নেতা হাতেম আলী, টামটা উত্তর ইউনিয়ন বিএনপি নেতা আয়েত আলী বেঙ্গল, চিতোষী পশ্চিম ইউনিয়ন বিএনপি নেতা আবুল কাশেম, টামটা দক্ষিণ ইউনিয়ন বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন আখন্দ, চিতোষী পূর্ব ইউনিয়ন বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন (সাবেক মেম্বার), রায়শ্রী দক্ষিণ ইউনিয়ন বিএনপি নেতা মোস্তফা কামাল, রায়শ্রী উত্তর ইউনিয়ন বিএনপি নেতা, জিয়াউদ্দিন টিপু, মেহার দক্ষিণ ইউনিয়ন বিএনপি নেতা, আবুল কালাম আতাহার ও মেহার উত্তর ইউনিয়ন বিএনপি নেতা জাকির হোসেন  জানান, গ্রুপিংয়ের রাজনীতি যে কোন দলের জন্যই শুভকর নয়। বিএনপি আজ চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া জেলে, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে অবরুদ্ধ। সেখানে বিএনপির দলীয় ভাই-ভাই মিলে নিজেদের মধ্যে অনৈক্যের কোন প্রয়োজন নেই। শুধু শাহরাস্তি উপজেলায় নয় প্রত্যেকটি উপজেলায় দলীয় নেতৃবৃন্দ এক ও অভিন্ন থেকে নিজেদের মধ্যে ঐক্য বজায় রেখে বিএনপিকে সুসংঘঠিত রাখাই বর্তমান সময়ের জন্য মুখ্য কাজ।
নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আজ যারা গ্রুপিং সৃষ্টি করছেন তারা নিজেদের ব্যক্তিগত কারণকে দলের সাথে একত্রিত করে, নিজেদের স্বার্থের জন্যই দলীয় নেতাকর্মীদের ব্যবহার করে গ্রুপিং সৃষ্টি করে বিভিন্ন ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ওয়ার্ডে কমিটি ঘোষলা দিচ্ছেন। এতে করে দলীয় ভাই-ভাইয়ে, দ্বন্দ্ব, গ্রুপিং, দলাদলি, বিরোধ ও মারামারি সৃষ্টি হবে।
পৌর বিএনপির তৃণমূল নেতা মো. মহসিন পাটোয়ারী  বলেন, জেলা বিএনপির কর্ণধার শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক ভাইয়ের নেতৃত্বের হাত ঘুরে যে কমিটি আসবে তৃণমূলে সে কমিটি গ্রহণযোগ্যতা পাবে। নিজের স্ব-ঘোষিত কমিটি তৃণমূল বিএনপি কখনই মেনে নেবে না। যারা আজ বিএনপিতে গ্রুপিং সৃষ্টি করে রাজনীতি করছে তারা বিএনপিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সুচীপাড়া উত্তরের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ইঞ্জি. মমিনুল হকের নেতৃত্বে শাহরাস্তি উপজেলায় ১১ সদস্যবিশিষ্ট বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি রয়েছে। এ আহ্বায়ক কমিটির নেতৃত্বে ইতোমধ্যে ৯টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৮টি ওয়ার্ডে তৃণমূলে কমিটি দেয়া হয়েছে। তৃণমূল নেতৃবৃন্দ আমাদের সাথে রয়েছে। আমরা দলের মধ্যে কোন গ্রুপিং সৃষ্টি করছি না।
সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন মিয়াজী বলেন, তৃণমূলে কমিটি না দিলে তাদের গ্রুপিং স্পষ্ট হবে না। দলীয় গ্রহণযোগ্যতা না থাকলে আওয়ামী লীগের সময়ে দু’বার উপজেলা চেয়ারম্যান হতে পারতাম না। মমিন কখনো ছাত্রদল, যুবদল বা তৃণমূল বিএনপি থেকে রাজনীতিতে আসেনি। চাঁদপুরে ঠিকাদারীর কারণে বিএনপির জার্সি গায়ে দিয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি হয়েছেন। যিনি হুট করে নেতা হয়েছেন তিনি তৃণমূল নেতাদের দরদ কি করে বুঝবেন। যারা রাজনীতিতে এভাবে আসবেন, তারা শুধু গ্রুপিং তৈরি করবেন দল ও জনগণের মাধ্যমে কখন ও জনপ্রতিনিধি হতে পারবে না।
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিকের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমি সরাসরি সাক্ষাত ছাড়া কোন বক্তব্য দেই না, সরাসরি আসলে বক্তব্য পাবেন।